দেশের উপকূলে জলবায়ু ক্ষতিগ্রস্ত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে বিমার আওতায় আনার বিকল্প নেই বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। আর এই বিমার প্রিমিয়ামের দায়িত্ব সরকারকেই নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন তারা।
Advertisement
তারা বলছেন, সরকারের এই অর্থায়ন আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিলগুলো থেকে আদায় করতে হবে। কারণ বাংলাদেশের মতো জলবায়ু ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে তারা নানা অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসলেও সেটি বাস্তবায়ন করছে না।
শনিবার (২৫ এপ্রিল) খুলনা শহরের হোটেল ওয়েস্টার্ন ইন হোটেলে আয়োজিত বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে দরিদ্রবান্ধব, জেন্ডার সংবেদনশীল এবং মানবাধিকার-ভিত্তিক সিডিআরএফআই প্রক্রিয়া বিষয়ক বিভাগীয় গোলটেবিল বৈঠকে এসব বিষয় উঠে এসেছে।
উন্নয়ন সংগঠন অ্যাওসেড (অ্যান অর্গানাইজেশন ফর সোসিও ইকোনমিক ডেভলপমেন্ট) এবং কেয়ার বাংলাদেশের সহায়তায় এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
Advertisement
এ সময় অ্যাওসেডের নির্বাহী পরিচালক শামীম আরফীন বলেন, উন্নত বিশ্ব ১৯৯৫ সাল থেকে জলবায়ুর ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে নানা ধরনের আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে আসছে। পাশাপাশি তারা কার্বন নিঃসরণ কমানোর উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, ওই সময় থেকে এখন পর্যন্ত কার্বন নিঃসরণ না কমে বরং ৩৪ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে। আর তাদের প্রতিশ্রুত অর্থায়নগুলো ক্ষতিপূরণ হিসেবে না দিয়ে তারা নানা কৌশলে ঋণের বোঝায় ফেলছে বাংলাদেশের মতো ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে।
তিনি বলেন, যে কারণে সরকারের উচিত হবে আগামীতে অনুষ্ঠিত জার্মানির বন জলবায়ু সম্মেলন ও তুরস্কের কপ ৩১-এ দর কষাকষির যথেষ্ট প্রস্তুতি নেওয়া। যাতে উন্নত বিশ্বের শর্তসমূহ মোকাবিলা করে বাংলাদেশ একটি সুবিধাজনক তহবিল আদায় করতে পারে।
শামীম আরফীন বলেন, যেহেতু এখন দেশের জলবায়ু ক্ষতি মোকাবিলায় বিমার বিকল্প নেই, সেহেতু বিমা প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষের জীবনজীবিকার উন্নয়নে সুবিধাজনক ব্যবস্থা আনতে হবে এবং এর প্রিমিয়ামের দায়-দায়িত্ব সরকারকে বহন করতে হবে। আর সরকারের সে অর্থায়নের জন্য বৈশ্বিক জলবায়ু ফান্ডগুলো থেকে টাকা আদায় করতে হবে।
এতে প্রধান অতিথির বক্তব্যে খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর কোনো নিজস্ব ফোরাম নেই, যেখানে জলবায়ু বিষয়ে কথা হয়। এমপি-মন্ত্রী হলে জনপ্রতিনিধিরাও জলবায়ুর মতো দায়িত্বশীল ও জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো ভুলে যান। বিগত সরকারের সময় দীর্ঘদিন এসব বিষয় ছিল গুরুত্বহীন। এমপি-মন্ত্রীরা জনগণের কাছে যেতেন না, তাদের বিষয়ে কথা বলতেও স্বাচ্ছন্দবোধ করতেন না।
Advertisement
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার গণতান্ত্রিক সরকার। যে কারণে আমি নিজে এসব বিষয় প্রধানমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে পৌঁছাবো। আমি অনুরোধ করবো, জলবায়ু নিয়ে যারা কাজ করছেন, প্রধানমন্ত্রী তাদের সঙ্গে যেন বসেন। বিষয়গুলো দ্রুত ও গুরুত্বের সঙ্গে সমাধান হয়।
খুলনা জেলা পরিষদের প্রশাসক এস এম মনিরুল হাসান বাপ্পী বলেন, আমি জলবায়ু ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জীবনের দুর্দশা দেখেছি, এটি কিভাবে তাদের নিঃশেষ করে দেয়। ন্যূনতম হলেও আমাদের উচিত তাদের ফসল, পরিবার রক্ষা, সুপেয় পানির ব্যবস্থা করে দেওয়া। তারা যেন স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারে।
সুন্দরবন একাডেমির প্রধান নির্বাহী অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির বলেন, দীর্ঘদিন কাজ করেও আমরা জলবায়ু বীমার বিষয়ে কোনো সমাধানে আসতে পারছি না। কারণ আমরা শুধু কিভাবে একটা পলিসি লাভজনক করা যাবে সেটি নিয়ে ভাবছি।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শরীফ হাসান লিমন বলেন, জলবায়ু তহবিল পাওয়ার জন্য আমাদের যথেষ্ট ডাটাবেজ রয়েছে কিনা সেটি বড় বিষয়। জাতীয় এবং প্রান্তিক পর্যায়ে ডাটাবেজ সংগ্রহ করতে হবে যথাযথ সহায়তা পাওয়ার জন্য।
অধ্যাপক ড. নাজিয়া হাসান বলেন, জলবায়ুর ক্ষতি মোকাবিলায় আমাদের প্রয়োজন পুরো বিষয়ে একটি মহাপরিকল্পনা। যা দীর্ঘমেয়াদী এবং গবেষণাভিত্তিক হবে।
খুলনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মো. নজরুল ইসলাম বলেন, আমরা এ উপকূলীয় অঞ্চলের ফসলের বৈচিত্র্যতা আনার চেষ্টা করছি। তরমুজ, সূর্যমুখীসহ নানা ধরনের নতুন নতুন ফসল এ অঞ্চলে করছি। তবে এটি অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। এর জন্য আরও বেশি আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দরকার।
খুলনা সাধারণ বীমা করপোরেশনের সহকারী মহাব্যবস্থাপক বিশ্বজিৎ কর বলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে একমাত্র জলবায়ু বীমার মাধ্যমেই ক্ষতিগ্রস্তদের দুঃখ-দুর্দশা লাঘব করা সম্ভব। সাধারণ একজন কৃষকের ক্ষেত্রে জমির দলিল, জাতীয় পরিচয়পত্র হলেই একটি জলবায়ু বীমা সম্পন্ন করা যায়।
সাতক্ষীরার এনজিও প্রতিনিধি আশিক ই ইলাহি বলেন, আমাদের বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুর্নীতি একটি বড় অবিচার। যার কারণে ইন্সুইরেন্স নিয়ে মানুষের দ্বিধাদ্বন্দ্বের শেষ নেই।
কেয়ার বাংলাদেশের টেকনিক্যাল কো-অর্ডিনেটর হিমাদ্রি শেখর মণ্ডল বলেন, জলবায়ু ফান্ডের অর্থনৈতিক মডেলগুলো দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। আমরা বুঝতে পারছি না কোনটি সহায়তা, কোনটি ঋণ আর কোনটি উন্নত দেশের ব্যবসায়িক অভিসন্ধি।
এছাড়া গোলটেবিল বৈঠকে আরও বক্তব্য দেন খুলনা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. তুষার কান্তি রায়, খুলনা মৎস্য অধিদপ্তরের পরিচালক বিপ্লব কুমার বসাক, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির খুলনা জেলার সভাপতি এস এ রশিদ, ফিনান্সিয়াল এক্সপেসের সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার ইয়াছির ওয়ারদাদ, সিসিজেবির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো মৌমিতা দাস গুপ্ত প্রমুখ।
প্রসঙ্গত, অ্যাওসেড ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলায় Multi-Actor Partnerships on Climate and Disaster Risk Finance and Insurance (MAP CDRFI) প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। এতে আর্থিক সহায়তা দিয়েছে বিএমজেড এবং কারিগরি সহায়তা দিয়েছে কেয়ার বাংলাদেশ।
ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, উপজেলা, বিভাগীয় এবং জাতীয় পর্যায়ে গঠিত ৬৬টি মাল্টি-অ্যাক্টর প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে এ উদ্যোগ স্থানীয় সরকার, সুশীল সমাজ, বেসরকারি খাত, গণমাধ্যম, যুবসমাজ, একাডেমিয়া এবং কমিউনিটির প্রতিনিধিদের জন্য একটি কাঠামোবদ্ধ ক্ষেত্র তৈরি করেছে। যেখানে প্রমাণভিত্তিক তথ্য তৈরি, নীতিগত ঘাটতি শনাক্ত এবং স্থানীয় অগ্রাধিকারকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরে উত্থাপন করতে পেরেছে।
এনএইচ/এমএমকে