ইফতেখার রবিন
Advertisement
লিটল ম্যাগাজিন আমার গভীর আগ্রহ ও অনুরাগের একটি ক্ষেত্র। বাংলা সাহিত্যের বহু প্রতিষ্ঠিত কবি-সাহিত্যিক তাদের সাহিত্যিক অভিযাত্রার সূচনালগ্নে লিটল ম্যাগাজিনকে আশ্রয় করে নিজেদের সৃজনশীল শক্তিকে শাণিত করেছেন। নিরন্তর পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ভাঙাগড়া ও নতুন ভাষা-নির্মাণের মধ্য দিয়ে তারা সাহিত্যের পরিসরকে সমৃদ্ধ করেছেন। ফলে লিটল ম্যাগাজিন শুধু লেখক তৈরির ক্ষেত্রই নয়, এটি সচেতন ও মননশীল পাঠক গড়ে তোলার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। এ কাজকে সার্থক করে তোলেন দূরদর্শী, নিরপেক্ষ, প্রাজ্ঞ ও নিবেদিতপ্রাণ সম্পাদকরা।
সাহিত্যের ইতিহাসে লিটল ম্যাগাজিনের অবদান অনস্বীকার্য। যুগে যুগে সাহিত্যের নবতর ধারা, মুক্তচিন্তার বিকাশ এবং সৃজনশীল আন্দোলনের অন্যতম প্রধান বাহন হয়ে উঠেছে লিটল ম্যাগাজিন। ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রামাণ্য দলিল হিসেবে যেমন এর গুরুত্ব অপরিসীম; তেমনই সমাজ-সচেতনতা ও সাংস্কৃতিক বিকাশের ক্ষেত্রেও এর ভূমিকা সুদূরপ্রসারী। ভিন্নতর ভাবনা ও নতুন দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন ঘটিয়ে এটি পাঠকের অন্তর্জগতে জ্বালিয়ে দেয় চিন্তার দীপশিখা।
একসময় লিটল ম্যাগাজিন ছিল মুক্তবুদ্ধি ও স্বাধীন চিন্তা-চর্চার অন্যতম প্রধান আশ্রয়স্থল। বর্তমানে সেই চর্চার ক্ষেত্র কিছুটা সংকুচিত হলেও এখনো কিছু সাহিত্যানুরাগী ও দায়বদ্ধ সম্পাদক নিষ্ঠার সঙ্গে এ ধারাকে বাঁচিয়ে রাখার সংগ্রাম করে যাচ্ছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম সৈয়দ মনির হেলাল। তার সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘সময়পাঠ’ এরই মধ্যে সাহিত্যপ্রেমী পাঠকদের মনে স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।
Advertisement
সম্প্রতি সময়পাঠের চতুর্থ সংখ্যা হাতে পেয়েছি। সংখ্যাটি পাঠ করে সত্যিই মুগ্ধ হয়েছি। এবারের সংখ্যায় উপমহাদেশের প্রথম জেল-হত্যাকাণ্ড এবং গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের সংগ্রামের অনির্বাণ স্মারক ‘খাপড়া ওয়ার্ড আন্দোলন’ নিয়ে লিখেছেন দুই গুণী লেখক জাহাঙ্গীর আলম ও আবদুশ শহীদ। ইতিহাস ও রাজনৈতিক বাস্তবতার গুরুত্বপূর্ণ এ অধ্যায় তাদের লেখায় নতুন তাৎপর্য লাভ করেছে।
কবিতা বিভাগে স্থান পেয়েছে রাজেশকান্তি দাশের সময়-সচেতন গুচ্ছ কবিতা। সম্পাদক সৈয়দ মনির হেলাল তার বিশ্লেষণধর্মী লেখায় সমকালীন সময়ের নানামুখী সংকট, বিপর্যয় ও অসংগতিকে গভীর দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করেছেন। দলবদ্ধ সহিংসতার মুখ, মুখোশ ও অভিমুখকে তিনি তীক্ষ্ণ ভাষায় উন্মোচন করেছেন। অন্যদিকে মিহিরকান্তি চৌধুরী তার চিন্তাশীল প্রবন্ধে লিটল ম্যাগাজিনের ইতিহাস, শক্তি, সীমাবদ্ধতা এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার দিকগুলো আলোকপাত করেছেন। এ ছাড়া ফজলুর রহমান বাবুল ও সজলকান্তি সরকারের লেখাগুলো সংখ্যাটিকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
আরও পড়ুনসারেঙ হেলাল হাফিজ সংখ্যা: উজ্জ্বলতম সংকলনএ সংখ্যায় পাঁচজন নবীন ও প্রবীণ কবির কবিতা স্থান পেয়েছে। লিখেছেন জাহাঙ্গীর জয়েস, ভানু পুরকায়স্থ, নীহার মোশাররফ, ইফতেখার রবিন এবং মনিরুল ইসলাম শ্রাবণ। সাহিত্য-সংস্কৃতি বিভাগে কামরুল ইসলাম, চারু হক, লাবনী মণ্ডল ও অনন্ত পৃথ্বীরাজ নানা গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ তুলে ধরেছেন। গল্প বিভাগে রিপন ঘোষের রচনা পাঠককে নতুন ভাবনার জগতে নিয়ে যায়।
সময়পাঠ এরই মধ্যে দেশ-বিদেশের সাহিত্যপ্রেমী পাঠকের কাছে আলোচিত এবং সমাদৃত একটি লিটল ম্যাগাজিনে পরিণত হয়েছে। লেখক নির্বাচন ও রচনা সংকলনে সম্পাদক সৈয়দ মনির হেলাল যে নিরপেক্ষতা, সাহিত্যবোধ ও দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন, তা বিশেষভাবে প্রশংসার দাবি রাখে। পত্রিকাটির ধারাবাহিক সমৃদ্ধির জন্য তার নিরলস প্রচেষ্টা সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক। আর সজলকান্তি সরকারের দৃষ্টিনন্দন প্রচ্ছদ সংখ্যাটির নান্দনিকতাকে আরও উজ্জ্বল করেছে।
Advertisement
নিঃসন্দেহে সময়পাঠের চতুর্থ সংখ্যা সময়, সমাজ, ইতিহাস ও সাহিত্যের মূল্যবান দলিল। এর সমৃদ্ধি ও ধারাবাহিকতা দীর্ঘস্থায়ী হোক। লিটল ম্যাগাজিন সাহিত্য আরও ব্যাপকভাবে পাঠকের অন্তর্লোকে প্রবেশ করুক এবং নতুন প্রজন্মের সাহিত্যচর্চাকে উজ্জীবিত করুক—এ প্রত্যাশা রইল।
সময়পাঠ (চতুর্থ সংখ্যা)সম্পাদক: সৈয়দ মনির হেলালপ্রকাশকাল: মার্চ ২০২৬প্রচ্ছদ: সজলকান্তি সরকারমূল্য: ১২০ টাকা।
এসইউ