আন্তর্জাতিক

কংগ্রেসে ফিরলে মমতাকে ‘বড় পদ’ দেওয়ার প্রস্তাব সোনিয়ার?

২৮ বছর আগে যে কংগ্রেস ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিলেন পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী, কালের আবহে সেই পুরোনো দলেই কি আবার ফিরতে চলেছেন তিনি? ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের ভরাডুবির পর দিল্লির রাজনৈতিক অলিন্দে এখন এটাই সবচেয়ে বড় চর্চার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক মহলে তীব্র গুঞ্জন, মমতা ব্যানার্জীকে সসম্মানে কংগ্রেসে ফেরার প্রস্তাব দিয়েছেন কংগ্রেস সংসদীয় দলের চেয়ারপারসন সোনিয়া গান্ধী। সে ক্ষেত্রে মমতাকে দলের সর্বভারতীয় সহ-সভাপতি পদ দেওয়া হতে পারে।

Advertisement

তৃণমূল কংগ্রেস গঠনের পর থেকেই বিগত বামফ্রন্ট সরকারের প্রধান সমালোচক ছিলেন মমতা। ২০১১ সালে ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল তার দল। টানা তিন মেয়াদে ১৫ বছর পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় থাকার পাশাপাশি মমতা ব্যানার্জী নিজে ছিলেন জনপ্রিয়তার শীর্ষে। দিল্লিতে বিজেপি-বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’র অন্যতম প্রধান মুখ এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কড়া সমালোচক হিসেবে প্রথম সারিতে নাম ছিল তার। এমনকি কেউ কেউ তাকে ভবিষ্যতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবেও কল্পনা করতে শুরু করেছিলেন।

আরও পড়ুন যে দল ভেঙে গড়েছিলেন তৃণমূল, এখন সেই কংগ্রেসেই ফিরতে চান মমতা?

তবে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবির পর কার্যত ভেঙে খানখান হয়ে গেছে তৃণমূল কংগ্রেস। একাধিক নেতা-নেত্রী, বিধায়ক ও সংসদ সদস্য দল ছাড়ছেন। লোকসভায় তৃণমূলের ২৮ জন সদস্যের মধ্যে ২০ জনেরও বেশি এখন বিদ্রোহী শিবিরে নাম লিখিয়েছেন। রাজ্যসভার ১৩ জন সদস্যের মধ্যে দুইজন পদত্যাগ করেছেন। অন্যদিকে, দলের ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে ২০ জনেরও বেশি বিধায়ক এরই মধ্যে বিদ্রোহী তৃণমূলে যোগ দিয়েছেন, যা আগামী দিনে আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে মমতার নিজের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারও বড়সড় সংকটের মুখে পড়বে।

এই অবস্থায় নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতেই গত সোমবার (৮ জুন) দিল্লিতে বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’র বৈঠকে যোগ দিয়েছিলেন তৃণমূল নেত্রী মমতা ব্যানার্জী। সঙ্গে ছিলেন তার ভাইপো তথা দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক ব্যানার্জী। বৈঠকে সোনিয়া গান্ধীর ঠিক পাশেই বসেছিলেন মমতা। এমনকি বৈঠকের ফাঁকে সোনিয়া গান্ধী ও মমতা ব্যানার্জীর একে অপরকে আলিঙ্গনের একটি ছবিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়।

Advertisement

এরই ধারাবাহিকতায় গত মঙ্গলবার দিল্লির ১০ নম্বর জনপথে সোনিয়া গান্ধীর বাসভবনে গিয়ে তার সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎ করেন মমতা ব্যানার্জী। এর পরদিন বুধবার, একই স্থানে লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীর সঙ্গে প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন অভিষেক ব্যানার্জী। সূত্র জানায়, বৈঠকে পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং ইন্ডিয়া জোটের ভবিষ্যৎ কৌশল নিয়ে দুই নেতার মধ্যে দীর্ঘ আলোচনা হয়। এই জোড়া বৈঠকের পর থেকেই দিল্লির রাজনীতিতে জল্পনা ছড়িয়েছে—তবে কি তৃণমূল কংগ্রেসকে বিলুপ্ত করে দিয়ে সপরিবারে কংগ্রেসে ফিরছেন মমতা-অভিষেক?

আরও পড়ুন মমতার দলে ভাঙনের নেপথ্যে কি দিল্লিতে শুভেন্দুর সেই বৈঠক?

শোনা যাচ্ছে, সোনিয়া গান্ধীর দেওয়া সর্বভারতীয় সহ-সভাপতির প্রস্তাব মমতা ব্যানার্জী একেবারে খারিজ করে দেননি, বরং চিন্তাভাবনা করার জন্য কিছুটা সময় চেয়েছেন। অন্যদিকে, তৃণমূল যদি কংগ্রেসের সঙ্গে মিশে যায়, তবে অভিষেক ব্যানার্জীকে অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস কমিটির (এআইসিসি) অন্যতম সাধারণ সম্পাদকের পদ দেওয়া হতে পারে। যদিও এই বিষয়ে কংগ্রেস বা তৃণমূলের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়া হয়নি। বুধবার বিকেলে দিল্লি থেকে কলকাতা বিমানবন্দরে নামার পর সংবাদিকরা এই নিয়ে প্রশ্ন করলেও মমতা ব্যানার্জী কোনো উত্তর না দিয়ে এড়িয়ে যান।

তবে অতীতে ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাসে প্রণব মুখার্জীর মতো বড় মাপের নেতাদেরও দল ছেড়ে ফের কংগ্রেসে ফিরে যাওয়ার নজির রয়েছে।

এই ইস্যুতে পশ্চিমবঙ্গের প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার বলেন, ‘রাজনীতি সম্ভাবনাময় শিল্প। ফলে যে কোনো কিছুই হতে পারে। আরএসএসের ভাবধারা এবং বিজেপির একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে লাগাতার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন রাহুল গান্ধী। আমরা মনে করি রাহুল গান্ধীরই প্রধানমন্ত্রী হওয়া উচিত। আর এই নেতৃত্বকে যিনি মেনে নেবেন, তাদের সকলের জন্যই আমাদের দরজা খোলা আছে।’

Advertisement

আরও পড়ুন মমতা ব্যানার্জীর বাড়িতে সিআইডির তল্লাশি

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার সাবেক বিরোধী দলনেতা তথা প্রবীণ কংগ্রেস নেতা আব্দুল মান্নান অবশ্য মমতার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, ‘অনুমানের ওপর ভিত্তি করে কোনো মন্তব্য করা যায় না। আগে ঘটনা ঘটুক, তারপর দেখা যাবে। তবে মমতার কার্যকলাপের ওপর কেউ বিশ্বাস করতে চায় না। তার বিশ্বাসযোগ্যতা এখন তলানিতে ঠেকেছে।’

এদিকে পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এই জল্পনা সম্পূর্ণ উড়িয়ে দিয়ে কটাক্ষের সুরে বলেন, ‘আমরা তো কংগ্রেসে যাচ্ছি না, তাহলে যাচ্ছে কে? আমি যতদূর জানি লোকসভার ২০ জন বিদ্রোহী সংসদ সদস্য, রাজ্যসভার সদস্যরা কিংবা পশ্চিমবঙ্গের ৬৪ জন তৃণমূল বিধায়ক—কেউই কংগ্রেসে যোগ দেবেন না। ফলে কংগ্রেসের সাথে তৃণমূলের যুক্ত হওয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না।’

অন্যদিকে মমতা ঘনিষ্ঠ তৃণমূল বিধায়ক কুনাল ঘোষ এই বৈঠককে স্বাভাবিক আখ্যা দিয়ে বলেন, ‘কংগ্রেস এবং তৃণমূলের দুই শীর্ষ নেত্রী একে অপরের সঙ্গে বৈঠক করেছেন, তারা তা করতেই পারেন। তবে এই বৈঠকের ভেতরের বিষয়বস্তু নিয়ে এই মুহূর্তে কোনো মন্তব্য করা সমীচীন হবে না।’

ডিডি/কেএএ/