বিশ্বের জনপ্রিয় পাঁচটি শিক্ষা গন্তব্য- যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের প্রথম পছন্দ ছিল। তবে গত দুই বছরে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত পরিবর্তনের কারণে শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ এখন অস্ট্রেলিয়ার দিকে ঝুঁকছে।
Advertisement
ফলে অস্ট্রেলিয়ায় শিক্ষার্থী যাওয়ার প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তবে সম্প্রতি দেশটিতে স্টুডেন্ট ভিসা আবেদন প্রত্যাখ্যানের হারও বেড়েছে। কয়েক দিন আগে প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, বর্তমানে স্টুডেন্ট ভিসা আবেদন বাতিলের হার ৪০ শতাংশে পৌঁছেছে। আগে এই হার ছিল ২৫ শতাংশ।
স্বাভাবিকভাবেই এতে বিদেশে পড়তে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আসুন জেনে নিই কী কারণে ভিসা বাতিল হচ্ছে এবং কীভাবে তা এড়ানো সম্ভব-
অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের একাংশ/ ছবি: বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেসবুক পেজ থেকে
Advertisement
কেন অস্ট্রেলিয়ার দিকে ঝুঁকছেন শিক্ষার্থীরা?
বহু বছর ধরে অস্ট্রেলিয়া শিক্ষার্থীবান্ধব নীতি অনুসরণ করে আসছে। বর্তমানে ‘বিগ ফাইভ’ দেশের মধ্যে অস্ট্রেলিয়াকে সবচেয়ে সুবিধাজনক গন্তব্য বলা যায়। ২০২৩ সাল পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের জন্য প্রায় সব দেশই উন্মুক্ত ছিল। এরপর কানাডার নিয়মে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রেও নানা নীতিগত পরিবর্তন হয়।
তিনি বলেন, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে এইচ-১বি (H1B) ভিসা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। অন্যদিকে কানাডায় পোস্ট-স্টাডি ওয়ার্ক পারমিট ও স্থায়ী বসবাসের (PR) পথও স্পষ্ট নয়। ফলে ধীরে ধীরে শিক্ষার্থীদের বড় অংশ অস্ট্রেলিয়ার দিকে চলে এসেছে।
১০ জনে চারজনের ভিসা আবেদন বাতিল
Advertisement
প্রতিটি দেশেই কিছু আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়, কারণ সব আবেদনকারী প্রকৃত শিক্ষার্থী নন। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে অস্ট্রেলিয়ায় ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার ছিল প্রায় ২৫ শতাংশ। অর্থাৎ ৭৫ শতাংশ শিক্ষার্থী ভিসা পেতেন। এখন প্রত্যাখ্যানের হার বেড়ে ৪০ শতাংশ হয়েছে।
কেন কঠোর হলো নীতি?
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে অস্ট্রেলিয়া ভারতকে ‘লেভেল-৩’ থেকে ‘লেভেল-২’-এ উন্নীত করে। সে সময় অনেক পরামর্শক গুজব ছড়িয়েছিলেন যে অস্ট্রেলিয়ার জন্য আর আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণ বা ভাষাগত যোগ্যতার সনদ প্রয়োজন হবে না। এই গুজবের কারণে প্রকৃত শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি অনেক অপ্রকৃত আবেদনকারীও অস্ট্রেলিয়ার জন্য আবেদন করতে শুরু করেন।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে অস্ট্রেলিয়া ভারতকে আবার ‘লেভেল-৩’-এ ফিরিয়ে আনে এবং নীতিমালা কিছুটা কঠোর করে। এরপর কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের আর্থিক অবস্থা, কোর্সের সঙ্গে পূর্ববর্তী শিক্ষার সম্পর্ক এবং তাদের প্রকৃতপক্ষে পড়াশোনার উদ্দেশ্য আছে কি না- এসব বিষয় আরও গভীরভাবে যাচাই শুরু করে।
তার মতে, এসব কারণেই বর্তমানে প্রত্যাখ্যানের হার প্রায় ৪০ শতাংশে পৌঁছেছে। তবে যাদের নথিপত্র সঠিক এবং আর্থিক সক্ষমতা ভালো, তাদের এখনও ভিসা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
যেসব কারণে আবেদন বাতিল হতে পারে
১. উদ্দেশ্য শুধু বসবাসের হলে
ভিসা কর্মকর্তারা দেখতে চান আবেদনকারীর মূল উদ্দেশ্য পড়াশোনা কি না। যদি তারা মনে করেন, আবেদনকারী স্থায়ী বসবাসের উদ্দেশ্যে যাচ্ছেন, তাহলে আবেদন বাতিল হতে পারে।
২. কোর্সের সঙ্গে পূর্ববর্তী শিক্ষার সম্পর্ক না থাকা
একজন বি.কম শিক্ষার্থী যদি বাণিজ্য সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ভর্তি হন, তাহলে সমস্যা নেই। কিন্তু কোনো শিক্ষাগত পটভূমি বা অভিজ্ঞতা ছাড়াই যদি তিনি তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) বিষয়ে ভর্তি হতে চান, তাহলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
৩. আর্থিক নথিতে ধারাবাহিকতার অভাব
আর্থিক নথিতে ধারাবাহিকতা না পেলে অস্ট্রেলিয়া ভিসা বাতিল করে দেয়। ধরা যাক, কেউ ২০ লাখ রুপির তহবিল দেখালেন। তখন সেই অর্থ কোথা থেকে এসেছে, তারও প্রমাণ দিতে হবে। অস্ট্রেলিয়ার ইমিগ্রেশন বিভাগ এসব তথ্য যাচাই করে। অর্থের উৎস পরিষ্কার না হলে আবেদন বাতিল হতে পারে।
৪. আয়কর রিটার্নে অসঙ্গতি
যদি কোনো বছরে ৭ লাখ টাকা আয় দেখানো হয় ও পরের বছরে তা ১৪ লাখ টাকায় পৌঁছে যায়, তাহলে অতিরিক্ত ৭ লাখ টাকার উৎস ব্যাখ্যা করতে হবে। ব্যাংক বিবরণীসহ সব প্রমাণপত্র থাকতে হবে। কেউ কৃষি আয় দেখালে সেই অর্থের লেনদেন ব্যাংকে প্রতিফলিত হতে হবে। শুধু নগদ আয়ের দাবি কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করে না।
যদি আবেদনকারী ব্যবসা করেন, তাহলে ব্যবসার নিবন্ধনসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে হবে।
৫. ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বাস্তবসম্মত না হওয়া
শিক্ষার্থীদের দেখাতে হয়, পড়াশোনা শেষে দেশে ফিরে কী ধরনের সুযোগ পাবেন। কেউ যদি দাবি করেন, অস্ট্রেলিয়া থেকে পড়ে দেশে ফিরে সঙ্গে সঙ্গে ১৫ লাখ টাকা বেতনের চাকরি পাবেন, অথচ বাস্তবে সেটি সম্ভব নয়, তাহলে ইমিগ্রেশন বিভাগ সেই দাবিকে অবাস্তব মনে করতে পারে ও আবেদন বাতিল করতে পারে।
৬. ভুল নথি জমা দেওয়া
অনেক সময় পরামর্শক স্টেটমেন্ট অব পার্পাস বা এসওপি (SOP) লিখে দেন, কিন্তু শিক্ষার্থী নিজেই জানেন না সেখানে কী লেখা আছে। এ ধরনের অসঙ্গতি ধরা পড়লে আবেদন বাতিল হতে পারে।
৭. শুধু ঋণ দেখানো
কিছু শিক্ষার্থী নিজের অর্থ থাকলেও শুধু শিক্ষা ঋণ দেখান। যেমন- কারও যদি ৬০ লাখ টাকার ঋণ অনুমোদিত থাকে ও ভিসার জন্য ৪৫ লাখ টাকা দেখাতে হয়, তাহলে তিনি ভাবতে পারেন এটাই যথেষ্ট। কিন্তু যদি তার নিজের কোনো আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণ না থাকে, তাহলে আবেদন বাতিল হতে পারে।
তাই যারা ঋণের মাধ্যমে আবেদন করছেন, তাদের নিজস্ব অর্থও যতটা সম্ভব নথিতে দেখাতে হবে।
প্রকৃত আবেদনকারীদের ঝুঁকি কম
স্থায়ী বসবাসের আবেদনেও প্রত্যাখ্যান দেখা যায়। কেউ যদি স্থানীয় একটি বৈদ্যুতিক দোকানে কাজ করেও নিজেকে সিনিয়র ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার দাবি করেন, তাহলে কর্তৃপক্ষ বিষয়টি যাচাই করবে।
প্রয়োজনে প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে তথ্য চাইতে পারে, ওয়েবসাইট পরীক্ষা করতে পারে, এমনকি সরেজমিনেও খোঁজ নিতে পারে। তবে নথিপত্র ও তথ্য সত্য হলে আবেদন বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম।
নিয়ম পরিবর্তন সবার ওপর একসঙ্গে প্রযোজ্য নয়
অস্ট্রেলিয়া এখনো জনপ্রিয় থাকার অন্যতম কারণ হলো নিয়ম পরিবর্তনের প্রভাব সীমিত রাখা। পরামর্শকদের মতে, অস্ট্রেলিয়ায় নতুন নিয়ম এলে তা সব শিক্ষার্থীর ওপর একসঙ্গে প্রয়োগ করা হয় না। অন্যদিকে, কানাডায় নিয়ম পরিবর্তন হলে তা দেশটিতে অবস্থানরত ও নতুন আবেদনকারী- উভয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হয়।
অস্ট্রেলিয়ায় সাধারণত শিক্ষার্থী যে নিয়মে ভর্তি হয়েছেন, সেই নিয়মই তার ক্ষেত্রে কার্যকর থাকে। নতুন নিয়মের প্রভাব যতটা সম্ভব সীমিত রাখার চেষ্টা করে সরকার।
কেন অস্ট্রেলিয়া?
প্রত্যাখ্যানের হার বেশি হলেও অস্ট্রেলিয়া এখনো শিক্ষার্থীদের জন্য শীর্ষ গন্তব্য। কারণ দেশটিতে এখনো পড়াশোনা, কাজের সুযোগ ও স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ বিদ্যমান।
২০২৩ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে অস্ট্রেলিয়ায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা মাত্র ৩ থেকে ৪ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে একই সময়ে কানাডায় এ হার প্রায় ৫০ শতাংশ।
কাজের সময় আরও বাড়তে পারে
অস্ট্রেলিয়ায় আগে শিক্ষার্থীরা ১৫ দিনে ৪০ ঘণ্টা কাজ করতে পারতেন। এখন তারা ৪৮ ঘণ্টা কাজ করতে পারেন। এই সীমা ৬০ ঘণ্টায় উন্নীত করার একটি প্রস্তাবও জমা দেওয়া হয়েছে। এটি প্রমাণ করে অস্ট্রেলিয়া আরও বেশি আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী আকৃষ্ট করতে চায়।
পোস্ট-স্টাডি ভিসার মেয়াদও বেড়েছে
আগে পোস্ট-স্টাডি ওয়ার্ক ভিসা ২ থেকে ৩ বছরের জন্য দেওয়া হতো। এখন কিছু ক্ষেত্রে তা ৫ বছর পর্যন্ত হতে পারে। কেউ যদি তাসমানিয়া বা ডারউইনের মতো এলাকায় দুই বছরের মাস্টার্স সম্পন্ন করেন, তাহলে তিনি ৫ বছরের পোস্ট-স্টাডি ওয়ার্ক ভিসা পেতে পারেন। অর্থাৎ পড়াশোনা ও কাজ মিলিয়ে তিনি মোট ৭ বছর পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ায় থাকতে পারেন।
সূত্র: ভাস্কর নিউজ, বিজনেস স্টানর্ডার্ড
এসএএইচ