একুশে বইমেলা

প্রেমাটিয়া: তাঁতি জনগোষ্ঠীর উপাখ্যান

মেহেদী হাসান তন্ময়

Advertisement

১৯৯৭ সালে প্রেমাটিয়া উপন্যাসটি বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশের পরপরই বইটি নিয়ে পত্র-পত্রিকায় আলোচনা হয়। তারই ধারাবাহিকতায় বইটি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ গবেষণাগ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। বইটি নিয়ে আলোচনার হওয়ার কারণ সম্পর্কে বলা যায়, প্রত্যন্ত অঞ্চলের তন্ত্রবায় বা তাঁতি শ্রেণিকে নিয়ে লেখা এটাই প্রথম উপন্যাস।

উপন্যাসের পটভূমি কুষ্টিয়ার কুমারখালীর একটি গ্রাম। সেই গ্রামের রূপক নাম প্রেমাটিয়া। সেই গ্রামের তাঁত ও তাঁতি জীবনের দুঃখ-কষ্ট, আশা-নিরাশা, আকাঙ্ক্ষা-ক্ষোভ, আনন্দ-বেদনা, দ্রোহ-বিদ্রোহ, প্রেম-পরিণয়, লেবাসধারী বে-শরা ভণ্ড প্রকৃতির নেশাখোর বাউলদের অনৈতিক জীবনাচার ইত্যাদি নানা অনুষঙ্গ তুলে ধরা হয়েছে উপন্যাসটিতে।

বাংলা সাহিত্যে তাঁতশিল্পের উপাখ্যান খুঁজে পাওয়া বড়ই দুষ্কর, এটাই স্বাভাবিক। ঔপন্যাসিক তাঁত অধ্যুষিত প্রেমাটিয়া গ্রামের বাস্তব নির্যাস থেকে কুসংস্করাচ্ছন্ন তাঁতি জনগোষ্ঠীর একটি ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছেন পরম মমতায়। ভাষাভঙ্গিও কুষ্টিয়া অঞ্চলের মানুষের চলতি সংস্কৃতি।

Advertisement

সাম্প্রতিক এবং আগামীর কথাসাহিত্য জগতে প্রেমাটিয়া একটি সামাজিক আন্দোলন আর গ্রন্থাকার মানব অস্তিত্বের নান্দনিক ভাষ্যকার। প্রেমাটিয়ার স্বোপার্জিত শব্দ ও নন্দনলোকের বরপুত্র এই কথাসাহিত্যিক প্রেমাটিয়ার মধ্য দিয়ে সমকালীন কথাসাহিত্যের তাৎপর্যপূর্ণ কারুকৃৎ।

আরও পড়ুন বই আলোচনা / ট্রাপিজিয়াম মানুষের আয়নারা: কবিতার ভেতরে জ্যামিতির রেখা

প্রেমাটিয়া গ্রামের তাঁতি ছদ্দিনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে উপন্যাসের কাহিনি। বে-শরা এই ভণ্ড প্রথম যৌবনে বিয়ে করে প্রেম করে। পিরের শিষ্যত্ব গ্রহণ করে সে দ্বিতীয়বার বিয়ে করে। পিরের মতো সেও পির হওয়ার বাসনায় পিরের কথামতো মোক্ষ লাভের আশায় কুমারি মেয়েকে বিয়ের জন্য দ্বিতীয় স্ত্রীর খালাতো বোনকে ফুসলিয়ে বাড়িতে আনে। চলে বিয়ের প্রস্তুতি।

উপন্যাসের প্রধান প্রান্ত দুটি। প্রথম প্রান্ত ছদ্দিন-পরী-মনু-ছোকমদ্দিনকে ঘিরে। দ্বিতীয় প্রান্ত ভণ্ড সাধু ছদ্দিন-প্রতারক গুরু দেওয়ান আতর আলি-নানা প্রতারণার সহযোগী শুকুরন এবং ছদ্দিন-শুকুরনের ভোগলিপ্সার যৌনাবলি নিষ্পাপ কিশোরী রেনুকে ঘিরে। একসময়ের সচ্ছল তাঁতি ছদ্দিন প্রেমের ফাঁদে আটকে হিন্দু পরিবারের সোমত্ত কন্যা পরীকে ভাগিয়ে এনে যৌবনে সংসার পাতে। লজ্জা ও ঘৃণায় পরীর পরিবার সেসময় ভিটে-মাটি ছেড়ে দেশত্যাগী হয়। একসময় জন্মভিটা ছেড়ে, নিজের ধর্ম-সংস্কৃতি ছেড়ে, কুল-কলঙ্ক মাথায় নিয়ে পরী ঠাঁই পেতে চেয়েছিল মুসলমান ছদ্দিনের ঘরে।

উপন্যাসের মূলভাব তুলে ধরা দুষ্কর! উপন্যাসটি মূলত প্রেমাটিয়া গ্রামের তাঁতি শ্রমিকদের প্রেক্ষাপট, গ্রামের সরল সাধারণ মানুষের সুশিক্ষা ও স্বশিক্ষার অভাবের সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন কুসংস্কার এবং কলাকৌশলের মাধ্যমে খেটে খাওয়া শ্রমিকদের নিম্নমান জীবনযাত্রায় উচ্চ ও মধ্যমানীওদের প্রভাব নেতিবাচক। পাশাপাশি নারীদের অধিকার ক্ষুণ্ন, সম্মানহানি ও যৌনাচারের প্রভাব বিদ্যমান।

Advertisement

প্রত্যন্ত অঞ্চলের তন্ত্রবায় বা তাঁতি শ্রেণিকে নিয়ে লেখা এটাই প্রথম উপন্যাস। যেখানে তাঁতি শ্রেণির সুখ, দুঃখ, শ্রম, কষ্ট প্রকাশ ও নিরাময় সংলগ্ন সমাপ্তিতে উপসংহার টানেন উপন্যাসটির প্রিয় লেখক সোহেল আমিন বাবু। কুসংস্কার আর ভণ্ডামি, লেবাসধারী, ধর্মভীরুতার অভিকর্ষে ভণ্ডপির দল ভারী করে ছলনায় বিভিন্ন কৌশলে কৃষক শ্রমিক ও তাঁতিদের শোষণ করে তাদের অধিকার হরণ এবং ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করে। যেখানে তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার মান ক্ষুণ্ন করা হয়।

আরও পড়ুন বই আলোচনা / আহত কিছু গল্প: হারিয়ে ফেলা সময়

মধ্যযুগের ন্যায় নারীদের প্রাপ্য সম্মান এবং স্বাধীনতা নষ্ট করা হয়। নারীদের সাথে অবৈধ যৌনাচার খুবই স্বাভাবিক পন্থা এবং নারীদের অত্যাচার, অধিকার হরণ খুবই স্বাভাবিক। ফলে নারীদের সম্মান, জীবনযাত্রার মান হুমকির মুখে। যেখানে নারীদের যৌন নির্যাতন খুবই সম্ভাব্য ব্যাপার।

কুসংস্কার, ভণ্ডপির, ব্যবসায়ী, অর্থ ও নারী চাহিদাধারীদের জন্য একটি সমাজ, একটি জাতি, একজন কৃষক, একজন শ্রমিক, একজন সাধারণ মানুষ দৈনন্দিন জীবনযাত্রার মান হারায়। ফলে একটি সমাজ অভিশপ্ত, নোংরা ও ঘৃণিত হয়ে ওঠে ব্যক্তি-অন্তরে। মনুষ্যত্বহীন এবং অর্থ ও নারী লোভী মধ্যস্থরীয় ভণ্ড কাপুরুষত্বের প্রভাবে একটি সমাজের মানহানি অনিবার্য।

উপন্যাসের দু’চারটি পাতার কয়েকটি অংশ ছাড়া বাকি সবই ভালো লেগেছে। যেহেতু উপন্যাসটির ভেতরে ভণ্ডামির কারখানা; সেহেতু গালি ব্যবহার করা খুব অযৌক্তিক না হলেও ব্যাপারটি আমার পছন্দ হয়নি। তারপরও অসাধারণ আরেকটি বইয়ের সাথে পরিচিত হলাম। আবেগ, বিরহ, প্রেম, দ্রোহ এবং বাস্তবতার সংমিশ্রণে উপন্যাসটির সমাহার।

সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো, উপন্যাসটির শেষ পর্যন্তই কৌতূহল। লেখক প্রেমাটিয়াকে পাঠকের আকর্ষণে আনতে উপন্যাসটির সুন্দর সাবলীল কথন এবং নিরঙ্কুশ গুছিয়ে সাজিয়ে তুলতে পারার ব্যাপারটা পাঠককে অনায়াসে কৌতূহলের সাথে শেষ পর্যন্ত ধরে রাখার ক্ষমতা রাখে! চরিত্রগুলোর সাথে গল্পের খুব সুন্দর সমন্বয় হয়েছে। যা একজন পাঠকের মনোনীত হতে পারে নির্দ্বিধায়। আরেকটি বিষয় হলো, উপন্যাসে ব্যবহার করা শব্দ এবং বাক্যগুলো খুব ভারী ও শক্ত, যা একটি বইয়ের আভিজাত্য বাড়িয়ে তোলে।

আরও পড়ুন বই আলোচনা / পৃথিবীর মৃত্যুদণ্ডপত্র: প্রকৃতি ও মানুষের সমীপে

বই: প্রেমাটিয়ালেখক: সোহেল আমিন বাবুপ্রকাশক: কিংবদন্তী পাবলিকেশনপ্রকাশকাল: বইমেলা ২০২৫মূল্য: ৩৩৩ টাকা।

এসইউ