১৯৩০ সাল থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত ফুটবলের ২২টি বিশ্বকাপে ৮০টিরও বেশি দেশ অংশ নিয়েছে। অথচ সোনালি ট্রফি উঁচিয়ে ধরার সৌভাগ্য হয়েছে মাত্র আটটি দেশের। কিন্তু কেন? কী সেই ‘গোপন সূত্র’, যার জন্য ঘুরেফিরে এই আট দেশই বিশ্বকাপ (FIFA World Cup) জেতে? কেন হাতেগোনা কয়েকটি দেশ বছরের পর বছর ফুটবলে রাজত্ব করে যাচ্ছে?
Advertisement
প্রশ্নটি শুধু ফুটবলপ্রেমীদেরই নয়, ভাবিয়ে তুলেছে বিশ্বনেতাদেরও। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং থেকে শুরু করে সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান—সবাই ফুটবলের এই বৈশ্বিক গৌরব পেতে মরিয়া। কারণ, মাঠের সাফল্য শুধু খেলাধুলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি দেশের মানুষের মনস্তত্ত্ব বদলে দেয় এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করে। কিন্তু বিশ্বমঞ্চে এই গৌরব অর্জন করা মোটেও সহজ নয়।
আরও পড়ুন ফুটবলে এটাই হতে পারে শেষ বিশ্বকাপ, কারণ কী?বিশ্বখ্যাত সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট সম্প্রতি একটি গাণিতিক মডেলের মাধ্যমে ফুটবলের এই সাফল্যের সূত্র খোঁজার চেষ্টা করেছে। দলগুলোর পারফরম্যান্স পরিমাপের জন্য তারা দাবা খেলা থেকে অনুপ্রাণিত ‘এলো রেটিং’ (Elo rating) পদ্ধতি ব্যবহার করেছে। একটি দেশের রাজনৈতিক কাঠামোর শক্তি থেকে শুরু করে সে দেশের পুরুষদের গড় উচ্চতা—নানা চলক বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ফুটবল সাফল্যের পেছনে মূলত চারটি বড় কারণ কাজ করে।
সাফল্যের চার স্তম্ভ: অর্থ, জনসংখ্যা, উচ্চতা ও ভূগোলদ্য ইকোনমিস্টের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, একটি দেশের ফুটবল শক্তির ৭০ শতাংশই নির্ভর করে তার অর্থনৈতিক সক্ষমতা, জনসংখ্যা, খেলোয়াড়দের উচ্চতা এবং ভৌগোলিক অবস্থানের ওপর।
Advertisement
ধনী দেশগুলো কোচিং, আধুনিক সুযোগ-সুবিধা এবং যুব একাডেমি উন্নয়নে প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করতে পারে। তবে শুধু অর্থই শেষ কথা নয়। যুক্তরাষ্ট্র (USA) অত্যন্ত ধনী দেশ হলেও তাদের বিনিয়োগের বড় অংশ চলে যায় বাস্কেটবল বা আমেরিকান ফুটবলের মতো অন্য খেলায়। আবার মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলো ফুটবল-পাগল হওয়া সত্ত্বেও মাঠে আশানুরূপ পারফরম্যান্স দেখাতে পারছে না।
আরও পড়ুন বারে ৩ বার বল লাগলে গোল, চোটের ভান করলেই শাস্তি?জনসংখ্যার আকারও একটি বড় ফ্যাক্টর, কারণ বড় জনসংখ্যা মানেই প্রতিভার বড় ভাণ্ডার। কিন্তু চীন বা ভারত তার বড় প্রমাণ যে, শুধু কোটি কোটি মানুষ থাকলেই বিশ্বকাপ জেতা যায় না। শতকোটি জনসংখ্যার এই দুটি দেশ ইতিহাসে মাত্র একবারই (চীন, ২০০২ সালে) বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে।
উচ্চতার ক্ষেত্রে দেখা গেছে, গোলরক্ষক বাদে মাঠের বাকি খেলোয়াড়দের জন্য আদর্শ উচ্চতা হলো ১৮১ সেন্টিমিটার (প্রায় ৫ ফুট ১১ ইঞ্চি)। কোনো দেশের পুরুষদের গড় উচ্চতা এই মাপকাঠি থেকে যত কম বা বেশি হবে, ফুটবলে তাদের পারফরম্যান্স তত খারাপ হওয়ার প্রবণতা দেখা যায়।
তবে সবচেয়ে শক্তিশালী এবং অপরিবর্তনশীল চলকটি হলো ভূগোল ও ফুটবল সংস্কৃতি। দক্ষিণ আমেরিকার দলগুলোর ‘এলো রেটিং’ এশিয়ার দলগুলোর চেয়ে গড়ে ৬৪০ পয়েন্ট বেশি। অর্থাৎ, দক্ষিণ আমেরিকার দলগুলোর এশিয়ার দলগুলোকে হারানোর সম্ভাবনা ৯০ শতাংশেরও বেশি। ইউরোপের ক্ষেত্রেও এই সুবিধা খাটে।
Advertisement
ইউরোপে বর্তমানে দুই লাখেরও বেশি লাইসেন্সধারী কোচ রয়েছেন, যা অন্য যে কোনো মহাদেশের চেয়ে অনেক বেশি। উদাহরণস্বরূপ, ভারতে যেখানে এশিয়ার সর্বোচ্চ স্তরের লাইসেন্সধারী কোচ রয়েছেন মাত্র ৫০ জনের মতো; সেখানে স্পেনে (যার জনসংখ্যা ভারতের মাত্র পাঁচ শতাংশ) সমমানের কোচের সংখ্যা দুই হাজারেরও বেশি।
আরও পড়ুন ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা নয়, বিশ্বকাপ তবে কার জেতা উচিত? জাপান ও সেনেগালের দুই ভিন্ন পথএই বৈষম্যের কারণে ফুটবলের শীর্ষ স্থানগুলো বছরের পর বছর একই দেশের দখলে থাকে। ১৯৭৬ সালে র্যাংকিংয়ের শীর্ষ ২৫ শতাংশে থাকা দেশগুলোর চার-পঞ্চমাংশই আজও সেখানেই অবস্থান করছে। তবে এই বৃত্ত ভাঙা যে অসম্ভব নয়, তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ জাপান।
১৯৯৮ সালের আগে জাপান কখনো বিশ্বকাপে খেলেনি। অথচ এরপর থেকে তারা একটি বিশ্বকাপও মিস করেনি। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে জার্মানি ও স্পেনের মতো পরাশক্তিকে হারিয়ে তারা চমক দেখিয়েছে। অথচ ১৯৯০-এর দশকের পর থেকে জাপানের অর্থনীতি বা জনসংখ্যা কোনোটিই বাড়েনি।
তাদের এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে একটি সুদূরপ্রসারী দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। ১৯৯২ সালে জাপান তাদের ঘরোয়া লিগ সংস্কার করে ‘১০০ বছরের রূপকল্প’ (Hundred Year Vision) ঘোষণা করে, যার লক্ষ্য ২০৯২ সালের মধ্যে দেশে ১০০টি পেশাদার ক্লাব গড়ে তোলা। তৃণমূল পর্যায় থেকে একাডেমি গড়ে তোলার এই ‘বটম-আপ’ কৌশলের কারণেই আজ জাপানি ফুটবলাররা বিশ্বমানের তারকা হয়ে উঠেছেন। অন্যদিকে, চীন অলিম্পিকের মতো ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে ফুটবল উন্নয়নের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে।
আরও পড়ুন ফুটবলে ‘সবচেয়ে দুর্বল’ দেশ: সান ম্যারিনো সম্পর্কে মজার কিছু তথ্যজাপানের এই পদ্ধতিটি সফল হলেও তা অত্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যয়বহুল।
অনুন্নত বা দরিদ্র দেশগুলোর জন্য সাফল্যের আরেকটি দ্রুততম রাস্তা রয়েছে: প্রবাসী প্রতিভাদের দলে টানা বা ‘ইম্পোর্টিং ট্যালেন্ট’। সেনেগাল তাদের দেশে ফুটবলের অবকাঠামো উন্নত না করেই র্যাংকিংয়ের শীর্ষে উঠে এসেছে। এবারের বিশ্বকাপে সেনেগাল দলের প্রায় অর্ধেক খেলোয়াড়ই ফ্রান্সে বেড়ে ওঠা সেনেগালিজ অভিবাসীদের সন্তান।
পরিসংখ্যান বলছে, ১৯৯৪ সালে যেখানে মাত্র নয় শতাংশ ফুটবলার নিজের জন্মভূমি বাদে অন্য দেশের হয়ে আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলতেন, আজ ২০২৬ সালে এসে সেই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৪ শতাংশে। মরক্কো গত বিশ্বকাপে প্রথম আফ্রিকান দেশ হিসেবে সেমিফাইনালে উঠেছিল, যাদের ২৬ জন খেলোয়াড়ের মধ্যে ১৪ জনই ছিলেন বিদেশি বংশোদ্ভূত। কাতার এবং চীনও অন্য দেশের খেলোয়াড়দের নাগরিকত্ব দিয়ে নিজেদের ফুটবল শক্তি বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
‘ডাইভারসিটি’র প্রভাবঅভিবাসন ও বৈচিত্র্য ফুটবল দলের পারফরম্যান্স নাটকীয়ভাবে বাড়িয়ে দেয়। ২০২৩ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, দলের ভেতর বংশগত বা জাতিগত বৈচিত্র্য (Ancestral diversity) যত বেশি হয়, মাঠের ফলাফল তত ভালো আসে।
আরও পড়ুন ফুটবল বিশ্বকাপ নিয়ে মানুষের আগ্রহ এবার এত কম কেন?এবারের বিশ্বকাপে অন্যতম ফেবারিট ফ্রান্স দলটির প্রায় পুরো অংশই গড়ে উঠেছে অভিবাসী পরিবার থেকে আসা সন্তানদের নিয়ে। স্পেনের বর্তমান ফুটবল বিস্ময় লামিন ইয়ামাল মরক্কো ও ইকুয়েটোরিয়াল গিনি থেকে আসা অভিবাসী দম্পতির সন্তান। ইংল্যান্ডের আক্রমণভাগ সামলাচ্ছেন বুকায়ো সাকা (নাইজেরিয়ান বংশোদ্ভূত) এবং মার্কাস রাশফোর্ড (ক্যারিবিয়ান বংশোদ্ভূত)।
তবে সফল ফুটবল দলগুলোর এই জাতিগত বৈচিত্র্য প্রায়শই বর্ণবাদ ও অভিবাসন বিরোধীদের ক্ষোভের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, বহুমাত্রিক বা বৈচিত্র্যময় দলগুলো যখন জয়ী হয়, তখন সমাজে অভিবাসীদের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়ে। কিন্তু দল হেরে গেলেই কৃষ্ণাঙ্গ ও অভিবাসী খেলোয়াড়দের ওপর বর্ণবাদী আক্রমণ নেমে আসে এবং কট্টর ডানপন্থিদের জনপ্রিয়তা বাড়ে। ফলে, ফুটবল মাঠে জয় বা পরাজয় এখন আর কেবল ট্রফি জেতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি সামাজিক ও রাজনৈতিক সমীকরণেরও বড় অংশ হয়ে উঠেছে।
সূত্র: দ্য ইকোনমিস্টকেএএ/