আন্তর্জাতিক

পানির দামে সিগারেট পাওয়া যায় যেসব দেশে

ধূমপানবিরোধী প্রচারণা এবং তামাকের ওপর উচ্চহারে কর আরোপের কারণে বিশ্বজুড়ে সিগারেটের দাম প্রতিনিয়ত বাড়ছে। অস্ট্রেলিয়া বা নিউজিল্যান্ডের মতো দেশে এক প্যাকেট সিগারেটের (cigarette) দাম বাংলাদেশি মুদ্রায় তিন থেকে চার হাজার টাকা ছাড়িয়েছে। তবে এর ঠিক বিপরীত চিত্রও রয়েছে। বিশ্বে এমন কিছু দেশ আছে, যেখানে পানির দামে মিলছে তামাকজাত পণ্য। কিন্তু সিগারেটের দাম সবচেয়ে কম কোন দেশে?

Advertisement

গ্লোবাল ডাটাবেজ ও তামাক নিয়ন্ত্রণ সংস্থাগুলোর সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বে সবচেয়ে সস্তায় সিগারেট বিক্রি হয় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ লাওস এবং আফ্রিকার মালাউই, বেনিন ও মালিতে। এসব দেশে নামমাত্র মূল্যে ধূমপায়ীরা সিগারেট কিনতে পারছেন।

সবচেয়ে কম দাম যে দেশে

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জীবনযাত্রার ব্যয় এবং বাজারদর পর্যবেক্ষণকারী আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম নামবিও কস্ট অব লিভিং (Numbeo Cost of Living)-এর সর্বশেষ তথ্য এবং আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্য বিষয়ক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এশিয়ায় তথা পুরো বিশ্বে সবচেয়ে সস্তায় সিগারেট মেলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ লাওসে। দেশটিতে এক প্যাকেট (২০ শলাকা) সিগারেটের গড় মূল্য মাত্র ০ দশমিক ৩২ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩৮ থেকে ৪০ টাকার সমান।

আরও পড়ুন সিগারেটের দাম বাড়ছে

লাওসের পাশাপাশি আফ্রিকার কয়েকটি দেশ এবং এশিয়ার কিছু অঞ্চলেও সিগারেটের দাম অত্যন্ত কম। নিচে বিশ্বের সবচেয়ে সস্তা কয়েকটি দেশের সিগারেটের বাজারদরের চিত্র তুলে ধরা হলো:

Advertisement

মালাউই: আফ্রিকার এই দেশে এক প্যাকেট সিগারেটের দাম প্রায় ০ দশমিক ৮৯ ইউরো বা প্রায় ১১৫ টাকা।

বেনিন ও মালি: পশ্চিম আফ্রিকার এই দেশ দুটিতে প্রতি প্যাকেট সিগারেট বিক্রি হচ্ছে যথাক্রমে ০ দশমিক ৯১ ও ০ দশমিক ৯২ ইউরোতে (প্রায় ১২০ টাকা)।

ভিয়েতনাম: এশিয়ার অন্যতম সস্তা বাজার এটি। এখানে এক প্যাকেট মার্লবোরো বা সমমানের সিগারেটের দাম ১ দশমিক ০৫ থেকে ১ দশমিক ১৫ ডলার (১২৫-১৩৫ টাকা)।

পাকিস্তান: দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশে প্রতি প্যাকেট সিগারেটের গড় মূল্য প্রায় ২ দশমিক ১৪ মার্কিন ডলার (২৫০-২৬০ টাকা)।

Advertisement

লাওসে সিগারেটের দাম এত কম কেন?

একটি দেশে যেখানে জীবনযাত্রার সাধারণ খরচ প্রতিনিয়ত বাড়ছে, সেখানে সিগারেটের দাম এত কম কীভাবে থাকে? মার্কিন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম রেডিও ফ্রি এশিয়ার একটি বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এর পেছনের মূল রহস্য ফাঁস করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০১ সালের দিকে লাওস সরকার ব্রিটিশ বহুজাতিক তামাক কোম্পানি ‘ইম্পেরিয়াল ব্র্যান্ডস’-এর সঙ্গে ২৫ বছর মেয়াদি একটি বিশেষ চুক্তি সই করে। এই চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, দেশটিতে তামাকের ওপর ট্যাক্স বা এক্সাইজ ডিউটি (সম্পূরক শুল্ক) একটি নির্দিষ্ট সীমার ওপর বাড়ানো নিষিদ্ধ করা হয়।

আরও পড়ুন বিশ্বের প্রায় অর্ধেক সিগারেট বিক্রি হয় যে দেশে

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) নীতিমালা অনুযায়ী, তামাকের খুচরা মূল্যের ওপর কমপক্ষে ৭৫ শতাংশ কর ধার্য করা উচিত। অথচ লাওসে সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের ওপর করের হার মাত্র ১২ শতাংশ। সরকারের সঙ্গে তামাক কোম্পানির এই বিশেষ আঁতাত এবং কর ফাঁকির অনৈতিক সুবিধার কারণেই দেশটিতে সিগারেটের দাম দুই দশক ধরে কৃত্রিমভাবে কম রাখা সম্ভব হয়েছে।

অন্য দেশগুলোতে দাম কম হওয়ার কারণ

লাওসের মতো আফ্রিকার মালি, বেনিন কিংবা মালাউইয়ের মতো দেশগুলোতেও তামাকজাত পণ্য সস্তা হওয়ার পেছনে সুনির্দিষ্ট কিছু অর্থনৈতিক কারণ রয়েছে:

দুর্বল তামাক কর নীতি: এসব দেশে জনস্বাস্থ্যের চেয়ে ব্যবসার সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। তামাকের (Tobacco) ওপর সরকারের কর নীতি অত্যন্ত শিথিল ও দুর্বল।

স্থানীয় উৎপাদন ও সস্তা শ্রম: মালাউই ও মালির মতো দেশগুলোর অর্থনীতিতে তামাক একটি প্রধান অর্থকরী ফসল। সেখানে কাঁচামাল বা তামাক পাতার পর্যাপ্ততা এবং সস্তা শ্রমিকের কারণে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো নামমাত্র উৎপাদন খরচে সিগারেট তৈরি করতে পারে।

কালোবাজারি ঠেকানোর অজুহাত: অনেক দেশের সরকারের দাবি, সিগারেটের ওপর অতিরিক্ত কর বসালে পার্শ্ববর্তী দেশগুলো থেকে অবৈধ পথে সিগারেট চোরাচালান বা কালোবাজারি বেড়ে যেতে পারে। এই অজুহাতে তারা করের হার কম রাখে।

আরও পড়ুন ধূমপানের জন্য ক্যাম্পাসে আরও বেঞ্চ দেওয়ার দাবি শিক্ষার্থীর কম দামের কারণে ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি

সিগারেটের দাম কম হওয়া কোনো দেশের জন্য স্বস্তির খবর নয়, বরং এটি একটি মারাত্মক জনস্বাস্থ্য বিপর্যয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং আন্তর্জাতিক তামাক নিয়ন্ত্রণ জোট (SEATCA) এই বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব দেশে সিগারেটের দাম কম, সেসব দেশে তামাকের ব্যবহার ও ধূমপায়ীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেশি।

তরুণ ও শিশুদের আকর্ষণ: দাম কম হওয়ার কারণে স্কুল-কলেজপড়ুয়া কিশোর ও তরুণদের পক্ষে সহজেই সিগারেট কেনা সম্ভব হয়। যুক্তরাজ্যের বাথ ইউনিভার্সিটির টোব্যাকো কন্ট্রোল রিসার্চ গ্রুপের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, লাওসে ১৩ থেকে ১৫ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে ধূমপানের হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে, যার মূল কারণ হাতের নাগালে সস্তা সিগারেট পাওয়া যাওয়া।

উচ্চ মৃত্যুহার: লাওসে পুরুষদের মধ্যে ধূমপানের হার প্রায় ৩৭ শতাংশ থেকে ৪০ শতাংশ। সস্তা সিগারেটের সহজলভ্যতার কারণে দেশটিতে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ ফুসফুসের ক্যানসার, স্ট্রোক, ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ এবং হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছেন।

চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর চাপ: লাওস বা মালির মতো অনুন্নত ও দরিদ্র দেশগুলোর স্বাস্থ্যখাত এমনিতেই দুর্বল। ক্যানসারের মতো ব্যয়বহুল চিকিৎসা বা কেমোথেরাপির খরচ বহন করা গ্রামীণ সাধারণ মানুষের পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। ফলে তামাকজনিত রোগে অকাল মৃত্যুর হার দিন দিন জ্যামিতিক হারে বাড়ছে।

আরও পড়ুন ভারত / প্লেনের ভেতর বিড়ি জ্বালানোয় যাত্রীর বিরুদ্ধে মামলা দাম বাড়ানোই সমাধান

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষকদের মতে, তামাকের ব্যবহার কমানোর সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র হলো এর দাম বাড়িয়ে দেওয়া। পরিসংখ্যান বলছে, মধ্যম ও নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে সিগারেটের দাম যদি ১০ শতাংশ বাড়ানো যায়, তবে তামাকের ব্যবহার গড়ে পাঁচ শতাংশ পর্যন্ত কমে আসে। কিন্তু লাওস বা মালির মতো দেশগুলোতে তামাক কোম্পানিগুলোর একচেটিয়া প্রভাব এবং সরকারের তামাক কর সংস্কারে অনীহার কারণে এই লক্ষ্য অর্জন করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

অর্থনৈতিকভাবে সিগারেট সস্তা মনে হলেও, দীর্ঘমেয়াদে এটি একটি দেশের মানবসম্পদ এবং স্বাস্থ্য খাতের জন্য বিশাল অর্থনৈতিক ক্ষতি ডেকে আনছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, জনস্বার্থ রক্ষায় এখনই কর বাড়িয়ে সিগারেটের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে নিয়ে যাওয়া জরুরি।

সূত্র: নামবিও, রেডিও ফ্রি এশিয়া, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকেএএ/