চলতি বছরের মার্চ মাসে মুক্তি পায় ‘বনলতা এক্সপ্রেস’। পবিত্র ঈদুল আজহার সিনেমার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে এখনও প্রেক্ষাগৃহে চলছে দর্শকনন্দিত সিনেমাটি। ছবির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছেন আজমেরি হক বাঁধন। ঈদুল আজহার বিশেষ অনুষ্ঠান ‘জাগো তারকা’য় অতিথি হয়ে এসেছিলেন অভিনেত্রী। জাগো নিউজকে সূত্র করে মূলধারার অনেক গণমাধ্যম, অনলাইন ও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে তার সেই সাক্ষাৎকারের খণ্ডিত অংশ। অডিয়েন্সের আগ্রহের কারণে ভিডিও সাক্ষাৎকারটির চুম্বক অংশ পাঠকের জন্য তুলে ধরা হলো।
Advertisement
জাগো নিউজ: ‘বনলতা এক্সপ্রেস’-এ কীভাবে যুক্ত হলেন? বাঁধন: আমি শেষ মুহূর্তে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সিনেমায় যুক্ত হয়েছি। আমি কাস্টেড ছিলাম না। আমার জায়গায় অন্য আরেকজন ছিল। তার সঙ্গে কিছু হয়তো মেলেনি। পরে আমাকে বলা হলো, আমি একদম লাস্ট মোমেন্টে কিছু না জেনেই রাজি হয়ে গেছি। আমি জানি আমার স্ক্রিনটাইম কম। বাট আমি তামিমকে (পরিচালক) কথাটা বলেছিলাম যে আমি একটা সুপারহিট সিনেমার পার্ট হতে চাই।
বনলতা এক্সপ্রেস সিনেমার একটি দৃশ্যে চঞ্চল চৌধুরীর সঙ্গে বাঁধন
জাগো নিউজ: আপনাকে পর্দায় তেমন দেখা যাচ্ছে না কেন?বাঁধন: আমার কাজের জায়গায় সংকীর্ণতা তৈরি হয়েছে। যেহেতু আমার ইন্ডিয়ার ভিসাসংক্রান্ত জটিলতা আছে। আমাকে ইন্ডিয়া ভিসা দেয় না। সেক্ষেত্রে প্রায় চার-পাঁচটা কাজ, কলকাতা- বোম্বে মিলে, আমি করতে পারিনি। হয়তো আরও কিছু এক্সপেরিমেন্টাল কাজ করার সুযোগ হতো আর কি…
Advertisement
জাগো নিউজ: আপনার বয়স এখন ৪৩, বলেছেন বিভিন্ন জায়গায় এবং নিজের ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন যে, ৪০-এর পর মনে হচ্ছে জীবন নতুনভাবে আবিষ্কার হচ্ছে। এখানকার মিডিয়ায় মেয়েরা বয়স বলতে চায় না, অভিনেত্রী হলে আরও বলে না। আপনি কোন ভাবনা থেকে একদম অকপটে বলে ফেলেন? বাঁধন: আমি আসলে এই সমাজব্যবস্থাটাকে ভেঙে ফেলতে চাই। তুমি যদি আমাকে জিজ্ঞেস করো যে, তোমার এইম ইন লাইফ কী, আমার এইম ইন লাইফ হচ্ছে আমি পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থাটা ভেঙে চুরমার হয়ে যেতে দেখতে চাই। তো সেটা তো আমার একার পক্ষে করা সম্ভব নয়।
জাগো নিউজ: আপনাকে কিন্তু অনেকে নারীবাদী বলে। আপনি কি সত্যিই তাই?বাঁধন: হ্যাঁ, নারীবাদী বলে। আমি নারীবাদী, আমি অবশ্যই ফেমিনিস্ট। আমার স্বপ্ন হচ্ছে, একটা সময় এই সমাজব্যবস্থা পরিবর্তন হবে। সেক্ষেত্রে আমার কন্ট্রিবিউশন কী হতে পারে? আমার কন্ট্রিবিউশন, ধরো, আমি আসলে চাইলেই অনেক কিছু চেঞ্জ করতে পারবো না। বাট কিছু জিনিস, যেটা আমি জানি, এই সমাজব্যবস্থা আমার ওপরে চাপিয়ে দিয়ে, যেটার জন্য মেয়েরা আসলে সাফার করছে, সেই জায়গাগুলোয় আমি একটা একটা করে, একটু একটু আঘাত করি। সেটার মধ্যে একটা হচ্ছে বয়স নিয়ে। এই যে মেয়েদের মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, তোমার বয়স তুমি বলবে না। এজ লুকাতে তোমাকে সবসময় ইয়াং থাকতে হবে, তোমাকে সবসময় এটা-ওটা করতে হবে। সো আমি যখন বয়সটা বলে দিচ্ছি, আরেকটা মেয়ে কিন্তু এটা থেকে সাহসটা পায় বা তার মনে হয় যে, আসলেই তো আমার এটা লুকানোর কী আছে। এক একটা বয়সের এক একটা সৌন্দর্য থাকে। সমাজ সেই সৌন্দর্য আমাকে উপভোগ করতেই দিচ্ছে না। মানে আমাকে সারাক্ষণ এক ধরনের টেনশনে থাকতে হচ্ছে যে, আমার বয়সটা জেনে গেল নাকি! এখন আমি কি করবো! এই স্ট্রেসগুলা মেয়েদের দেওয়া হয়। এইটা থেকে যাতে একটু রিলিফ পাওয়া যায়… আমি নিজে রিলিফ হচ্ছি এটা বলে …। আরেকটা হচ্ছে যে, ধরো একটা দুইটা মানুষ যদি ইন্সপায়ার হয়ে যায় বাই এনি চান্স আমি তাতেই খুশি।
জাগো নিউজ: জীবনকে আপনি এখন কীভাবে দেখেন?বাঁধন: জীবন সুন্দর। জীবনটা যেভাবে অতিবাহিত করতে পারছি, সেভাবে যাতে করতে পারি। নিজের অনেক ত্রুটি আছে, অনেক কিছু আছে, যেগুলো সংশোধন করতে চাই। আমি সময়ের সাথে আরও অনেক এক্সপ্লোর করতে চাই, ক্যারেক্টার এক্সপ্লোর করতে চাই চাই, লাইফটাকে এক্সপ্লোর করতে চাই। এই তো…
জাগো নিউজ: আপনি সচেতনভাবে নিজেকে অনেক বদলেছেন। আর কোন কোন জায়গায় পরিবর্তন আনতে চান?বাঁধন: আমি এখনও ইমোশনটা ডিল করতে পারি না।
Advertisement
জাগো নিউজ: আপনি কোন ধরনের চরিত্রে অভিনয় করতে চান?বাঁধন: আমারও তো পছন্দ আছে। আমি যে ধরনের ক্যারেক্টার চাই, সেই ক্যারেক্টারগুলো মার্কেটে অ্যাভেলেবল না। দুই নম্বার হচ্ছে, আমাদের ইন্ডাস্ট্রিটা এ রকম যে, আমাদের একটা এজরেঞ্জ থাকে, স্পেশালি এক্ট্রেসদের, যে ধরো ইয়াং এইজে তুমি যে কাজগুলো পাবা, পরপর কাজগুলো করতে পারবা, সেটা তুমি আফটার ৩০ আর করতে পারবা না। আর ৮০ পার হলে তো কথাই নাই। আমি তো ৪৩, সো আমার জন্য ক্যারেক্টার চিন্তা করা মানে ‘রেহানা’ তো ধরো আল্লাহ আমার হাতে ধরে দিয়েছেন।
জাগো নিউজ: আপনার কাছে চরিত্র আসে, নাকি চিত্রনাট্য? বাঁধন: এখন অনেক ধরনের চরিত্র নিয়ে মানুষ আসে। কিছুদিন ভেবেছিলাম, শুধু সিনেমা এবং ওয়েব সিরিজেই ফোকাস করবো। বাট এখন মনে হচ্ছে যে, সারভাইভ করার জন্য মে বি আমাকে আবার নাটকও করতে হবে। সো হ্যাঁ, যদি ওইরকম স্ক্রিপ্ট হয় যে স্ক্রিপ্টে আসলে আমার কিছু করার থাকবে, সেক্ষেত্রে আমি আবার হয়তো নাটকে কাজ শুরু করবো।
জাগো নিউজ: আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কাজ করে এসে আবার নাটক শুরু করাটা কি একধরণের কম্প্রোমাইজ না?বাঁধন: কম্প্রোমাইজ তো করতেই হবে। এই ইন্ডাস্ট্রিতে এবং এই দেশে জন্মানো তো এক ধরনের কম্প্রোমাইজ… সো সেটা তো করে যেতেই হবে। আরেকটা ব্যাপার হচ্ছে, ‘রেহানা’ করার পর আসলে আরেকটা রেহানা পাবো, সেই এক্সপেক্টেশন আমার খুব একটা নাই। বেটার কিছুর জন্য ওয়েট করতে করতে বাসায় বসে মরে যাব না, সেটা তো আর হবে না।
জাগো নিউজ: জীবনের এই পর্যায়ে এসেও আপনি প্রেম-ভালোবাসা নিয়ে অনেকটাই ওপেন। প্রেমকে আপনি এখন এই বয়সে এসে কীভাবে দেখেন? বাঁধন: বুঝতে পারছি না। আরো কমপ্লিকেটেড লাগে। বিকজ আমি জানি না… রিসেন্ট একটা প্রেমে পড়েছিলাম। হ্যাঁ, রিসেন্ট একটা প্রেমে পড়েছিলাম, সেটাও ব্রেক-আপ হয়ে গেল।
জাগো নিউজ: একদম এক্সপেক্ট করিনি আজ আপনার মুখ থেকে এটা শুনবো…বাঁধন: ভেঙে গেল। তারপরে আরেকটা, রিসেন্ট আরেকটা প্রেম হয়েছিল। তিন-চার মাসের মধ্যে ভেঙে গেল। খুব বলছিলাম যে, প্রেম করছি। সেদিন একজন আমাকে টেক্সট করলো, আমাকে বলছে যে, তোমার কী খবর? খবর ভালো, কিন্তু ব্রেক-আপ হয়ে গেছে। সে বললো, আল্লাহ তুমি কি খুশি ছিলা, এখন কি তুমি স্যাড? আমি বলেছি, না আমি স্যাডও না। জাগো নিউজ: প্রেমে থাকতে চান, বিয়ে করবেন না, ব্যাপারটা কি সেরকম?বাঁধন: সত্যি বলছি, গত বছর বিয়ের পরিকল্পনা ছিল। পরিকল্পনা থাকলেও আমার পছন্দ মতো মানুষ পেতে হবে। বিয়ে করার মতো একজনকে পেয়েও ছিলাম। তার মা আমাকে খুব পছন্দ করেছিল। কিন্তু সে ভেগে গেছেন। যেহেতু সে ভেগে গেছেন, এখন আমি বিয়ে করার মতো পাত্র আমার আশেপাশে পাই না। প্রেম করার জন্য দুই একজনকে পেয়েছিলাম। তার মধ্যে একজনের সাথে করেছিলামও। কিন্তু বিয়ে করার জন্য পাত্র বাছােই তো আসলে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিয়ে আমি দুইবার করে ফেলেছি। এখন আবার নিশ্চয়ই আগের ভুলগুলো করা যাবে না।
জাগো নিউজ: ভালোবাসার ক্ষেত্রে কি আপনি আনলাকি? নাকি আপনার ডিসিশন মেকিংয়ে…বাঁধন: না আনলাকি না। আমার কাছে মনে হয় কি যে, আমি অনেক কিছু প্রিটেন্ড করতে পারি না। ওকে, মেয়েরা যেটা অনেকেই অনেক কিছু করতে পারে, প্রিটেন্ড করতে পারাটা কিন্তু একটা আর্ট। ধরো আমি এমনি এমনি ভেবে নিলাম যে আমাকে তুমি ভালোবাসো, এটা আমার মনের সুখ। কিন্তু ওই দিকে ধরো তুমি আমাকে চিট করলে… আবার এগুলো এখন নাকি নরমাল! তুমি চিট করবে, তুমি একটা দুই নাম্বার, তুমি ধরো খারাপ মানুষ, তারপর ধরো আমি একটা এমন অ্যাক্ট করবো যে, এগুলো কিছুই না। অথচ আমার মনে হচ্ছে যে, অনেক মানুষ আছে, যাদের জীবনটা আমার মতো। কিন্তু তারা ভাবে, আহারে আমার কপালটা কি খারাপ। আসলে কপালটা অনেক ভালো, মানে আমি একটা মিথ্যা সম্পর্ককে বয়ে বেড়ানোর চেয়ে সম্পর্কে না থাকা অনেক ভালো।এমআই/এমএমএফ/এমএআর/আরএমডি