অর্থনীতি

পুনরুদ্ধার থেকে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির স্বপ্ন

অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, বিনিয়োগ-কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, আর্থিক খাত সংস্কার ও দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার লক্ষ্য সামনে রেখে পেশ হলো ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব।

Advertisement

৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এ জাতীয় বাজেট প্রস্তাব করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। নতুন সরকারের প্রথম বাজেট হিসেবে এটি অর্থনীতির পুনর্গঠন, আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও টেকসই প্রবৃদ্ধির ভিত্তি তৈরির একটি উচ্চাভিলাষী রূপরেখা হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে।

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী অর্থমন্ত্রী হিসেবে তার প্রথম বাজেটের শিরোনাম দিয়েছেন ‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা’।

এই অভিযাত্রার রূপরেখা তৈরি করতে গিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের অর্থনীতি বর্তমানে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগের ধীরগতি, আর্থিক খাতের দুর্বলতা, বৈদেশিক লেনদেনের চাপ ও দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যাসহ নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে অর্থনীতি পুনরায় প্রবৃদ্ধির পথে ফিরিয়ে আনাই হবে প্রধান লক্ষ্য।

Advertisement

আরও পড়ুন যেসব পণ্যের দাম বাড়বে

সেই বিবেচনায় এবারের বাজেটকে শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, বরং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের একটি কৌশলগত পরিকল্পনা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এই পরিকল্পনায় অর্থমন্ত্রী আগামী অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেন। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি কমিয়ে ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার কথা বলেছেন। তার মতে, অর্থনীতিতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, বিনিয়োগ বাড়ানো এবং উৎপাদনশীল খাত উৎসাহিত করার মাধ্যমে এসব লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে।

আগামী অর্থবছরে কৃষিখাতের বরাদ্দ টাকার অঙ্কে কিছুটা বেড়েছে বটে, তবে মোট বাজেটের তুলনায় এর অংশীদারত্ব কমে গেছে। মূল সমস্যা হলো জাতীয় বাজেট যে হারে বাড়ছে, কৃষিখাতের বরাদ্দ সে হারে বাড়ছে না।-কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম

অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তব্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হচ্ছে ‘অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়ন’। মন্ত্রীর মতে, উন্নয়নের সুফল সমাজের সব স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নতুন বাস্তবতায় একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, যেখানে অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা সীমিত গোষ্ঠীর মধ্যে কেন্দ্রীভূত না থেকে সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে।

১০ অগ্রাধিকার

এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে অর্থমন্ত্রী আগামী অর্থবছরের জন্য ১০টি প্রধান অগ্রাধিকার নির্ধারণ করেন। এগুলোর মধ্যে রয়েছে- সবার জন্য উন্নয়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন, সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানভিত্তিক অর্থনীতি, ব্যবসা সহজীকরণ, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশ, পরিবেশ ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন প্রতিষ্ঠা।

Advertisement

শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে বিশেষ গুরুত্ব

মানবসম্পদ উন্নয়নকে দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। সে কারণে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। শিক্ষাকে আরও বাস্তবমুখী ও দক্ষতাভিত্তিক করার পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনার কথা বাজেটে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী মতে, দক্ষ জনশক্তি ছাড়া উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব নয়।

অর্থমন্ত্রী দক্ষ জনশক্তি তৈরির জন্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাত অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এই দুটি খাতে যথাক্রমে জিডিপির ২ শতাংশ এবং ১ দশমিক ০১ শতাংশ বরাদ্দ রেখেছেন। শিক্ষাখাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি। আর স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা।

আরও পড়ুন দাম কমবে যেসব পণ্যের

তবে বাজেটে শিক্ষাখাতের জন্য যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে তা পর্যাপ্ত নয় বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. ছিদ্দিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘জিডিপির অন্তত ৫ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ দেওয়া উচিত।’

শুধু টাকার অঙ্কে বরাদ্দ বাড়লেই সেটিকে বড় পরিবর্তন বলা যায় না। দেখতে হবে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ জিডিপির কত শতাংশ এবং মোট বাজেটের কত শতাংশ। যদি এই অনুপাত উল্লেখযোগ্যভাবে না বাড়ে, তাহলে এটিকে রুটিন বাজেট বৃদ্ধি ছাড়া অন্য কিছু বলা যাবে না।-ডা. মুশতাক হোসেন

তার মতে, শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না, বরং সেই অর্থ ব্যয়ের সক্ষমতা, দক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি, শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ ও মানোন্নয়ন কার্যক্রমে কার্যকর বিনিয়োগ না হলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না।

স্বাস্থ্যখাত নিয়েও একই ধরনের পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘শুধু টাকার অঙ্কে বরাদ্দ বাড়লেই সেটিকে বড় পরিবর্তন বলা যায় না। দেখতে হবে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ জিডিপির কত শতাংশ এবং মোট বাজেটের কত শতাংশ। যদি এই অনুপাত উল্লেখযোগ্যভাবে না বাড়ে, তাহলে এটিকে রুটিন বাজেট বৃদ্ধি ছাড়া অন্য কিছু বলা যাবে না।

তার মতে, স্বাস্থ্যখাতের বরাদ্দ জিডিপির অন্তত ২ শতাংশ বা তার বেশি হওয়া উচিত। শুধু হাসপাতালের শয্যা বাড়ানো নয়, বরং এমন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে যাতে মানুষ কম অসুস্থ হয় এবং হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন কমে আসে। এজন্য প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, রোগ প্রতিরোধমূলক কর্মসূচি এবং স্থানীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণে অধিক বিনিয়োগ প্রয়োজন।

সামাজিক সুরক্ষা খাতে নতুন গুরুত্বারোপ

সামাজিক সুরক্ষা খাতেও নতুন গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। জীবনচক্রভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলার মাধ্যমে শিশু, নারী, প্রবীণ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে আরও কার্যকর সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। বৈষম্য কমিয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের অংশ হিসেবে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলোকে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান কেন্দ্রবিন্দুতে

বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবারের বাজেটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। অর্থমন্ত্রী মনে করেন, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ছাড়া অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানো সম্ভব নয়। এ কারণে শিল্পায়ন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগ এবং বেসরকারি খাতের সম্প্রসারণে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নতুন উদ্যোক্তা তৈরি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশ এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের বিষয়গুলোও বাজেটে গুরুত্ব পেয়েছে।

কৃষি: জাতীয় অর্থনীতির কৌশলগত ভিত্তি

কৃষিখাত শুধু জীবিকার উৎস নয়, বরং জাতীয় অর্থনীতির কৌশলগত ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি কৃষি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ও কৃষিভিত্তিক শিল্পের বিকাশে জোর দেওয়া হয়েছে। গ্রামীণ অর্থনীতি আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যও বাজেটে প্রতিফলিত হয়েছে। কৃষি, খাদ্য এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৪৩ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা, যা জিডিপির শূন্য দশমিক ৬৩ শতাংশ।

আরও পড়ুন ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট: অর্থ আসবে কোথা থেকে, খরচ হবে কোথায়?

তবে কৃষির এ বরাদ্দ যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম। তিনি বলেন, ‘আগামী অর্থবছরে কৃষিখাতের বরাদ্দ টাকার অঙ্কে কিছুটা বেড়েছে বটে, তবে মোট বাজেটের তুলনায় এর অংশীদারত্ব কমে গেছে। মূল সমস্যা হলো জাতীয় বাজেট যে হারে বাড়ছে, কৃষিখাতের বরাদ্দ সে হারে বাড়ছে না। ফলে নামমাত্র অর্থে বরাদ্দ বাড়লেও আপেক্ষিক অর্থে কৃষিখাতে বিনিয়োগ কমে যাচ্ছে।

শুধু উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করলেই বিনিয়োগ বাড়বে না। এজন্য বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে হবে। বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা, প্রশাসনিক জটিলতা দূরীকরণ এবং নীতির ধারাবাহিকতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।-ড. জাহিদ হোসেন

তিনি বলেন, বর্তমান মূল্যস্ফীতির বিষয়টি বিবেচনায় নিলে কৃষিখাতের প্রকৃত বরাদ্দ আরও সংকুচিত হয়েছে। বর্তমানে মূল্যস্ফীতি প্রায় ৯ শতাংশের কাছাকাছি। ফলে যে সামান্য বৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে, বাস্তবে তার ক্রয়ক্ষমতা অনেকটাই কমে গেছে। অর্থাৎ প্রকৃত অর্থে কৃষি বাজেট হ্রাস পেয়েছে।

কৃষি উৎপাদন পর্যাপ্ত হারে না বাড়লে খাদ্য আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়বে, খাদ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হবে এবং নিম্নআয়ের মানুষের ওপর দারিদ্র্যের চাপ আরও বাড়বে বলে মনে করেন তিনি।

ব্যবসা সহজীকরণ

এদিকে প্রস্তাবিত বাজেটে দেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির জন্য ব্যবসা সহজীকরণকে অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরেছেন অর্থমন্ত্রী। প্রশাসনিক জটিলতা কমানো, অপ্রয়োজনীয় বিধিনিষেধ শিথিল করা এবং সরকারি সেবায় স্বচ্ছতা বাড়িয়ে বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি সহায়ক পরিবেশ তৈরির পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে তিনি। অর্থমন্ত্রীর মতে, বিনিয়োগ বাড়াতে হলে ব্যবসার খরচ ও সময় দুটিই কমাতে হবে।

তবে বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য কেবল লক্ষ্য নির্ধারণই যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, ‘শুধু উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করলেই বিনিয়োগ বাড়বে না। এজন্য বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে হবে। বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা, প্রশাসনিক জটিলতা দূরীকরণ এবং নীতির ধারাবাহিকতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।’

আরও পড়ুন এক নজরে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট

তিনি বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা কিংবা বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এসব ঝুঁকি শুধু বাংলাদেশের নয়। তাই সরকারের উচিত এমন নীতিগত পরিবেশ নিশ্চিত করা, যাতে বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদে আস্থা নিয়ে বিনিয়োগ করতে পারেন।’

ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের সংস্কার

ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের সংস্কারও বাজেটের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। খেলাপি ঋণ, সুশাসনের ঘাটতি এবং আস্থার সংকটে থাকা আর্থিক খাতকে পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা বৃদ্ধি ও পুঁজিবাজারকে কার্যকর বিনিয়োগের মাধ্যম হিসেবে গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।

জ্বালানি নিরাপত্তায় বিশেষ গুরুত্ব

শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে জ্বালানি নিরাপত্তাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ, দেশীয় জ্বালানি সম্পদের উন্নয়ন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধির পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থমন্ত্রী মনে করেন, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে উৎপাদন ও বিনিয়োগ উভয়ই বাড়বে।

তথ্যপ্রযুক্তি খাত ভবিষ্যৎ অর্থনীতির চালিকাশক্তি

তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে ভবিষ্যৎ অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছে অর্থমন্ত্রী। প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উদ্ভাবন উৎসাহিত করা এবং তথ্যপ্রযুক্তি সেবার রপ্তানি বাড়িয়ে বাংলাদেশকে বৈশ্বিক ডিজিটাল অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন আমির খসরু। তিনি তরুণদের দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির বিষয়েও জোর দিয়েছেন।

আরও পড়ুন কোথায় যাবে আপনার ১০০ টাকা?

জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা ও পরিবেশ সংরক্ষণ উন্নয়ন কৌশলের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। বনায়ন কর্মসূচি, নদী পুনরুদ্ধার, পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সরকার একটি সবুজ ও টেকসই অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে চায়।

এবারের বাজেটে সৃজনশীল অর্থনীতি, ক্রীড়া অর্থনীতি, সবুজ অর্থনীতি এবং সুনীল অর্থনীতির মতো নতুন খাতগুলোকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থমন্ত্রীর মতে, এসব খাত ভবিষ্যতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং অর্থনীতির বহুমুখীকরণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।

সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তনের ইঙ্গিত

সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনায়ও পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে প্রকল্প বাস্তবায়নে ‘ভ্যালু ফর মানি’, অর্থনৈতিক সুফল, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং পরিবেশগত প্রভাবকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। অর্থাৎ শুধু ব্যয় বৃদ্ধি নয়, ব্যয়ের কার্যকারিতা নিশ্চিত করাই হবে সরকারের লক্ষ্য।

বাজেট বক্তব্যে সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী ঘোষণা হলো ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার লক্ষ্য। অর্থমন্ত্রীর মতে, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, উৎপাদনশীলতা উন্নয়ন, দক্ষ মানবসম্পদ গঠন এবং সুশাসন নিশ্চিত করা গেলে এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব। এজন্য স্বল্পমেয়াদি সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় উপস্থাপিত এই বাজেটকে অর্থমন্ত্রী অর্থনীতির পুনরুদ্ধার এবং ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির ভিত্তি নির্মাণের একটি রূপরেখা হিসেবে দেখছেন। তবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, আর্থিক খাত সংস্কার ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারের সক্ষমতাই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির এই উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য কতটা বাস্তবায়িত হবে।

আরও পড়ুন ৪ বছর পর শিক্ষায় জিডিপির ২ শতাংশ বরাদ্দ, আরও বাড়ানোর অঙ্গীকার

নতুন সরকারের প্রথম বাজেট হিসেবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এই বাজেটকে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, কাঠামোগত সংস্কার ও দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির ভিত্তি তৈরির একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

এই লক্ষ্য বেসরকারি খাতের ঋণপ্রাপ্তিতে প্রভাব ফেলতে পারে কি না, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে রয়েছে ভিন্নমত। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘সরকারের ঋণ গ্রহণ বেসরকারি খাতের জন্য চাপ সৃষ্টি করবে কি না, তা মূলত ব্যাংক খাতের তারল্য পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে।

বর্তমানে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট ও উচ্চ সুদের হারের কারণে বেসরকারি খাতের ঋণচাহিদা তুলনামূলক দুর্বল। তবে মূল্যস্ফীতি কমে গেলে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফিরলে বেসরকারি খাতের ঋণ চাহিদা বাড়বে। সে সময় সরকার যদি ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নেয়, তাহলে বেসরকারি খাত ‘ক্রাউডিং আউট’-এর শিকার হতে পারে।-ড. মাসরুর রিয়াজ

তার মতে, ব্যাংকগুলোর তারল্য পর্যাপ্ত থাকলে সরকারের ঋণ গ্রহণে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার কথা নয়। কারণ সরকার এককালীন পুরো অর্থ ঋণ নেয় না, বরং সারা বছর ধরে ধাপে ধাপে ঋণ গ্রহণ করে। ফলে বাজেট বাস্তবায়নের সময় বেসরকারি খাতের ঋণ চাহিদা, ঋণ প্রবৃদ্ধি ও আমদানি পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।

তবে ভবিষ্যতে এই ঋণ গ্রহণ বেসরকারি খাতের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে মনে করছেন পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. মাসরুর রিয়াজ।

তিনি বলেন, ‘বর্তমানে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট ও উচ্চ সুদের হারের কারণে বেসরকারি খাতের ঋণচাহিদা তুলনামূলক দুর্বল। তবে মূল্যস্ফীতি কমে গেলে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফিরলে বেসরকারি খাতের ঋণ চাহিদা বাড়বে। সে সময় সরকার যদি ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নেয়, তাহলে বেসরকারি খাত ‘ক্রাউডিং আউট’র শিকার হতে পারে।’

অর্থমন্ত্রী আগামী অর্থবছরে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য ধরেছেন ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ৬ লাখ ৪ হাজার টাকা সংগ্রহের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর)। এ লক্ষ্যে পূরণে দীর্ঘদিন ধরে করের বাইরে থাকা বিভিন্ন খাত করের আওতায় আনা, কর পরিপালন বাড়ানো এবং ডিজিটাল অর্থনীতিকে কর কাঠামোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

আগামী অর্থবছরে পিস্তল বা রিভলবারের লাইসেন্স ইস্যু কিংবা নবায়নের সময় এক লাখ টাকা এবং বন্দুক, শটগান বা রাইফেলের ক্ষেত্রে ৫০ হাজার টাকা অগ্রিম কর দিতে হবে। প্রথমবারের মতো হেলিকপ্টার বা চপারের ওপরও ১০ লাখ টাকা এবং খুচরা বিক্রেতাদের ওপর শূন্য দশমিক ২০ শতাংশ অগ্রিম কর বসানো হয়েছে। আইনের আওতায় নিবন্ধিত ক্লাবের সদস্যপদ গ্রহণ, নবায়ন, হস্তান্তর বা পরিবর্তনের সময় পরিশোধিত অর্থের ওপর ১০ শতাংশ উৎস কর দিতে হবে।

তবে কেবল কর বৃদ্ধি নয়, বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়াতে বেশকিছু কর রেয়াতও ঘোষণা করেন অর্থমন্ত্রী। কার্বোনেটেড বেভারেজ, মিষ্টি পানীয়র টার্নওভার কর ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে আড়াই শতাংশ করা হয়েছে। এছাড়া ধান, চাল, গম, আলু, মাছ, মাংস, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, হলুদ, ডাল, আটা, ময়দা, লবণ, ভোজ্যতেল, চিনি, গোলমরিচ, এলাচ, দারুচিনি, লবঙ্গ, ডিম, শাক-সবজি, কাঁচামরিচ, তরল দুধসহ ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উৎস কর কমানো হয়েছে।

এমএএস/এএসএ