দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা আবারও ফিরেছে ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চ ফিফা বিশ্বকাপে। ২০১০ সালে নিজেদের মাটিতে বিশ্বকাপ আয়োজনের পর টানা তিনটি আসরে জায়গা করে নিতে ব্যর্থ হয়েছিল বাফানা বাফানারা। অবশেষে ২০২৬ বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করে তারা নতুন স্বপ্ন বুনতে শুরু করেছে।
Advertisement
দক্ষিণ আফ্রিকার ফুটবলপ্রেমীরা আশাবাদী, কারণ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটির ফুটবল আবারও উন্নতির পথে। ২০২৫ সালে ক্লাব বিশ্বকাপে মামেলোদি সানডাউন্সের দারুণ পারফরম্যান্স যেমন বিশ্বজুড়ে প্রশংসা কুড়িয়েছে, তেমনি জাতীয় দলও এখন নিজেদের নতুন পরিচয় গড়ে তুলতে চায় বিশ্বমঞ্চে।
হুগো ব্রুসের হাত ধরে নতুন যুগ
২০২১ সালের মে মাসে বেলজিয়ান কোচ হুগো ব্রুস দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই দক্ষিণ আফ্রিকার ফুটবলে শুরু হয় পরিবর্তনের ধারা। আফ্রিকান ফুটবলে অভিজ্ঞ এই কোচ দায়িত্ব পেয়েছিলেন এমন সময়ে, যখন দলটি আফ্রিকা কাপ অব নেশনসেও জায়গা করে নিতে ব্যর্থ হয়েছিল।
Advertisement
ব্রুস তরুণদের ওপর আস্থা রাখেন। থালেন্তে এমবাথা, ওসউইন আপোলিস এবং এভিডেন্স মাকগোপার মতো নতুন মুখদের সুযোগ দেন, যারা পরবর্তীতে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর অধীনে দক্ষিণ আফ্রিকা ২০২৩ আফ্রিকা কাপ অব নেশনসে তৃতীয় স্থান অর্জন করে এবং এখন ২০২৬ বিশ্বকাপকে সামনে রেখে আরও বড় সাফল্যের স্বপ্ন দেখছে।
বিশ্বকাপে ওঠার নাটকীয় গল্প
আফ্রিকান বাছাইপর্বের গ্রুপ ‘সি’-তে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল আফ্রিকার অন্যতম শক্তিশালী দল নাইজেরিয়া এবং উদীয়মান শক্তি বেনিন। দক্ষিণ আফ্রিকা শেষ পর্যন্ত ১০ ম্যাচে ৫ জয়, ৩ ড্র ও ২ হারে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়।
শেষ ম্যাচের আগে তারা ছিল দ্বিতীয় স্থানে। নিজেদের মাঠে রুয়ান্ডাকে ৩-০ গোলে হারিয়ে কাজের বড় অংশটা সেরে ফেলেছিল। এরপর তাদের তাকিয়ে থাকতে হয় নাইজেরিয়া ও বেনিন ম্যাচের দিকে। নাইজেরিয়ার ৪-০ গোলের বড় জয় গ্রুপের সমীকরণ বদলে দেয় এবং দক্ষিণ আফ্রিকা উঠে যায় শীর্ষে। সেই সঙ্গে নিশ্চিত হয় বিশ্বকাপের টিকিট।
Advertisement
২০২৬ বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকার গ্রুপ ও সূচি
বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে দক্ষিণ আফ্রিকার সামনে অপেক্ষা করছে কঠিন চ্যালেঞ্জ।‘এ’ গ্রুপে তাদের সামনে রয়েছে মেক্সিকো, দক্ষিণ কোরিয়া ও চেক প্রজাতন্ত্র।
১১ জুন: মেক্সিকো বনাম দক্ষিণ আফ্রিকা (মেক্সিকো সিটি স্টেডিয়াম)১৮ জুন: চেকিয়া বনাম দক্ষিণ আফ্রিকা (আটলান্টা স্টেডিয়াম)২৪ জুন: দক্ষিণ আফ্রিকা বনাম দক্ষিণ কোরিয়া (এস্তাদিও মনতেরে)
তারকাসমৃদ্ধ স্কোয়াড
হুগো ব্রুসের ২৬ সদস্যের দলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নাম অধিনায়ক ও গোলরক্ষক রনওয়েন উইলিয়ামস। এছাড়া মিডফিল্ডের প্রাণভোমরা তেবোহো মোকোয়েনা এবং বার্নলির ফরোয়ার্ড লাইল ফস্টার দলের বড় ভরসা।
মামেলোদি সানডাউন্স থেকে রয়েছেন আটজন ফুটবলার। একই সংখ্যক খেলোয়াড় এসেছে অরল্যান্ডো পাইরেটস থেকেও। বিশেষ করে তরুণ ফরোয়ার্ড ওসউইন আপোলিসকে ঘিরে রয়েছে বাড়তি প্রত্যাশা।
দক্ষিণ আফ্রিকার বিশ্বকাপ ইতিহাস
কনফেডারেশন: সিএএফ (আফ্রিকান ফুটবল কনফেডারেশন)প্রথম বিশ্বকাপ: ফ্রান্স ১৯৯৮সর্বশেষ বিশ্বকাপ: দক্ষিণ আফ্রিকা ২০১০বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ: ৪ বার (১৯৯৮, ২০০২, ২০১০, ২০২৬)সেরা ফল: গ্রুপ পর্ব (১৯৯৮, ২০০২, ২০১০)বিশ্বকাপ আয়োজক: ২০১০
সামগ্রিক রেকর্ডম্যাচ: ৯জয়: ২ড্র: ৪হার: ৩গোল: ১১হজম: ১৬
২০০২: সবচেয়ে সফল বিশ্বকাপ
দক্ষিণ আফ্রিকার বিশ্বকাপ ইতিহাসের সেরা আসর ছিল ২০০২ সালের কোরিয়া-জাপান বিশ্বকাপ। প্রথম ম্যাচে তারা প্যারাগুয়ের সঙ্গে ২-২ গোলে ড্র করে। দ্বিতীয় ম্যাচে স্লোভেনিয়াকে ১-০ গোলে হারিয়ে অর্জন করে বিশ্বকাপ ইতিহাসের প্রথম জয়। সেই ম্যাচে চতুর্থ মিনিটেই গোল করেন সিয়াবোঙ্গা নোমভেথে।
শেষ ম্যাচে স্পেনের কাছে ৩-২ গোলে হেরে গেলেও দক্ষিণ আফ্রিকা নকআউট পর্বের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত গোল ব্যবধানে পিছিয়ে থাকায় তারা বিদায় নেয়। বিশ্বকাপ শেষে তারা ১৭তম স্থানে ছিল, যা এখন পর্যন্ত তাদের সেরা অর্জন।
২০১০: নিজেদের মাটিতে বিশ্বকাপ
আফ্রিকার মাটিতে প্রথম বিশ্বকাপ আয়োজনের গৌরব অর্জন করে দক্ষিণ আফ্রিকা। উদ্বোধনী ম্যাচে মেক্সিকোর সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করে স্বাগতিকরা। যদিও দ্বিতীয় ম্যাচে উরুগুয়ের কাছে ৩-০ গোলে হারে। তবে শেষ ম্যাচে তারা চমক দেখায়। ১৯৯৮ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সকে ২-১ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপ শেষ করে। যদিও গ্রুপ পর্ব পার হতে পারেনি, তবু সেই জয় এখনও দক্ষিণ আফ্রিকার ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম গর্বের মুহূর্ত।
১৯৯৮: প্রথম বিশ্বকাপের অভিজ্ঞতা
ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো অংশ নেয় দক্ষিণ আফ্রিকা। স্বাগতিক ফ্রান্সের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে ৩-০ গোলে হারে তারা। দ্বিতীয় ম্যাচে ডেনমার্কের সঙ্গে ১-১ ড্র করে দক্ষিণ আফ্রিকা নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপ গোল ও প্রথম পয়েন্ট অর্জন করে। গোল করেছিলেন বেনি ম্যাকার্থি। তৃতীয় ম্যাচে সৌদি আরবের সঙ্গে ২-২ ড্র করে তারা প্রথম বিশ্বকাপ অভিযান শেষ করে।
কিংবদন্তিরা যাদের ঘিরে বিশ্বকাপ ইতিহাস
সর্বোচ্চ গোলদাতা
দক্ষিণ আফ্রিকার বিশ্বকাপ ইতিহাসে যৌথভাবে সর্বোচ্চ গোলদাতা দুজন। শন বার্টলেট- গোল: ২। দুটিই ১৯৯৮ বিশ্বকাপে সৌদি আরবের বিপক্ষে এবং বেনি ম্যাকার্থি, গোল: ২, ১৯৯৮ সালে ডেনমার্কের বিপক্ষে, ২০০২ সালে স্পেনের বিপক্ষে। ম্যাকার্থিই একমাত্র দক্ষিণ আফ্রিকান, যিনি দুই ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল করেছেন।
সর্বাধিক ম্যাচ খেলা ফুটবলার
চারজন ফুটবলার যৌথভাবে সবচেয়ে বেশি বিশ্বকাপ ম্যাচ খেলেছেন। কুইন্টন ফরচুন- ৬ ম্যাচ, বেনি ম্যাকার্থি- ৬ ম্যাচ, লুকাস রাদেবে- ৬ ম্যাচ, অ্যারন মোকোয়েনা- ৬ ম্যাচ।
যে গোল কাঁপিয়েছিল পুরো আফ্রিকাকে২০১০ বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে মেক্সিকোর বিপক্ষে সিফিওয়ে ছাবালালার গোলটি শুধু দক্ষিণ আফ্রিকার নয়, পুরো আফ্রিকার ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত। দ্বিতীয়ার্ধে বাম পায়ের দুর্দান্ত শটে তিনি জাল খুঁজে নেন। এরপর তাঁর বিখ্যাত উদযাপন বিশ্বকাপ ইতিহাসে স্থায়ী জায়গা করে নেয়। সেই গোল আজও আফ্রিকার প্রথম বিশ্বকাপ আয়োজনের প্রতীক হয়ে আছে।
দক্ষিণ আফ্রিকার সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপ জয়বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকার সবচেয়ে স্মরণীয় জয় আসে ২০১০ সালে। ব্লুমফন্টেইনে তারা ১৯৯৮ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সকে ২-১ গোলে হারায়। বঙ্গানি খুমালো এবং কাটলেগো ম্ফেলার গোলেই নিশ্চিত হয় ঐতিহাসিক জয়টি। যদিও নকআউট পর্বে ওঠা হয়নি, তবু এই ম্যাচ দক্ষিণ আফ্রিকার বিশ্বকাপ ইতিহাসের সেরা বিজয় হিসেবে বিবেচিত হয়।
২০২৬ বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকা নতুন ইতিহাস লেখার লক্ষ্য নিয়েই মাঠে নামবে। অতীতে তারা কখনও গ্রুপ পর্ব পেরোতে পারেনি। হুগো ব্রুসের নেতৃত্বে এবার সেই সীমাবদ্ধতা ভেঙে প্রথমবারের মতো নকআউট পর্বে জায়গা করে নেওয়াই বাফানা বাফানার প্রধান লক্ষ্য।