এশিয়ার ফুটবল শক্তিগুলোর কথা উঠলে দক্ষিণ কোরিয়ার নামটি সবার আগে উচ্চারিত হয়। ধারাবাহিকতা, লড়াইয়ের মানসিকতা এবং বিশ্বমঞ্চে নিজেদের প্রমাণ করার ক্ষমতা- সব মিলিয়ে এশিয়ান ফুটবলের অন্যতম সফল প্রতিনিধি তারা। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ হবে কোরিয়া রিপাবলিকের ১২তম বিশ্বকাপ অংশগ্রহণ এবং টানা ১১তম বিশ্বকাপ। ১৯৮৬ সালের পর থেকে তারা কখনও বিশ্বকাপের বাইরে থাকেনি, যা এশিয়ার অন্য কোনো দেশের নেই।
Advertisement
কাতার বিশ্বকাপে শেষ ষোলোতে উঠে আবারও নিজেদের সামর্থ্য দেখিয়েছিল কোরিয়ানরা। এবার উত্তর আমেরিকার বিশ্বকাপে তাদের লক্ষ্য আরও বড়- প্রথমবারের মতো শেষ ষোলোর গণ্ডি পেরিয়ে আরও গভীরে যাওয়া।
দ্রুততম সময়ে বিশ্বকাপ নিশ্চিত করা দলগুলোর একটি
কানাডা, মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্র স্বাগতিক হওয়ায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে জায়গা পেয়েছিল। তাদের বাইরে এশিয়া থেকে সবচেয়ে আগে বিশ্বকাপ নিশ্চিত করে দক্ষিণ কোরিয়া। পুরো বাছাইপর্বে তারা ছিল অপরাজিত।
Advertisement
দ্বিতীয় রাউন্ডে চীন, থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরের সঙ্গে একই গ্রুপে পড়ে কোরিয়ানরা। ছয় ম্যাচের মধ্যে পাঁচটিতে জয় এবং একটি ড্র করে সহজেই পরের ধাপে উঠে যায় তারা।
শেষ রাউন্ডে জর্ডান, ইরাক, ওমান, ফিলিস্তিন ও কুয়েতকে নিয়ে গঠিত গ্রুপে দক্ষিণ কোরিয়া ছয়টি জয় ও চারটি ড্র নিয়ে শীর্ষস্থান দখল করে। পুরো এশিয়ান বাছাইয়ে একমাত্র অপরাজিত দল ছিল তারাই।
কোচ হং মিয়ং-বো: খেলোয়াড় থেকে কিংবদন্তি কোচ
দক্ষিণ কোরিয়ার বর্তমান কোচ হং মিয়ং-বো দেশটির ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বড় নাম। বিশ্বকাপকে তিনি দেখেছেন খেলোয়াড়, সহকারী কোচ এবং প্রধান কোচ- তিন ভূমিকাতেই।
Advertisement
২০২৪ সালে তিনি দ্বিতীয় দফায় জাতীয় দলের দায়িত্ব নেন। এর আগে ২০১৪ বিশ্বকাপেও দলকে কোচিং করিয়েছিলেন। খেলোয়াড়ি জীবনে তিনি ছিলেন কোরিয়ার রক্ষণভাগের স্তম্ভ। ২০০২ বিশ্বকাপে ঐতিহাসিক সেমিফাইনালে ওঠা দলের অধিনায়কও ছিলেন তিনি।
কোচ হিসেবে বয়সভিত্তিক দল নিয়েও সাফল্য পেয়েছেন। ২০০৯ অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপে কোরিয়াকে কোয়ার্টার ফাইনালে তোলেন, আর ২০১২ লন্ডন অলিম্পিকে এনে দেন ঐতিহাসিক ব্রোঞ্জ পদক।
২০২৬ বিশ্বকাপে দক্ষিণ কোরিয়ার গ্রুপ ও সূচি
দক্ষিণ কোরিয়া এবার অপেক্ষাকৃত কঠিন একটি গ্রুপে পড়েছে। ‘এ’ গ্রুপে তাদের প্রতিপক্ষ চেকিয়া, স্বাগতিক মেক্সিকো ও আফ্রিকার শক্তিশালী দল দক্ষিণ আফ্রিকা।
* ১১ জুন: দক্ষিণ কোরিয়া বনাম চেকিয়া- গুয়াদালাহারা* ১৮ জুন: মেক্সিকো বনাম দক্ষিণ কোরিয়া- গুয়াদালাহারা* ২৪ জুন: দক্ষিণ আফ্রিকা বনাম দক্ষিণ কোরিয়া- মনতেরে
অভিজ্ঞতা আর তারুণ্যের মিশেলে স্কোয়াড
কোচ হং মিয়ং-বো এবারও ভরসা রেখেছেন অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের ওপর। অধিনায়ক ও তারকা ফরোয়ার্ড সন হিউং-মিন থাকছেন দলের নেতৃত্বে। এছাড়া বায়ার্ন মিউনিখের ডিফেন্ডার কিম মিন-জে, মিডফিল্ডার লি জে-সুং এবং কয়েকজন ইউরোপপ্রবাসী খেলোয়াড় দলকে শক্তিশালী করেছে।
দীর্ঘদিন পর স্কোয়াডে ফিরেছেন লি কি-হিউক, যিনি ক্লাব ফুটবলে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পুরস্কার পেয়েছেন।
বিশ্বকাপে দক্ষিণ কোরিয়ার ইতিহাস
* প্রথম বিশ্বকাপ: ১৯৫৪ (সুইজারল্যান্ড)* সর্বশেষ বিশ্বকাপ: কাতার ২০২২* বিশ্বকাপ অংশগ্রহণ: ১২ বার* টানা অংশগ্রহণ: ১১ বার (১৯৮৬ থেকে)* সেরা সাফল্য: ২০০২ বিশ্বকাপে চতুর্থ স্থান* মোট ম্যাচ: ৩৮* জয়: ৭* ড্র: ১০* হার: ২১* গোল করেছে: ৩৯* গোল হজম: ৭৮
২০০২: দক্ষিণ কোরিয়ার স্বর্ণালী বিশ্বকাপ
দক্ষিণ কোরিয়ার ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায় নিঃসন্দেহে ২০০২ বিশ্বকাপ। নিজেদের মাটিতে অনুষ্ঠিত সেই বিশ্বকাপে তারা পুরো বিশ্বকে চমকে দেয়।
গ্রুপ পর্বে পোল্যান্ডকে ২-০ গোলে হারিয়ে প্রথম বিশ্বকাপ জয় তুলে নেয় কোরিয়ানরা। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ড্র এবং পর্তুগালের বিপক্ষে ১-০ ব্যবধানে জয় এনে দেয় শেষ ষোলো।
নকআউট পর্বে ইতালিকে হারানো ম্যাচটি এখনও বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় লড়াই। অতিরিক্ত সময়ে আহন জুং-হোয়ানের গোল কোরিয়াকে কোয়ার্টার ফাইনালে তোলে। পরে স্পেনকে টাইব্রেকারে হারিয়ে সেমিফাইনালে পৌঁছে যায় তারা। শেষ পর্যন্ত জার্মানির কাছে হেরে থেমে গেলেও চতুর্থ স্থান অর্জন করে ইতিহাস গড়ে দক্ষিণ কোরিয়া।
কাতার ২০২২: পর্তুগালকে হারিয়ে শেষ ষোলো
২০২২ বিশ্বকাপে আবারও চমক দেখায় কোরিয়ানরা। উরুগুয়ের সঙ্গে ড্র, ঘানার কাছে হার- সব মিলিয়ে শেষ ম্যাচে পর্তুগালের বিপক্ষে জয়ের বিকল্প ছিল না। সেই ম্যাচে নাটকীয়ভাবে ২-১ ব্যবধানে জয় পায় দক্ষিণ কোরিয়া। ইনজুরি টাইমে করা গোল তাদের পৌঁছে দেয় শেষ ষোলোতে। যদিও পরের রাউন্ডে ব্রাজিলের কাছে ৪-১ গোলে হেরে বিদায় নিতে হয়।
১৯৫৪: যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ থেকে বিশ্বকাপ যাত্রা
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রথম বিশ্বকাপ অংশগ্রহণ ছিল ১৯৫৪ সালে। তখনও কোরিয়ান যুদ্ধের ক্ষত পুরোপুরি শুকায়নি। খেলোয়াড়দের যাত্রাপথও ছিল ভয়াবহ কষ্টকর।
হাঙ্গেরির বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে তারা ৯-০ গোলে হারে। পরের ম্যাচে তুরস্কের কাছেও ৭-০ ব্যবধানে পরাজিত হয়। কিন্তু সেই অংশগ্রহণই ভবিষ্যতের ভিত্তি তৈরি করে দেয়।
বিশ্বকাপে কোরিয়ার সর্বোচ্চ গোলদাতা
দক্ষিণ কোরিয়ার হয়ে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোল করেছেন দুজন- আহন জুং-হোয়ান ও সন হিউং-মিন। দুজনেরই গোল সংখ্যা তিন। আহন ২০০২ সালে ইতালির বিপক্ষে গোল্ডেন গোল করে কিংবদন্তি হয়ে যান। অন্যদিকে সন ২০১৮ বিশ্বকাপে জার্মানির বিপক্ষে গোল করে বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তোলেন।
সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা ফুটবলার
এই রেকর্ড বর্তমান কোচ হং মিয়ং-বোর। তিনি ১৯৯০ থেকে ২০০২ পর্যন্ত চার বিশ্বকাপে মোট ১৬ ম্যাচ খেলেছেন। তার পরে আছেন পার্ক জি-সুং (১৪ ম্যাচ) এবং লি ইয়ং-পিয়ো (১২ ম্যাচ)। সন হিউং-মিন ইতোমধ্যে ১০টি বিশ্বকাপ ম্যাচ খেলেছেন। ২০২৬ বিশ্বকাপে ভালো করলে তিনি হয়তো হংয়ের রেকর্ডও ভেঙে ফেলতে পারেন।
জার্মানিকে হারানোর সেই অবিশ্বাস্য রাত
২০১৮ বিশ্বকাপে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন জার্মানির বিপক্ষে দক্ষিণ কোরিয়ার জয় বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম বড় অঘটন। ম্যাচের শেষ মুহূর্তে কিম ইয়ং-গওন ও সন হিউং-মিনের গোলে ২-০ ব্যবধানে জয় পায় কোরিয়া। সেই হারে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয় জার্মানি।
বিশ্বকাপে দক্ষিণ কোরিয়ার সবচেয়ে বড় জয়
বিশ্বকাপে দক্ষিণ কোরিয়ার সবচেয়ে বড় জয় এসেছে দুই গোলের ব্যবধানে।
* ২০০২ সালে পোল্যান্ডকে ২-০* ২০১০ সালে গ্রিসকে ২-০* ২০১৮ সালে জার্মানিকে ২-০
এই তিনটি জয়ই কোরিয়ান ফুটবলের ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে আছে।
এবার কি ইতিহাস বদলাবে?
দীর্ঘদিন ধরেই এশিয়ার সবচেয়ে ধারাবাহিক দল দক্ষিণ কোরিয়া। কিন্তু ২০০২ সালের পর তারা আর বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে যেতে পারেনি। তবে এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। ইউরোপে খেলা অভিজ্ঞ ফুটবলার, শক্তিশালী দলগত সমন্বয় এবং সন হিউং-মিনের মতো বিশ্বমানের তারকা সব মিলিয়ে কোরিয়ানদের ঘিরে আশাবাদ অনেক বেশি।
এশিয়ার প্রতিনিধিত্ব করতে গিয়ে বহুবার তারা বিশ্বকে চমকে দিয়েছে। ২০২৬ বিশ্বকাপে সেই চমকের নতুন অধ্যায় লেখার অপেক্ষায় এখন ‘তায়েগুক ওয়ারিয়র্স’রা।