খেলাধুলা

এ এক অমীমাংসিত ইতিহাস- কোথায় গেল বিশ্বকাপের আসল ট্রফি?

ফুটবল ইতিহাসে সবচেয়ে সফল দল ব্রাজিল। পাঁচবার বিশ্বকাপ জিতেছে তারা, খেলেছে সবকটি বিশ্বকাপের আসরেও। কিন্তু প্রতিপক্ষ সমর্থকদের খোঁচায় বারবার উঠে আসে এক নাম- জুলে রিমে ট্রফি। হারিয়ে যাওয়া এই ট্রফিই আজও ব্রাজিলকে ঘিরে ফুটবল বিদ্রূপের অন্যতম প্রধান অস্ত্র। আসলে এই ট্রফির গল্পটাই বা কী?

Advertisement

জুলে রিমে ট্রফি ছিল ফিফা বিশ্বকাপের মূল ট্রফি, যা ১৯৩০ সালে প্রথম আসর থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত ব্যবহৃত হয়। ফিফার তৎকালীন সভাপতি জুলে রিমের নামে নামকরণ করা এই ট্রফিটি ১৯৭০ সালে স্থায়ীভাবে ব্রাজিলের কাছে হস্তান্তর করা হয়। কারণ, ব্রাজিলই প্রথম দেশ হিসেবে তিনবার বিশ্বকাপ জয়ের কীর্তি গড়ে।

১৯৫৮ সালে প্রথমবার বিশ্বকাপ জেতে ব্রাজিল। পরের আসরেও তাদের হাতেই ওঠে বিশ্বকাপের ট্রফি। ইতালির পর দ্বিতীয় দল হিসেবে টানা দুইবার বিশ্বকাপ জয়ের কীর্তি গড়ে তারা। এরপর ৬৪ বছর কেটে গেলেও অন্য কোনো দল টানা দুইবার জিততে পারেনি।

গত আসরে ফ্রান্স এই সুযোগ হাতছাড়া করে আর এবার আর্জেন্টিনার সামনে এই সুযোগ রয়েছে। এর আগে ১৯৯০ সালে আর্জেন্টিনা এবং ১৯৯৮ সালে ব্রাজিলের সামনেও এই কীর্তি গড়ার সুযোগ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু তারাও পারেনি।

Advertisement

১৯৭০ সালে তখনকার সময়ে প্রথম দেশ হিসেবে ব্রাজিলে যায় বিশ্বকাপের তৃতীয় শিরোপা। ফিফার সাবেক সভাপতি জুলে রিমে সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন, যে দেশ প্রথম তিনবার বিশ্বকাপ জিতবে, তারা ট্রফিটির স্থায়ী মালিক হবে। সে কারণেই ব্রাজিলকে এর স্থায়ী মালিকানা দেওয়া হয়।

কিন্তু পরে সেটি চুরি হয়ে যায়। এই ঘটনাটি নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী সমর্থকেরা প্রায়ই ব্রাজিলকে খোঁচা দেন। তাদের খোঁচা, নিজেদের ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে মূল্যবান স্মারকই রক্ষা করতে পারেনি ব্রাজিলের ফুটবল কর্তৃপক্ষ। ফলে আসল জুলে রিমে ট্রফির বদলে এখন ব্রাজিলসহ বিশ্বকাপজয়ী দেশগুলোর কাছে রয়েছে কেবল প্রতিরূপ (রেপ্লিকা)।

জুলে রিমে ট্রফির যাত্রা শুরু হয় ১৯২৮ সালে। প্রথমবার বিশ্বকাপ আয়োজনের আগে জুলে রিমে একটি বিশেষ ট্রফি তৈরির উদ্যোগ নেন। ফরাসি ভাস্কর আবেল লাফ্ল্যুর তৈরি করেন এর নকশা। প্রাচীন গ্রিক ভাস্কর্য উইংড ভিক্টরি অব সামোথ্রেস থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি বিজয়ের দেবী নাইকিকে একটি অষ্টভুজাকৃতির কাপ হাতে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় ফুটিয়ে তোলেন।

শুরুতে ট্রফিটির নাম ছিল শুধু ‘ভিক্টরি’। ১৯৫৬ সালে জুলে রিমের মৃত্যুর পর তার সম্মানে ট্রফিটির নামকরণ করা হয় জুলে রিমে ট্রফি। উচ্চতায় ছিল মাত্র ৩৫ সেন্টিমিটার এবং এটি তৈরি হয়েছিল রুপা দিয়ে, যার ওপর সোনার প্রলেপ দেওয়া ছিল।

Advertisement

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ট্রফিটি প্রথম বড় বিপদের মুখে পড়ে। তখন এটি ইতালির একটি ব্যাংকের ভল্টে রাখা ছিল। নাৎসিরা সেটি দখলের চেষ্টা করলে ইতালিয়ান ফুটবল ফেডারেশনের প্রধান ওত্তোরিনো বারাসি গোপনে ট্রফিটি ভল্ট থেকে বের করে নিজের বাসায় নিয়ে যান। পরে তিনি সেটি একটি জুতার বাক্সে লুকিয়ে খাটের নিচে রাখেন। নাৎসিরা তার বাড়ি তল্লাশি চালালেও সেই বাক্স খুঁজে পায়নি।

১৯৫০ বিশ্বকাপের পর ট্রফিটি আবার উরুগুয়েতে যায়, পরে ১৯৫৪ সালে পশ্চিম জার্মানির হাতে ওঠে। কিন্তু এখানেই শুরু হয় নতুন রহস্য। একটি ইতালীয় তথ্যচিত্রে দাবি করা হয়, ১৯৫০-এর দশকেই আসল ট্রফিটি চুরি হয়ে যেতে পারে। এক ফটোসাংবাদিকের মতে, ১৯৫৮ বিশ্বকাপে যে ট্রফিটি দেখা গিয়েছিল, সেটি আগেরটির চেয়ে বড় ছিল এবং এর ভিত্তিও ছিল ভিন্ন।

তবে এসব দাবির কোনো চূড়ান্ত প্রমাণ নেই। অনেকের ধারণা, হয়তো শুধু ভিত্তির অংশ বদলানো হয়েছিল বা কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছিল। ফলে আসল সত্য আজও অজানা।

এরপর আসে ১৯৬৬ সালের বিখ্যাত চুরির ঘটনা। ইংল্যান্ডে একটি ডাকটিকিট প্রদর্শনীতে রাখা হয়েছিল জুলে রিমে ট্রফি। এক রবিবার দুপুরে চোরেরা প্রদর্শনীর পেছনের দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে ট্রফিটি নিয়ে পালিয়ে যায়।

ঘটনার পর শুরু হয় ব্যাপক খোঁজাখুঁজি। অবশেষে এক সপ্তাহ পরে দক্ষিণ লন্ডনে নিজের কুকুর পিকলসকে নিয়ে হাঁটতে বের হওয়া ডেভিড করবেট নামের এক বৃটিশ নাগরিক একটি ঝোপের নিচে ট্রফিটি খুঁজে পান। পিকলসই ঘ্রাণ শুঁকে সেটির অবস্থান বের করেছিল। পুরস্কার হিসেবে করবেট পান প্রায় ৬ হাজার পাউন্ড এবং পিকলস পায় এক বছরের কুকুরের খাবার। দেশজুড়ে সে হয়ে ওঠে নায়ক।

তবে এখানেই গল্প শেষ নয়। মার্টিন অ্যাথারটনের বই দ্য থেফট অব দ্য জুলে রিমে ট্রফি অনুযায়ী, ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে ইংল্যান্ডের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন গোপনে ট্রফিটির একটি প্রতিরূপ তৈরি করায়। এতটাই গোপন ছিল পুরো বিষয়টি যে, প্রথমে ফিফাকেও জানানো হয়নি।

১৯৬৬ সালে ইংল্যান্ড বিশ্বকাপ জেতার পর খেলোয়াড়দের সামনে যে ট্রফি তুলে ধরা হয়েছিল, সেটি ছিল আসল ট্রফি। তবে পরে নিরাপত্তার কারণে সেটি সরিয়ে ফেলে প্রতিরূপটি ব্যবহার করা হয়।

তাহলে ১৯৭০ সালে ব্রাজিলের হাতে যে ট্রফি তুলে দেওয়া হয়েছিল, সেটি কি আসল ছিল? অধিকাংশের মতে, হ্যাঁ। তবে মজার বিষয় হলো, একসময় ফিফাও বিষয়টি নিয়ে পুরোপুরি নিশ্চিত ছিল না। ১৯৯৫ সালে প্রতিরূপটি তৈরি করা কারিগর জর্জ বার্ড মারা গেলে তার পরিবার সেই প্রতিরূপটি নিলামে তোলে, আর তখন নতুন করে সামনে আসে জুলে রিমে ট্রফির রহস্যময় ইতিহাস।

জর্জের পরিবারের আশা ছিল ট্রফিটি হয়তো ২০ থেকে ৩০ হাজার পাউন্ডে (প্রায় ২৪ হাজার ৫০০ থেকে ৩৬ হাজার ৭০০ ডলার) বিক্রি হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এক রহস্যময় ক্রেতা অবিশ্বাস্য ২ লাখ ৫৪ হাজার ৫০০ পাউন্ড (প্রায় ৩ লাখ ১১ হাজার ডলার) দিয়ে সেটি কিনে নেন। পরে জানা যায়, সেই ক্রেতা আর কেউ নন, স্বয়ং ফিফা। বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রণ সংস্থার ধারণা ছিল, ১৯৭০ সালের আগে কোনো এক পর্যায়ে ভুলবশত কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে আসল ট্রফির জায়গায় প্রতিরূপটি বসানো হয়েছিল।

২০১২ সালে ফিন্যান্সিয়াল টাইমস-এ লেখা এক প্রতিবেদনে সাংবাদিক সাইমন কুপারকে ফিফার এক মুখপাত্র বলেন, ‘হ্যাঁ, ফিফা এই ট্রফিটি কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, কারণ তখন ধারণা করা হয়েছিল এটি আসল ট্রফি হতে পারে।’

তবে পরে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় প্রমাণিত হয়, সেটি আসল নয়। ফলে দেখা গেল, বিপুল অর্থ খরচ করে একটি প্রতিষ্ঠান নকল জিনিস কিনেছে। বর্তমানে সেই প্রতিরূপ ট্রফিটি ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টারে অবস্থিত জাতীয় ফুটবল জাদুঘরে প্রদর্শিত হচ্ছে।

অতএব, ১৯৫০-এর দশকে জার্মানিতে কিংবা এক দশক পরে ইংল্যান্ডে ট্রফিটি বদলে ফেলা না হলে ব্রাজিলকে ১৯৭০ বিশ্বকাপে দেওয়াটা ট্রফিটিই আসল। যেটি পরে ব্রাজিলকে স্থায়ীভাবে দেওয়া হয়েছিল। এরপর ট্রফিটি ব্রাজিলেই ছিল ১৯৮৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। সে সময় রিও ডি জেনেইরোতে ব্রাজিলিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের কার্যালয় থেকে সশস্ত্র ডাকাতদের একটি দল ট্রফিটি চুরি করে নিয়ে যায়। ট্রফিটি রাখা ছিল বুলেটপ্রুফ কাচের একটি প্রদর্শনী বাক্সে। কিন্তু কাচের অংশটি বুলেটপ্রুফ হলেও বাক্সটির পেছনের অংশ ছিল কাঠের। ফলে চোরদের জন্য সেটি খুলে ফেলা খুব একটা কঠিন কাজ ছিল না।

ঘটনার পর কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও কারও বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত অভিযোগ গঠন করা হয়নি। আর ট্রফিটিও কখনো উদ্ধার করা যায়নি। সবচেয়ে প্রচলিত ধারণা হলো, ট্রফিটি গলিয়ে সোনার বার বানানো হয়েছিল। কিন্তু একটু আগেই যেমন বলা হয়েছে, ট্রফিটি খাঁটি সোনা দিয়ে তৈরি ছিল না; এটি ছিল সোনার প্রলেপ দেওয়া রুপার ট্রফি। তাই সেই তত্ত্বও পুরোপুরি বিশ্বাসযোগ্য নয়।

তাহলে ট্রফিটি এখন কোথায়? গলিয়ে ফেলা হয়েছিল, নাকি পৃথিবীর কোথাও লুকিয়ে আছে- চার দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সেই রহস্যের সমাধান হয়নি। আর সেই কারণেই ফুটবলের সবচেয়ে বিখ্যাত ট্রফিগুলোর একটি হয়ে উঠেছে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অমীমাংসিত রহস্যগুলোরও একটি।

এসকেডি/আইএইচএস/