ফুটবল মাঠে রেফারিই একমাত্র ব্যক্তি যার সব সিদ্ধান্তই শিরোধার্য। তিনি ভুল সিদ্ধান্ত দিন বা সঠিক- সবই মেনে নিতে হয়। যদিও কিছু সিদ্ধান্ত পূনর্বিবেচনার সুযোগ এখন আছে। ভিএআর দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগও আছে। তবুও সেটা রেফারির মর্জির ওপর নির্ভর করে।
Advertisement
অনেক সময় দেখা যায় খুব কড়া রেফারি। যাদের প্রতিটি বাঁশি বাজানোর সঙ্গে যেন আগুন বের হয়। সামান্য পান থেকে চুন খসলেই কার্ড বের করে ফেলেন তিনি। কখনও কখনও খুব নির্দয় হয়ে ওঠেন। তখন বের করে ফেরেন লাল কার্ড।
আরও পড়ুন ফুটবল বিশ্বকাপ / তিন লাল কার্ডের ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়ে শুভ সূচনা মেক্সিকোরতো, বিশ্বকাপের মত বড় টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী ম্যাচে যদি কোনো রেফারি তিন-তিনটি লাল কার্ড দেখিয়ে ফেলেন, তখন বোঝা যায় তিনি কতটা মাথা গরম রেফারি। এবারের বিশ্বকাপে মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকার মধ্যকার উদ্বোধনী ম্যাচে রেফারি উইলটন সাম্পাইও তিনবার লাল কার্ডটি পকেট থেকে বের করে প্রদর্শণ করেছেন।
এরপরই এই রেফারি চলে এসেছেন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। সবাই জানতে চাচ্ছেন, আসলে কে এই রেফারি? কেন এতটা মাথা গরম তার? উদ্বোধনী ম্যাচ পরিচালনাকারী রেফারি উইলটন সাম্পাইও একজন ব্রাজিলিয়ান। মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক এস্তাদিও আজতেকায় অনুষ্ঠিত মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকার মধ্যকার ম্যাচে তিনটি লাল কার্ড দেখিয়ে বিশ্বকাপ ইতিহাসে নতুন এক অধ্যায়ের অংশ হয়ে গেছেন তিনি।
Advertisement
স্বাগতিক মেক্সিকো শেষ পর্যন্ত দক্ষিণ আফ্রিকাকে ২-০ গোলে হারিয়ে টুর্নামেন্ট শুরু করলেও ম্যাচ শেষে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়ে দাঁড়ায় রেফারিং সিদ্ধান্ত এবং শৃঙ্খলাজনিত রেকর্ড।
৪৪ বছর বয়সী উইলটন সাম্পাইও ব্রাজিলের অন্যতম অভিজ্ঞ আন্তর্জাতিক রেফারি। ২০১৩ সাল থেকে ফিফার অনুমোদিত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। ২০১৮ সালে রাশিয়া বিশ্বকাপে ভিএআর কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করার পর ২০২২ ও ২০২৬ বিশ্বকাপে মাঠের প্রধান রেফারি হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন।
বিশ্বকাপ ছাড়াও কোপা লিবার্তাদোরেস, কোপা আমেরিকা এবং আন্তর্জাতিক ফুটবলের একাধিক বড় ম্যাচ পরিচালনার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার।
দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবল অঙ্গনে সাম্পাইওকে একদিকে যেমন শীর্ষ পর্যায়ের রেফারি হিসেবে দেখা হয়, অন্যদিকে বিতর্কিত সিদ্ধান্তের জন্যও বহুবার আলোচনায় এসেছেন তিনি।
Advertisement
২০২২ কাতার বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড বনাম ফ্রান্স ম্যাচে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ফাউলে শাস্তি না দেওয়ার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। বিশেষ করে হ্যারি কেইনের একটি পেনাল্টি দাবি উপেক্ষা করার ঘটনায় ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন তিনি।
একই বিশ্বকাপে পোল্যান্ড-সৌদি আরব ম্যাচেও ভিএআর দেখে বিতর্কিত পেনাল্টি দেওয়ার সিদ্ধান্ত এবং আরেক ঘটনায় দ্বিতীয় হলুদ কার্ড না দেখানো নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তবে সমালোচনা সত্ত্বেও ফিফা বড় ম্যাচে তার ওপর আস্থা রেখেছে এবং বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও তুলে দিয়েছে তার হাতে।
মেক্সিকো–দক্ষিণ আফ্রিকা ম্যাচ পরিচালনায় সাম্পাইওর সঙ্গে ছিলেন আন্তর্জাতিক সমন্বয়ে গড়া একটি দল। সহকারী রেফারি ছিলেন: ব্রুনো পিরেস (ব্রাজিল), ব্রুনো বোসকিলিয়া (ব্রাজিল)।
চতুর্থ কর্মকর্তা: হুয়ান গ্যাব্রিয়েল বেনিতেজ (প্যারাগুয়ে), ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর): নিকোলাস গাইয়ো (কলম্বিয়া)। সহকারী ভিএআর: হুয়ান লারা (চিলি)। সাপোর্ট ভিএআর: জেরোম ব্রিসার্ড (ফ্রান্স)।
ম্যাচের শুরু থেকেই কঠোর ছিলেন সাম্পাইও। মেক্সিকো ৯ মিনিটে হুলিয়ান কিনোনেসের গোলে এগিয়ে যায়। গোলটি নিয়ে সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনার পর সিদ্ধান্ত বহাল রাখা হয়।
ম্যাচে মোট দুইটি হলুদ কার্ড দেখানো হয়।
হলুদ কার্ড: তেবোহো মোকোয়েনা (দক্ষিণ আফ্রিকা)- ১৬ মিনিট। ব্রায়ান গুতিয়েরেজ (মেক্সিকো)- ২২ মিনিট।
তবে ম্যাচের নাটকীয়তা শুরু হয় দ্বিতীয়ার্ধে। ৪৯ মিনিটে দক্ষিণ আফ্রিকার স্পেফেহলো সিথোলে প্রতিপক্ষের নিশ্চিত গোলের সুযোগ নষ্ট করায় সরাসরি লাল কার্ড দেখেন। ৮৩ মিনিটে দক্ষিণ আফ্রিকার থেমবা জোয়ানে প্রতিপক্ষের মুখে আঘাত করার ঘটনায় ভিএআর দেখে লাল কার্ড দেওয়া হয়।
সবশেষে অতিরিক্ত সময়ের প্রথম মিনিটে মেক্সিকোর অধিনায়ক সিজার মন্তেস প্রতিপক্ষের নিশ্চিত গোলের সুযোগ ঠেকাতে ফাউল করলে তাকেও সরাসরি লাল কার্ড দেখান সাম্পাইও। ফলে ম্যাচ শেষ হওয়ার আগেই দুই দল মিলে তিনটি লাল কার্ড দেখে।
এই ঘটনার মাধ্যমে বিশ্বকাপ উদ্বোধনী ম্যাচে শৃঙ্খলাজনিত নতুন রেকর্ড গড়ে ওঠে। একই সঙ্গে বিশ্বকাপ ইতিহাসে এটি বিরল ম্যাচগুলোর একটিতে পরিণত হয় যেখানে টানা তিনটি লাল কার্ড দেখানো হয়েছে।
আরও বিস্ময়কর তথ্য হলো- বিশ্বকাপে এর আগে যে ম্যাচে টানা তিনটি লাল কার্ড হয়েছিল, সেখানেও ছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। ১৯৯৮ বিশ্বকাপে ডেনমার্কের বিপক্ষে সেই ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকা একটি এবং ডেনমার্ক দুটি লাল কার্ড দেখেছিল। এই ম্যাচের ফলে বহিষ্কৃত তিন ফুটবলারই গ্রুপ ‘এ’-এর পরবর্তী ম্যাচে নিষিদ্ধ থাকবেন।
মেক্সিকো ২-০ গোলের জয়ে বিশ্বকাপ শুরু করলেও উদ্বোধনী রাতের আলোচনার বড় অংশ দখল করে নিয়েছেন এক ব্যক্তি- রেফারি উইলটন সাম্পাইও।
আইএইচএস/