আমাদের মাঝে একটি খেলার মৌসুম সমাগত এবং আমি জানি এটি আপনাদের কারো কারো কাছে বিনোদনের খোরাক হবে। এ বিষয়ে কিছু কথা বলা প্রয়োজন।
Advertisement
আমার প্রিয় ভাই ও বোনেরা, আমি ইসলামের বোঝাপড়ার ক্ষেত্রে বাস্তববাদী হওয়ার চেষ্টা করি। আমি বুঝি যে অনেক মানুষের কাছে এই ম্যাচগুলো এবং এই মৌসুমটি এমন একটা বিষয় যা তাদের বেশ খানিকটা সময় কেড়ে নেয় এবং তারা অত্যন্ত আনন্দের সাথে এগুলো উপভোগ করেন।
আপনাদের সবার প্রতি আমার পরামর্শ খুবই সাধারণ এবং তা হলো—ইসলামের ফরজ বা আবশ্যিক কোনো বিধান ছেড়ে দিয়ে এমন কোনো কাজে ব্যস্ত হয়ে থাকবেন না যা হয়তো কেবল জায়েজ বা অনুমোদিত। এমন কোনো কাজ করবেন না যা অনুমোদিত বা 'মুবাহ' কিন্তু তা আপনাকে কোনো হারামের দিকে ধাবিত করে।
ফুটবল বিশ্বকাপের ম্যাচগুলো দেখার সময় যদি কোনো ধরনের অশ্লীলতা বা মন্দ কিছু সামনে আসে, তবে আপনার দৃষ্টি অবনত রাখুন এবং সেই দৃশ্যটি দেখবেন না।
Advertisement
এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, টেলিভিশনে কিছু একটা ঘটছে—কেবল এ কারণে আপনার নামাজে দেরি করা যাবে না। কোরআন আমাদের এই শিক্ষা দেয় যে, চরম যুদ্ধ বা লড়াইয়ের ময়দানেও লড়াইরত অবস্থাতেই আমাদের নামাজ আদায় করতে হবে। তাই আমার প্রিয় ভাই ও বোনেরা, সতর্ক হোন।
সব বিষয়েই ‘ইসরাফ’ বা অপচয় হলো ক্ষতিকর। জায়েজ বা অনুমোদিত কাজেও অতিরিক্ত সময় এবং অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে আমাদের নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। এরপরও আপনাকে যদি কিছুটা সময় ব্যয় করতেই হয়, তবে নিশ্চিত করুন যেন আপনি হারামে লিপ্ত না হন। নিশ্চিত করুন যেন এর কোনো কিছুই আপনাকে ফরজ-ওয়াজিব নামাজ ছেড়ে দেওয়া তো দূরের কথা, সুন্নত নামাজ ছেড়ে দেওয়ার দিকেও নিয়ে না যায়।
আরও পড়ুন ধীরস্থিরভাবে নামাজ আদায়ের গুরুত্বআমার প্রিয় ভাই ও বোনেরা, আপনারা যা-ই করুন না কেন, টেলিভিশনে কিছু একটা চলছে—কেবল এই কারণে তাড়াহুড়ো করে নামাজ শেষ করবেন না। নবীজি (সা.) যে নামাজকে মুরগির ঠোকর দেওয়ার সাথে তুলনা করেছেন, সেভাবে নামাজ পড়বেন না। মাঠে কিছু মানুষ একটা বলে লাথি মারছে আর আপনি সেটা মিস করছেন—এই চিন্তায় তাড়াহুড়ো করে ওঠাবসা করবেন না। আপনার নামাজ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যখন নামাজের সময় হবে তখন আপনার সম্পূর্ণ মনোযোগ নামাজেই থাকতে হবে। যখন আপনার নামাজ শেষ হবে, তখন আপনি চাইলে আবার খেলায় ফিরে যেতে পারেন।
মানুষ এই খেলাগুলো দেখার জন্য পরিবার ও বন্ধুদের আমন্ত্রণ জানাতে পছন্দ করে। যদি এমনটা ঘটে, তবে আপনি হোস্ট হন কিংবা অতিথি, নামাজের সময় হলে যেন সবাই খেলা থামিয়ে নামাজ আদায় করে তা নিশ্চিত করা আপনার দায়িত্ব। ইসলামিক শিষ্টাচার ও শালীনতা বজায় রাখা আপনার দায়িত্ব। শরীয়তের পরিপন্থী কোনো কিছু যেন সেখানে না ঘটে, তা নিশ্চিত করা আপনার দায়িত্ব। আর সেখানে যদি নারী-পুরুষ একসাথে খেলা দেখে, তবে অবশ্যই ইসলামিক শালীনতা ও পর্দা বজায় থাকতে হবে।
Advertisement
গতবার এই আসরটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল একটি মুসলিম ভূখণ্ডে। মাসের পর মাস, সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে আমরা ইসলাম এবং সেই দেশটির বিরুদ্ধে এক ভয়াবহ ও বিদ্বেষপূর্ণ অপপ্রচার দেখতে পেয়েছি, কেবল সেখানে ম্যাচগুলো অনুষ্ঠিত হওয়ার কারণে। বর্তমানে এই ম্যাচগুলো আমাদের নিজেদের দেশে (আমেরিকায়) অনুষ্ঠিত হচ্ছে এবং যেহেতু এটি আমাদের নিজেদের দেশ, তাই আমাদের এর সমালোচনা করার অধিকার রয়েছে; আমরা আমাদের দেশকে ভালোবাসি না বলে সমালোচনা করছি না, বরং আমরা চাই আমাদের দেশ আরও উন্নত হোক, আর সেই কারণেই আমরা সমালোচনা করতে পারি।
আমি এখানে বলতে চাই যে, চার বছর আগে সেই দেশে শ্রমিক ও অভিবাসীদের সাথে খারাপ আচরণ নিয়ে কত কথা হয়েছিল! কিন্তু আমেরিকার ভেতরে যে অবৈধ আটক বা ডিটেনশন চলছে, তা নিয়ে কে কথা বলছে? যাদের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে এবং আপনারা তাদের ধরে জেলে পুরে দিচ্ছেন, তাদের সাথে যে অমানবিক আচরণ করা হচ্ছে—তা নিয়ে কে কথা বলছে?
আপনারা বাবা ও মেয়েকে পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছেন। আপনারা ৫ বছরের ছোট কন্যাশিশুকে বন্দি করে রাখছেন। এ দেশে ঘটে যাওয়া এই অমানবিক আচরণ নিয়ে কোনো সংবাদমাধ্যমে একটি প্রবন্ধ বা আর্টিকেলও কি প্রকাশিত হয়েছে? অথচ চার বছর আগে, ওই দেশে কী ঘটছে এবং কেমন আচরণ করা হচ্ছে তা নিয়ে প্রতিটি সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় খবর ছাপা হয়েছিল।
চার বছর আগে মানুষ বলছিল যে, সেই দেশে বাকস্বাধীনতা নেই। হয়তো ছিল না, ঠিক আছে। কিন্তু এখানকার (আমেরিকার) অবস্থা কেমন? আমরা কি ইসরায়েলের সমালোচনার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা বা দমনপীড়ন দেখছি না? আমরা কি দেখছি না যে ইসরায়েলের সমালোচনা করার কারণে সোশ্যাল মিডিয়াগুলো পাগলাটে আচরণ করছে? মানুষ তাদের চাকরি হারাচ্ছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রশাসকরা মঞ্চে উঠে শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের হাত থেকে মাইক্রোফোন কেড়ে নিচ্ছেন কারণ সেখানে ফিলিস্তিনের কথা উল্লেখ করা হচ্ছে! এখানে সমালোচনার স্বাধীনতা কোথায়?
আমরা একটি গণহত্যার বিরুদ্ধে কথা বলার চেষ্টা করছি, আমাদের বাকস্বাধীনতা কোথায়? আপনারা ওই দেশের ব্যাপারে রেগে গিয়েছিলেন, কিন্তু এখানকার এই পরিস্থিতির ব্যাপারে আপনাদের প্রতিক্রিয়া কী? এই দ্বিমুখী নীতি কেন?
আমি বলছি না যে কোনো মুসলিম দেশ একদম ধোয়া তুলসী পাতা বা ফেরেশতাতুল্য। যদি কোনো ভুল থাকে তবে তা অবশ্যই বলা উচিত এবং শ্রমিকদের অধিকার ও তাদের সঙ্গে খারাপ আচরণ নিয়ে কথা বলা প্রয়োজন। কিন্তু এখন যখন খেলা আমাদের নিজেদের দেশে হচ্ছে, তখন এখানকার পরিস্থিতি নিয়ে একটি আর্টিকেলও কোথাও দেখা যাচ্ছে না। সুবহানাল্লাহ!
সেই দেশটিতে এলজিবিটিকিউ (LGBTQ) ইস্যু নিয়ে এবং তারা এলজিবিটিকিউ মানুষদের সাথে ভালো আচরণ করছে না—এই মর্মে কত কথাই না বলা হয়েছিল! তাদের খেলোয়াড়দের মুখের ওপর হাত দেওয়া বা এই জাতীয় কত ছবিই না দেখানো হয়েছিল! আপনারা এখন এপস্টাইন ফাইলের (Epstein files) ব্যাপারে কোথায় লুকিয়ে আছেন?
আপনারা এখন কোথায় যখন আমাদের নিজেদের প্রেসিডেন্ট সেই শিশুদের নোংরা কেলেঙ্কারির (filthy scandals) সাথে জড়িত এবং শত শত কোটিপতির এই নোংরামি ধামাচাপা দেওয়ার ব্যাপারে কেউ একটি শব্দও উচ্চারণ করছে না? যাদের একজনও আজ পর্যন্ত জেলে যায়নি! আপনাদের সমালোচনা এখন কোথায় গেল? আপনারা যে বাকস্বাধীনতার কথা ওই দেশের ক্ষেত্রে বলতে চেয়েছিলেন, তা এখন কোথায়?
আমরা এখন একটি সামান্য আওয়াজ, একটি চিৎকার বা একটি ফিসফিসানিও শুনতে পাচ্ছি না।
লেখক: ড. আবু আম্মার ইয়াসির ক্বাদি পাকিস্তানি বংশোদ্ভুত আমেরিকান মুসলিম লেখক এবং পশ্চিমা বিশ্বে বহুল পরিচিত অন্যতম ইসলামিক শিক্ষামুলক প্রতিষ্ঠান, আল-মাগরিব ইন্সটিটিউটের একাডেমিক অ্যাফেয়ার্স বিভাগের ডিন। তিনি ইসলাম ও সমসাময়িক সাম্প্রতিক ইসলামিক বিষয়াবলির উপর উপর বেশ কয়েকটি বই লিখেছেন এবং লেকচার দিয়েছেন। ২০১১ সালে নিউ ইয়র্ক টাইমস ম্যাগাজিনের একটি প্রতিবেদনে ইয়াসির ক্বাদিকে ‘আমেরিকান মুসলমানদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রভাবশালী ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
সূত্র: ইউটিউব চ্যানেল EPIC MASJID-এ প্রকাশিত ড. ইয়াসির কাদির জুমার খুতবা থেকে লেখাটি তৈরি করা হয়েছে।
ওএফএফ