ঢাকা থেকে নিউজার্সির দূরত্ব প্রায় ১২ হাজার ২৮৬ কিলোমিটার। ভৌগোলিক এ বিশাল ব্যবধান পাড়ি দিতে বিমানে ২৩ থেকে ২৪ ঘণ্টা সময় লাগে। কিন্তু ফুটবলের মহোৎসব বিশ্বকাপ যেন সেই দূরত্বকে মুহূর্তে ঘুচিয়ে দিয়েছে। হাজার মাইল দূরের সেই উত্তাপ এখন আছড়ে পড়েছে ঢাকার অলিতে গলিতে।
Advertisement
আজ ১৪ জুন (রোববার) ভোর ৪টায় অনুষ্ঠিত ব্রাজিল বনাম মরক্কোর গ্রুপ পর্বের হাইভোল্টেজ ম্যাচ ঘিরে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে তৈরি হয়েছে অভূতপূর্ব ফুটবল উন্মাদনা।
বিশ্বকাপের এ আসরে বাংলাদেশ মূলত ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা- এই দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দলের সমর্থক বলয়ে বিভক্ত। বরাবরের মতো এবারও চিত্রটি ছিল একই। ভোরের শিশির ভেজা এই সময়েও রাজধানীর অগণিত ফুটবলপ্রেমী আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা নির্বিশেষে টেলিভিশনের পর্দায় চোখ রেখেছেন। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মাঝে লক্ষ্য করা গেছে ব্যাপক উৎসাহ। প্রিয় দলের জার্সি পরে ও বিশেষ খাবার-দাবারের আয়োজন করে দলবেঁধে রাত জেগে ম্যাচ উপভোগ করছেন তারা।
গায়ে জার্সি, হাতে পতাকা নিয়ে এভাবেই ব্রাজিলের ভক্ত-সমর্থকরা হাজির হন টিএসসিতে
Advertisement
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে জায়ান্ট স্ক্রিনে খেলা দেখার জন্য এই ভোর রাতে জড়ো হয় হাজার হাজার ফুটবলপ্রেমী। স্বাভাবিকভাবেই এদের প্রায় সবাই তরুণ। দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতেও দেখা গেছে একই অবস্থা।
খেলার প্রথমার্ধেই লড়াইয়ের আঁচ ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। ম্যাচের ২১ মিনিটে মরক্কোর ১১ নম্বর জার্সিধারী ইসমাইল সাইবারির গোলে মরক্কো এগিয়ে গেলে আর্জেন্টিনার সমর্থকরা উল্লাসে মেতে ওঠেন। মুহূর্তেই ফেসবুকসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ব্রাজিলের সমর্থকদের উদ্দেশ্য করে তারা লিখতে শুরু করেন, ‘মরক্কো আগে মারি দিছে এক গোল, কি রাগ করলা?’
তবে এই স্বস্তি বেশিক্ষণ টেকেনি। মাত্র ১১ মিনিট পরই ব্রাজিলের পোস্টার বয় ৭ নম্বর জার্সিধারী ভিনিসিয়ুস জুনিয়র অসাধারণ এক গোলে দলকে সমতায় ফেরান। এরপরই পাল্টা আক্রমণে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্রাজিলের সমর্থকরা লিখে বসেন, ‘পরের ধনে পোদ্দারি শেষ, কি রাগ করলা?’- যা নিয়ে দুই পক্ষের সমর্থকদের মধ্যে চলে কথার লড়াই।
খেলার মাঠে হার-জিত থাকলেও ফুটবলের প্রতি এই আবেগ যে অকৃত্রিম সাধারণ সমর্থকদের কথাবার্তায় তার প্রমাণ মিলছে । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও আর্জেন্টিনা সমর্থক সাদমান। তিনি এ ম্যাচ দেখার জন্য সারারাত জেগে ছিলেন।
Advertisement
তিনি জানান, ‘বিশ্বকাপে ব্রাজিল বেশ কয়েক বছর ধরে ট্রফি না পেলেও দল হিসেবে তারা সব সময়ই অন্যতম ফেভারিট। প্রতিপক্ষ যাই হোক, ফুটবলের নান্দনিকতা ও বিশ্বমানের লড়াই উপভোগ করতেই মূলত এই রাত জাগা।’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে খেলা দেখছেন ফুটবলপ্রেমীরা
রহমান মোস্তাফিজ নামে ব্রাজিল ভক্ত একজন ফেসবুকে লিখেন, ‘জয়ের অপেক্ষায়...। একটা সময়ে আব্বা আর আমি রাত জেগে বিশ্বকাপে ব্রাজিলের খেলা দেখতাম। আজ আব্বা নেই। এখন বাবার (ছেলে) সাথে বসে ব্রাজিলের খেলা দেখি...।’
খেলা শেষ পর্যন্ত ১-১ গোলে সমতাতেই শেষ হয়। ব্রাজিলের মত ফেবারিট দলকে জিততে দেয়নি মরক্কো। ব্রাজিল ও মরক্কো দুই দলই আক্রমণ এবং পাল্টা আক্রমণ করে খেললেও গোল আদায় করতে পারেনি।
ভোর ৪টার এই ম্যাচটি কেবল একটি প্রতিযোগিতামূলক ফুটবল ম্যাচ নয়, বরং এটি যেন ঢাকার ফুটবলপ্রেমীদের এক বিশাল উৎসব। হাজার হাজার মাইল দূরের এই উত্তেজনা যে ঢাকা শহরের বাসিন্দাদের কতটা আচ্ছন্ন করে রেখেছে, তা আজ আরও একবার প্রমাণিত হলো।
এমইউ/আইএইচএস