ঈদুল আজহার ছুটিতে বড় ধরনের আইনশৃঙ্খলা অবনতির ঘটনা না ঘটলেও দেশের বিভিন্ন এলাকায় মারামারি, পারিবারিক বিরোধ, সড়ক দুর্ঘটনা ও নানা সংকটে ব্যস্ত সময় পার করেছে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯। ঈদের পাঁচদিনে বিভিন্ন সহায়তা চেয়ে ফোনকল আসে এক লাখ ৭৮টি। এরমধ্যে গুরুত্ব বিবেচনায় ১০ হাজারের বেশি কলের সেবা দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিল মারামারি সংক্রান্ত অভিযোগ।
Advertisement
কোরবানির মাংস বণ্টন নিয়ে সংঘর্ষ থেকে শুরু করে ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধারের মতো ঘটনাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে ৯৯৯। ফলে ঈদের ছুটিতে বিপদে মানুষের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য আশ্রয় হয়ে ওঠে জাতীয় জরুরি সেবার এই হটলাইন।
ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলায় কোরবানির মাংস বণ্টনের স্থান নিয়ে দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন। সংঘর্ষ চলাকালে চার থেকে পাঁচটি বাড়িঘর ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে।
ঈদের দিন (২৮ মে) সকাল ৮টার দিকে উপজেলার আলগী ইউনিয়নের পূর্ব আড়ুয়াকান্দী গ্রামের ঈদগাহে এ ঘটনা ঘটে। মাংস মসজিদে ভাগ করা হবে নাকি প্রত্যেকের বাড়িতে বণ্টন করা হবে— এ বিষয়কে কেন্দ্র করে এ বিরোধের সূত্রপাত হয়।
Advertisement
ভাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মিজানুর রহমান বলেন, ৯৯৯-এ ফোন পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। কোরবানির মাংস বণ্টনের স্থান নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
ঈদের পরদিন (২৯ মে) রাজধানীর ভাটারা থানাধীন শোলমাইদ দর্জিবাড়ি এলাকার একটি বাসা থেকে মনির গাজী (২৪) নামের এক যুবকের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
ভাটারা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) জাহিদুল ইসলাম বলেন, মনির ফুডপান্ডার রাইডার হিসেবে কাজ করতেন। ৯৯৯-এ কল পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে ওই যুবকের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
পুলিশ জানায়, মরদেহটি লোহার অ্যাঙ্গেলের সঙ্গে গলায় দড়ি প্যাঁচানো অবস্থায় ঝুলন্ত ছিল। পরে আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহটি উদ্ধার করা হয়।
Advertisement
ঈদুল আজহা উপলক্ষে টানা পাঁচদিনের সরকারি ছুটিতে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোটামুটি নিয়ন্ত্রণে থাকলেও উদ্বেগ বাড়িয়েছে মারামারির ঘটনা।
আরও পড়ুন ঝড়ের কবলে পড়ে মেঘনায় বিকল ট্রলার, ১২ যাত্রীকে উদ্ধার করলো কোস্ট গার্ড ভুল স্টেশনে ট্রেন থেকে নেমে পড়লো শিশু, ৯৯৯-এর কলে উদ্ধারজাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ছুটির পাঁচদিনে আসা অভিযোগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিল মারামারি সংক্রান্ত কল। ৯৯৯-এর তথ্য অনুযায়ী, গত ২৬ মে থেকে ৩০ মে পর্যন্ত পাঁচ দিনে সহায়তা চেয়ে মোট এক লাখ ৭৮টি কল আসে।
৯৯৯-এর তথ্য অনুযায়ী, ঈদুল আজহার ছুটির সময়ে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ এসেছে মারামারির ঘটনায়। এ সংক্রান্ত কলের সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৯৭৪টি।
এছাড়া জিম্মি করে রাখার ঘটনায় ৮৭১টি, জরুরি অ্যাম্বুলেন্স সহায়তা চেয়ে ৮০২টি, নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় ৬৬৩টি, সড়ক দুর্ঘটনায় ৫৮৩টি, পারিবারিক সমস্যায় ৫৩০টি এবং অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ফায়ার সার্ভিসের সহায়তা চেয়ে ৫১২টি কল আসে।
অন্যদিকে, শব্দ দূষণের অভিযোগে ৩৬৬টি, বাসের অতিরিক্ত ভাড়া আদায়সহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে ৩০৫টি এবং ঈদের পশুর হাটে চাঁদাবাজি ও এক বাজারের গরু অন্য বাজারে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগে ৩০২টি কল পাওয়া যায়। এসবের বাইরে বিভিন্ন বিষয়ে আরও ৩ হাজার ১৭০টি কল আসে ৯৯৯-এ।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট থানা ও সংস্থার মাধ্যমে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
ভুক্তভোগীদের অনেকে জানান, সরাসরি থানায় যোগাযোগ করলে অনেক সময় গড়িমসি করতে দেখা যায়। কিন্তু ৯৯৯-এ কল করলে দ্রুত সাড়া পাওয়া যায় এবং পুলিশও দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায়।
আরও পড়ুন ৯৯৯-এ ফোন, চলন্ত লঞ্চ থেকে মুমূর্ষু শিশু উদ্ধার বন্ধুকে নিয়ে প্রেমিকাকে ধর্ষণ, ৯৯৯ নম্বরে ফোন পেয়ে উদ্ধারনাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক তরুণী বলেন, ঈদের পরদিন পারিবারিক বিরোধের জেরে তার ভাইয়ের ওপর হামলা হলে তিনি ৯৯৯-এ কল করেন। পরে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, প্রতি বছরই ঈদের সময় মারামারির অভিযোগ আসে। তবে এবার ওই সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। জমিজমা, পারিবারিক বিরোধ, গ্রুপভিত্তিক দ্বন্দ্ব ও স্থানীয় বিরোধ থেকেই অধিকাংশ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। সাধারণত পরিবারের সদস্যরা একত্রিত হলে পুরোনো বিরোধ সামনে চলে আসে, তাই ঈদের সময় এ ধরনের ঘটনা বাড়ে। একই সঙ্গে শব্দদূষণ সংক্রান্ত অভিযোগও বেড়েছে।
এ বিষয়ে ৯৯৯-এর পরিদর্শক (গণমাধ্যম ও জনসংযোগ কর্মকর্তা) আনোয়ার সাত্তার জাগো নিউজকে বলেন, ঈদের ছুটির মধ্যে জাতীয় জরুরি সেবার মাধ্যমে নাগরিকদের চাহিদা অনুযায়ী সেবা সরবরাহ করা হয়েছে। ঈদে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ছুটি থাকলেও ৯৯৯-এ কোনো ছুটি থাকে না। রাত-দিন ২৪ ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করতে হয়। এবার বিভিন্ন সহায়তার জন্য ফোনকল আসে ১ লাখ ৭৮টি। অ্যাম্বুলেন্স ও ফায়ার সার্ভিসের সহায়তা চেয়ে কলের সংখ্যা আগের তুলনায় বেড়েছে।
ঈদের ছুটিতেও ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্নভাবে সেবা দিয়েছে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯। এ সময়ে বিভিন্ন ধরনের সহায়তা চেয়ে এক লাখ ৭৮টি ফোনকল আসে। বিশেষ করে অ্যাম্বুলেন্স ও ফায়ার সার্ভিসের সহায়তা চেয়ে কলের সংখ্যা আগের তুলনায় বেড়েছে। — ৯৯৯-এর পরিদর্শক আনোয়ার সাত্তার
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, অন্যান্য বছরের তুলনায় এবারের ঈদযাত্রা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা সন্তোষজনক ছিল। বড় ধরনের ছিনতাই বা আলোচিত অপরাধের ঘটনা ঘটেনি। ব্যক্তি আক্রোশ থেকে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন অপরাধও তুলনামূলক কম ছিল।
২০১৭ সালের ১২ ডিসেম্বর চালু হয় জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯। দিন দিন এর প্রতি দেশের মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। দিনরাত ২৪ ঘণ্টা দেশের যে কোনো প্রান্তে বিপদগ্রস্ত মানুষ ৯৯৯ নম্বরে কল করলেই ছুটে আসছেন পুলিশ সদস্যরা। সহায়তা পাচ্ছেন বেশিরভাগ ভুক্তভোগী।
তিনটি জরুরি সেবা- অ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশি সেবা দিতেই ৯৯৯ এর পথচলা। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে বিপদগ্রস্ত মানুষ প্রয়োজনীয় সহায়তা পাচ্ছেন সরাসরি কল করে। একই সময়ে ৯০ জন সেবাপ্রত্যাশী নিতে পারেন সেবা। কাজ হয় তিন শিফটে। সমাজে বিভিন্ন অপরাধে যুক্ত ব্যক্তিদের গ্রেফতার, গৃহকর্মী নির্যাতন রোধ, পারিবারিক নির্যাতন বন্ধে ৯৯৯ প্রশংসনীয় ভূমিকা রাখছে। ৯৯৯-এ ফোন করে ঝামেলা এড়িয়ে সহজে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসসহ বিভিন্ন জরুরি সেবা পাচ্ছে দেশের মানুষ।
টিটি/এমএএইচ/এমএমএআর