খেলাধুলা

নেইমারের অনুপস্থিতি কতটা প্রভাব ফেললো সেলেসাওদের ম্যাচে?

ব্রাজিলের বিশ্বকাপ অভিযান শুরু হওয়ার কথা ছিল দাপটের সঙ্গে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, মরক্কোর বিপক্ষে ১-১ ড্র করে মাঠ ছাড়তে হয়েছে কার্লো আনচেলত্তির দলকে। স্কোরলাইন হয়তো সমতা দেখাচ্ছে, কিন্তু ম্যাচের বড় অংশে আফ্রিকার দলটিই ছিল বেশি সংগঠিত, আত্মবিশ্বাসী এবং কৌশলগতভাবে এগিয়ে।

Advertisement

ম্যাচের ২১ মিনিটে ব্রাহিম দিয়াজের পাস থেকে ইসমাইল সাইবারির গোল ব্রাজিলের দুর্বলতা উন্মোচন করে দেয়। দ্রুত পাল্টা আক্রমণ, মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ এবং রক্ষণভাগের ফাঁক, সবকিছুই কাজে লাগিয়েছে মরক্কো।

আনচেলত্তি ম্যাচ শেষে নিজের দলের সমালোচনা করতেই দ্বিধা করেননি। তিনি বলেছেন, ‘আমরা ভালো খেলিনি। আমরা বেশ কয়েকবার বলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছি এবং আমার মনে হয় আমাদের আরও ভালো করতে হবে।’

ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল মাঝমাঠের ভারসাম্য। কাসেমিরো ও ব্রুনো গিমারাইসরা মরক্কোর তরুণ ও গতিময় মিডফিল্ডকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি। ফলে বারবার রক্ষণভাগ চাপে পড়েছে। বিভিন্ন বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ব্রাজিলের পজিশনিং ও মিডফিল্ড সংগঠন ছিল অগোছালো।

Advertisement

নেইমার কাফ ইনজুরির কারণে মাঠে নামতে পারেননি। তার অনুপস্থিতিতে ব্রাজিলের আক্রমণে সৃজনশীলতার ঘাটতি স্পষ্ট ছিল। ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে সমতা এলেও দলগত আক্রমণে ধার কম ছিল। নেইমারের অনুপস্থিতি ব্রাজিলকে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, তার উত্তর এক কথায় দিলে হবে — খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেটাই একমাত্র কারণ নয়।

মরক্কোর বিপক্ষে ম্যাচে ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ হারানো এবং আক্রমণে সৃজনশীলতার অভাব। ঠিক এই দুই জায়গাতেই সাধারণত নেইমার পার্থক্য গড়ে দেন।

কার্লো আনচেলত্তি নিজেই নেইমারকে শুধু একজন ফুটবলার নয়, দলের অভিজ্ঞ নেতা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার ভাষায়, ‘আমরা কেবল তার ফুটবলীয় দক্ষতার কারণে তাকে দলে আমন্ত্রণ জানাইনি... বরং তার অভিজ্ঞতা এবং তিনি যে আদর্শ দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে সক্ষম, তার জন্যও তাকে অন্তর্ভুক্ত করেছি।’

মরক্কোর বিপক্ষে দেখা গেছে, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে গোল করে ব্রাজিলের হার এড়িয়েছেন। কিন্তু শেষ তৃতীয়াংশে এমন একজন খেলোয়াড়ের অভাব ছিল যিনি ডিফেন্স ভেঙে চূড়ান্ত পাস দিতে পারেন। নেইমার থাকলে সেই ভূমিকা পালন করার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি ছিল।

Advertisement

তবে পুরো ড্রয়ের দায় নেইমারের অনুপস্থিতির ওপর চাপানোও ঠিক হবে না। আনচেলত্তি ম্যাচ শেষে স্বীকার করেছেন যে ব্রাজিল নিয়ন্ত্রনহীন ছিল এবং অনেক বল হারিয়েছে। অর্থাৎ সমস্যা ছিল দলগত কাঠামো ও কৌশলেও।

ফলে বলা যায়, নেইমার থাকলে ব্রাজিল হয়তো আরও সৃজনশীল ও বিপজ্জনক হতো, কিন্তু মরক্কোর বিপক্ষে যে রক্ষণগত ও মাঝমাঠের দুর্বলতা দেখা গেছে, সেগুলো কেবল নেইমার ফিরলেই পুরোপুরি দূর হয়ে যাবে না। বিশ্বকাপ জিততে হলে ব্রাজিলকে দলগত ভারসাম্যও ফিরিয়ে আনতে হবে।

এক অর্থে, ব্রাজিলকে বাঁচিয়েছেন ভিনিসিয়ুসই। কিন্তু বিশ্বকাপ জিততে হলে শুধু একজন তারকার ঝলকের ওপর নির্ভর করলে চলবে না।

২০২২ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালিস্ট মরক্কো আবারও প্রমাণ করেছে যে তারা আর কোনো ‘আন্ডারডগ’ নয়। সুসংগঠিত রক্ষণ, দ্রুত ট্রানজিশন এবং শৃঙ্খলাবদ্ধ ফুটবল দিয়ে তারা ব্রাজিলকে বারবার অস্বস্তিতে ফেলেছে। ম্যাচের আগে আনচেলত্তিও সতর্ক করেছিলেন যে মরক্কোর রক্ষণ এবং গতি ব্রাজিলের জন্য বড় পরীক্ষা হবে। শেষ পর্যন্ত সেটাই সত্যি হয়েছে।

বিশ্বকাপের ইতিহাস বলে, প্রথম ম্যাচে হোঁচট খেলেও চ্যাম্পিয়ন হওয়া অসম্ভব নয়। আনচেলত্তিও মনে করিয়ে দিয়েছেন, ‘প্রথম ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপ জয় বিচার করা যায় না।’

তবে ব্রাজিলকে দ্রুত কিছু বিষয় ঠিক করতে হবে। মাঝমাঠে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা,রক্ষণভাগের পজিশনিং আরও শক্ত করা।ভিনিসিয়ুসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে দলগত আক্রমণ গড়ে তোলা।

মরক্কোর বিপক্ষে ড্র হয়তো ব্রাজিলের জন্য হতাশার ফল। কিন্তু কখনও কখনও বিশ্বকাপ জয়ের পথ শুরু হয় একটি সতর্কবার্তা দিয়ে। নিউ জার্সিতে মরক্কো সেই সতর্কবার্তাই দিয়ে গেল। এখন দেখার বিষয়, সেলেসাওরা সেই শিক্ষা কত দ্রুত গ্রহণ করতে পারে।

তাপসি তাহিয়াতুল তাজরি

টিটিটি/আইএন