২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে রেকর্ড বরাদ্দ দেওয়া হলেও তা মাঠপর্যায়ে যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করাই সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা ও চ্যালেঞ্জ বলে মন্তব্য করেছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
Advertisement
রোববার (১৪ জুন) সকালে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে বাংলাদেশ হেলথ ওয়াচ এবং সুইডেন সুভেরিয়ের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধের তথ্য উপস্থাপন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. রুমানা হক বলেন, এবারের প্রস্তাবিত বাজেটে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জন্য ৬৯ হাজার ৪০১ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা জাতীয় বাজেটের প্রায় ৭.৪ শতাংশ এবং জিডিপির প্রায় ১ শতাংশ। স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বাস্থ্য খাতে এটিই সর্বোচ্চ বরাদ্দ এবং বিগত সংশোধিত বাজেটের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। তবে বরাদ্দের অঙ্ক বড় হলেও অতীতে উন্নয়ন বাজেট বা এডিপি বাস্তবায়নে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের রেকর্ড খুব একটা উৎসাহব্যঞ্জক নয়।
মূল প্রবন্ধে অধ্যাপক রুমানা হক আরও উল্লেখ করেন, প্রকল্প অনুমোদনে বিলম্ব, জটিল ক্রয় প্রক্রিয়া, দক্ষ ব্যবস্থাপনার অভাব এবং প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতার কারণে বরাদ্দের বড় অংশ সময়মতো বাস্তবায়িত হয় না। ফলে কাগজে-কলমে বরাদ্দ বাড়লেও মাঠপর্যায়ে সাধারণ মানুষ এর পূর্ণ সুফল পায় না। স্বাস্থ্য খাতের এই সফলতার জন্য সুশাসন, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং একটি শক্তিশালী জবাবদিহিমূলক কাঠামো গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, ক্যানসারের মতো অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় (ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও কমিউনিটি ক্লিনিক) বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি।
Advertisement
আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত বলেন, অনেকেই এটিকে জনতুষ্টির বাজেট বলছেন, তবে আমরা বলবো এটি জন-আকাঙ্ক্ষার বাজেট। বাস্তবায়ন নিয়ে নানা কথা রয়েছে এবং এটি আসলেই বড় চ্যালেঞ্জ।
বিগত তিন মাসের মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, আমি নিজে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে গিয়ে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছি। মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ৩০০ জন সংসদ সদস্যকে (এমপি) চিঠি দিয়ে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এমপিদের এই সম্পৃক্ততার ফলে স্থানীয় অবকাঠামো ও স্বাস্থ্যসেবার মান আরও বৃদ্ধি পাবে।
স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন অব্যবস্থাপনা ও নৈরাজ্যের কথা স্বীকার করে ড. এম এ মুহিত বলেন, সাধারণ মানুষ হাসপাতালে ঢুকতেই দালাল, বাটপার ও বিভিন্ন কোম্পানির খপ্পরে পড়ে হেনস্তার শিকার হচ্ছে। এছাড়া আউটসোর্সিং স্টাফ ও নিয়মিত স্টাফদের চেনা মুশকিল হয়ে পড়েছে, যা হাসপাতালে এক ধরনের নৈরাজ্য তৈরি করেছে। তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত সব স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসক, নার্স ও কর্মচারীদের চরম ঘাটতি রয়েছে; যেখানে ১০ জন থাকার কথা, সেখানে আছে মাত্র ৫ জন।
ওষুধ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, মানুষ আশা করে হাসপাতালে গেলে ডাক্তার পাঁচটা ওষুধ লিখলে অন্তত দুইটা যেন বিনামূল্যে পায়, কিন্তু তা পাওয়া যায় না। চারটা টেস্টের মধ্যে দুইটা টেস্ট বিনামূল্যে করার সুযোগ মানুষ চায়। আমরা এই বর্তমান অবস্থা থেকে দ্রুত উত্তরণ চাই।
Advertisement
বাংলাদেশ এখন আর পরমুখাপেক্ষী কিংবা অনুদান নির্ভর দেশ নয় উল্লেখ করে তিনি দেশের ভেতরের রিসোর্স, মেধা ও দীর্ঘদিনের সফলতার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে স্বাস্থ্য খাতকে এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন নওগাঁ-৩ আসনের সংসদ সদস্য ফজলে হুদা বাবুল এবং বাংলাদেশ হেলথ ওয়াচের সদস্য ফারুক আহমেদসহ স্বাস্থ্য খাতের বিশেষজ্ঞ ও বিভিন্ন স্তরের প্রতিনিধিরা।
এসইউজে/এসএনআর