দেশজুড়ে

সংরক্ষিত আগর বাগানে অনিয়ন্ত্রিত পর্যটক

প্রকৃতির সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে প্রতিদিন শত শত মানুষ ছুটে আসছেন শেরপুরের গারো পাহাড়ের আগর বাগানে। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ ভিডিও বানাচ্ছেন, কেউ আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছেন বাগানের সৌন্দর্য। তবে পর্যটকদের এ উচ্ছ্বাসের উল্টো পিঠে দেখা দিয়েছে নতুন শঙ্কা। সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভেতরে অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশে ক্ষতির মুখে পড়তে পারে বনের পরিবেশ, বন্যপ্রাণী ও মূল্যবান আগরসম্পদ।

Advertisement

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ঝিনাইগাতী উপজেলার কাংশা ইউনিয়নের গারো পাহাড়ের সংরক্ষিত বনাঞ্চলের তাওয়াকুচা বিটে ৪০ হেক্টর এবং গজনী বিটে ৫০ হেক্টর জমিতে এ আগর বাগান গড়ে তোলা হয়েছে। প্রায় ১০০ হেক্টর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত এ বাগানটি দেখতে অনেকটাই জাপানের বিভিন্ন প্রাকৃতিক পর্যটন কেন্দ্রের মতো। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এর ভিডিও দেখে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিন শত শত পর্যটক ও বাইকার গ্রুপ এখানে ভিড় করছেন।

বাণিজ্যিক সম্ভাবনা

উদ্ভিদ অধিকার রক্ষা কর্মীরা জানান, বাণিজ্যিকভাবে সবচেয়ে সফল ‘অ্যাকিউলারিয়া ম্যালাকানসিস’ প্রজাতির আগর গাছ গারো পাহাড়ের আবহাওয়ায় চমৎকারভাবে জন্মেছে। বিশ্বে মোট সুগন্ধি আগর উৎপাদনের প্রায় ৫০ শতাংশই এ প্রজাতি থেকে আসে। আগরের কাঠ মূলত নরম ও সাদা প্রকৃতির, যা অনেকটা তুলা গাছের কাঠের মতো। বহুবর্ষজীবী এই গাছ দেড় থেকে দুইশ বছর পর্যন্ত বাঁচে, লম্বায় ৭৫ ফুটের বেশি এবং ভূমিসমতলে ৭ ফুট পর্যন্ত মোটা হতে পারে। এই গাছের ডালপালা সাধারণত কম হয় এবং তিন বছর বয়সে প্রথম ফুল আসে।

আরও পড়ুন লুটপাটে বিপন্ন মৌলভীবাজারের প্রাণ-পরিবেশ উজাড় হচ্ছে কালাছড়া বিটের বৃক্ষ, হুমকির মুখে পরিবেশ

এ বনের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা ও বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে উদ্ভিদ অধিকার রক্ষা কর্মী অভিজিৎ চক্রবর্তী জানান, আগর গাছ ও আতর একটি অতি মূল্যবান ও সম্ভাবনাময় সুগন্ধি। বিশ্বজুড়ে আগর গাছের ১৭টি প্রজাতি থাকলেও ইতোমধ্যে কয়েকটি প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বর্তমানে বাণিজ্যিকভাবে সবচেয়ে বেশি চাষ হওয়া প্রজাতি হলো ‘অ্যাকিউলারিয়া ম্যালাকানসিস’।

Advertisement

আগর কাঠ উৎপাদনের প্রাচীন ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যাখ্যা দিয়ে অভিজিৎ চক্রবর্তী বলেন, প্রাকৃতিকভাবে এক ধরনের কাণ্ড ছেদক পোকা আগর গাছে ছিদ্র তৈরি করে। পরে সেখানে ছত্রাকের আক্রমণ ঘটলে গাছ প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা নিতে গিয়ে জৈবনিক প্রক্রিয়ায় ওই ক্ষতস্থানের চারপাশে বাদামি-কালো রঙের আস্তরণ তৈরি করে, যা আগর উৎপাদনের মূল উপকরণ।

তিনি বলেন, এই ধারণাকে কাজে লাগিয়ে মানুষ কৃত্রিমভাবে গাছে পেরেক মেরে বা আধুনিক ‘বায়ু ভ্যাকসিন’ প্রয়োগ করে ক্ষত সৃষ্টি করে। ভ্যাকসিন প্রয়োগের এক বছরের মধ্যে গাছ থেকে উচ্চমানের কালো সুগন্ধি কাঠ আহরণ করা সম্ভব হয়, যা আন্তর্জাতিক বাজারে অত্যন্ত মূল্যবান।

বন বিভাগের নিষেধাজ্ঞা, তবু থামছে না ভিড়

সংরক্ষিত বনাঞ্চলে সাধারণ মানুষের প্রবেশ আইনত নিষিদ্ধ। তবে বাস্তবে সেই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হচ্ছে না। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ এ বাগানে ভিড় করছেন। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ ভিডিও তৈরি করছেন, আবার কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচার করছেন।

শেরপুর শহর হতে আসা হাসিবুল আলম সিদ্দিকী বলেন, বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে ঘুরতে এসেছি। এসে এ বাগান থেকে অত্যন্ত ভালো লাগছে। বাগানটি এতো সুন্দর যে, ক্যামেরায় যা ধারণ করা সম্ভব না।

Advertisement

ময়মনসিংহ শহর থেকে বন্ধুদের সঙ্গে এসেছেন সিয়াম। তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাগানের ভিডিও দেখে তারা ঘুরতে এসেছেন। ছবি, ভিডিও করে রাখলেন। এমন বাগান কেবল জাপানেই আছে, এতো সুন্দর যা আসলে কেবল চোখ দিয়েই ধারণ করা সম্ভব।

সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া থেকে এসেছেন একটি বাইকার গ্রুপ। তারা জানান, জাপানখ্যাত শেরপুরের এ আগর বাগান দেখে তারা অত্যন্ত খুশি। দলের সদস্য হৃদয় আহমেদ বলেন, দেশের প্রায় সকল পর্যটন কেন্দ্রেই তাদের গ্রুপ হতে ঘুরতে যান। কিন্তু এমন ভিন্ন সুন্দর বাগান কোথাও নেই আর। মূলত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছবি ভিডিও দেখেই তারা এসেছেন।

অনিয়ন্ত্রিত পর্যটনে পরিবেশগত বিপর্যয়

সংরক্ষিত এ বনে পর্যটকদের অবাধ প্রবেশ এখন এই বিপুল অর্থনৈতিক সম্ভাবনার পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। জামালপুর থেকে আসা পরিবেশকর্মী আরিয়ান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমি দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশ নিয়ে কাজ করি। এ বাগানে এসে আমি হতভম্ব। অনিয়ন্ত্রিত যানবাহন, লোকজন যা বাগানের জন্য মারাত্মক হুমকি। এখানে বনবিভাগের যতটুকু দায়িত্বশীল থাকা জরুরি ছিলো তার ছিটেফোঁটাও নেই। কোথাও বনবিভাগের লোকজনকে খুঁজে পেলাম না।

বন্যপ্রাণী ও পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর মতে, যে বনাঞ্চল বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবে সংরক্ষিত, সেখানে পর্যটকদের কারণে তীব্র শব্দদূষণ ও পরিবেশগত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। এতে বনে থাকা বিভিন্ন পাখি, কাঠবিড়ালিসহ বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক বিচরণ ও প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি মানুষের অতিরিক্ত আনাগোনার কারণে নরম কাষ্ঠল আগর গাছগুলোতে বিভিন্ন রোগ ছড়িয়ে পড়ার এবং গাছ মারা যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

আরও পড়ুন গ্রামে হারিয়ে যাচ্ছে বড় ও পুরোনো গাছ দর্শনার্থীর চোখ জুড়ায় যেসব দুর্লভ গাছ

সেভ ওয়াইল্ডলাইফ এন্ড ন্যাচারের (সোয়ান) শেরপুরের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নাঈমুর রহমান তালুকদার বলেন, বাড়তি লোকজনের কারণে গাছগুলোতে বিভিন্ন রোগের সংক্রমণ হতে পারে। এমনকি মানুষের অহেতুক কারণে গাছ মারাও যেতে পারে। এক্ষেত্রে বনে এভাবে অনিয়ন্ত্রিত যানবাহন, মানুষ প্রবেশ বনবিভাগকে শক্ত হাতে বন্ধ করতে হবে।

পরিবেশবাদী সংগঠন শাইনের নির্বাহী পরিচালক মুগনিউর রহমান মনি বলেন, সংরক্ষিত বনে অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন চলতে থাকলে দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে জীববৈচিত্র্য। তাই এখনই এর লাগাম টেনে ধরতে হবে।

প্রশাসন ও বন বিভাগের বক্তব্য

বন বিভাগের রাংটিয়া রেঞ্জের ডেপুটি রেঞ্জার আব্দুল করিম জাগো নিউজকে বলেন, ‘সরকারের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যেই এ বিশাল বাগান করা হয়েছিল। এটি কোনো পর্যটন কেন্দ্র নয়, বরং সংরক্ষিত বন। বন রক্ষার্থে খুব শিগগিরই পর্যটকদের আনাগোনা সম্পূর্ণ বন্ধ ঘোষণা করা হবে। ইতোমধ্যে আমরা মাইকিং করে প্রবেশ নিষেধ জানিয়েছি, কিন্তু সাধারণ মানুষ কথা শুনতে চাচ্ছে না।

পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর দাবি—কৃষি, বন, কাস্টমস, পুলিশ, বিজিবি এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দ্রুত এই বনের সুরক্ষা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

শেরপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক শাকিল আহম্মেদ বলেন, ‘আগর আভিজাত্যের প্রতীক হওয়া সত্ত্বেও আমাদের দেশে এ শিল্পটি এখনো অবিকশিত। তবে গারো পাহাড়ের এ মেগা বাগানটি আমাদের যেকোনো মূল্যে রক্ষা করতে হবে। এখান থেকে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং গ্রামীণ জনপদের ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব। রফতানিমুখী এ শিল্পের বিকাশে স্থানীয় জনগোষ্ঠী, বন বিভাগ এবং প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে দ্রুত এই বনে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হবে।’

মো. নাঈম ইসলাম/কেএইচকে/এমএস