জাতীয়

কৃষি উন্নয়নের পরীক্ষিত মডেলগুলো আরও বিস্তৃতভাবে বাস্তবায়নের আহ্বান

জলবায়ু-সহনশীল, বাজারমুখী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কৃষি উন্নয়নের পরীক্ষিত মডেলগুলো আরও বিস্তৃতভাবে বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

Advertisement

সেই সঙ্গে তারা ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য ধারাবাহিক বিনিয়োগ, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, উদ্ভাবন, উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও অংশীদারত্ব জোরদারের মাধ্যমে দেশের কৃষি রূপান্তরকে আরও ত্বরান্বিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।

রোববার (১৪ জুন) স্মলহোল্ডার এগ্রিকালচারাল কম্পেটিটিভনেস প্রজেক্টের (এসএসিপি) জাতীয় কর্মশালায় এসব বিষয় উঠে আসে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে ঢাকার বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি) মিলনায়তনে কর্মশালাটি হয়। এতে নীতিনির্ধারক, উন্নয়ন সহযোগী, গবেষক, বেসরকারি খাতের প্রতিনিধি, কৃষি উদ্যোক্তা ও কৃষক নেতারা অংশ নেন। তারা দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৃষি উন্নয়ন উদ্যোগ এসএসিপিটির অর্জনগুলো পর্যালোচনা এবং এর সফল মডেলগুলো দেশব্যাপী সম্প্রসারণের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন।

বাংলাদেশ সরকার ও আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিলের (আইএফএডি) যৌথ অর্থায়নে এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়িত এসএসিপি গত নয় বছর ধরে দেশের জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় অঞ্চলে ক্ষুদ্র কৃষকদের উৎপাদনশীলতা, সক্ষমতা, সম্পূরক লাভ ও সার্বিক কৃষি উন্নয়নে কাজ করেছে।

Advertisement

কর্মশালায় প্রধান অতিথি ছিলেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. রফিকুল আই মোহাম্মদ। তিনি প্রকল্পের অর্জনের ওপর ভিত্তি করে সফল উদ্যোগগুলো দেশব্যাপী সম্প্রসারণের গুরুত্ব তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, ‘এসএসিপি প্রমাণ করেছে কীভাবে উদ্ভাবন, সহযোগিতা ও কৃষককেন্দ্রিক সমাধান বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারে। দেশের কৃষিকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে আমাদের এসব অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে হবে, সাফল্য ও চ্যালেঞ্জ উভয়ই মূল্যায়ন করতে হবে এবং কার্যকর পদ্ধতিগুলো সারাদেশে ছড়িয়ে দিতে হবে, যাতে প্রতিটি কৃষক গবেষণা, প্রযুক্তি ও উন্নত বাজার সুবিধার সুফল পায়।’

আইএফএডির বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ড. ভ্যালানটাইন আচানচো ক্ষুদ্র কৃষকদের ক্ষমতায়নের কৌশলগত গুরুত্ব তুলে ধরেন।

আরও পড়ুন কৃষি বাজেট: টেকসই কৃষির অঙ্গীকার বড় বাজেটে কৃষির হিস্যা ছোট

তিনি জানান, বাংলাদেশের কৃষির ভবিষ্যৎ শুধু উৎপাদন বৃদ্ধির ওপর নির্ভর করবে না; বরং ক্ষুদ্র কৃষকদের উদ্ভাবন, বাজারে প্রবেশাধিকার, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে অভিযোজন ও তাদের উৎপাদনের অধিক মূল্য সংযোজনের সুযোগ সৃষ্টি করার ওপর নির্ভর করবে। এসএসিপির সাফল্য শুধু অর্জিত ফলাফল নয়, বরং এটি প্রমাণ করেছে যে সঠিক বিনিয়োগ এবং প্রতিষ্ঠান ও অংশীদারত্বের মাধ্যমে ক্ষুদ্র কৃষকরাই একটি অধিক প্রতিযোগিতামূলক, সহনশীল ও সমৃদ্ধ গ্রামীণ অর্থনীতির চালিকাশক্তি হতে পারেন।

Advertisement

বাংলাদেশে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) প্রতিনিধি ড. শি জাওচুন প্রকল্পের সফল উদ্যোগগুলো টেকসইভাবে অব্যাহত রাখা এবং সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।

তিনি বলেন, ‘যদিও এসএসিপির আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শেষ হচ্ছে, এর শিক্ষা ও অর্জন ভবিষ্যতেও মূল্য সৃষ্টি করবে। আমি সবাইকে আহ্বান জানাই সফল উদ্যোগগুলোকে আরও বিস্তৃতভাবে বাস্তবায়ন করতে এবং নিশ্চিত করতে যে ক্ষুদ্র কৃষক, নারী ও যুবসমাজ যেন কৃষি রূপান্তরের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে।’

এসএসিপির প্রকল্প পরিচালক ড. মুহাম্মদ এমদাদুল হক বলেন, প্রকল্পের অর্জন শুধু উৎপাদন বৃদ্ধির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এটি পুষ্টি-সংবেদনশীল কৃষি চর্চা সম্প্রসারণ, কৃষি সিদ্ধান্ত নেওয়ায় নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি ও কৃষিভিত্তিক উদ্যোক্তা উন্নয়নে যুবসমাজকে সম্পৃক্ত করতে সহায়তা করেছে। একই সঙ্গে সেচ অবকাঠামো, কৃষক সংগঠন ও কমিউনিটি-ভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নয়নে বিনিয়োগ উপকূলীয় অঞ্চলে টেকসই কৃষি প্রবৃদ্ধির জন্য শক্ত ভিত্তি তৈরি করেছে।

কর্মশালায় প্রকল্পের উপকারভোগী চট্টগ্রামের একজন কৃষি উদ্যোক্তা নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে জানান, কৃষকরা যখন উদ্ভাবন, আধুনিক প্রযুক্তি ও নির্ভরযোগ্য পরামর্শসেবার সুযোগ পান, তখন তারা উৎপাদন বাড়াতে, ঝুঁকি কমাতে ও নিজেদের এলাকায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে সক্ষম হন। এসব খাতে বিনিয়োগ ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য লাভজনক ও সহনশীল কৃষিভিত্তিক ব্যবসা গড়ে তোলার অন্যতম কার্যকর উপায়।

এছাড়া কর্মশালায় প্রকল্পের অর্জন, শিক্ষা, উদ্ভাবনী মডেল, বাজার উন্নয়ন উদ্যোগ ও সফল কার্যক্রম সম্প্রসারণের কৌশল নিয়ে বিভিন্ন উপস্থাপনা অনুষ্ঠিত হয়।

কর্মশালায় বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) মহাপরিচালক, কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এম এম আরিফ পাশা, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) চেয়ারম্যান মো. আজিজুল ইসলাম ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব মির্জা আশফাকুর রহমান। সভাপতিত্ব করেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) মহাপরিচালক মো. আব্দুর রহিম।

বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধি, গবেষক, বেসরকারি খাতের প্রতিনিধি, কৃষি উদ্যোক্তা ও কৃষক নেতারা কর্মশালায় অংশ নেন। আমন্ত্রিত অতিথিরা ভবিষ্যৎ কৃষি নীতি, কর্মসূচি ও বিনিয়োগে এসএসিপির অভিজ্ঞতা অন্তর্ভুক্ত করার সম্ভাবনা নিয়ে বিশদ আলোচনা করেন।

এসএসিপি ২০১৮ সালে যাত্রা শুরু করে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে ডিএই, বারি, কৃষি বিপণন অধিদপ্তর (ডিএএম) ও বিএডিসি প্রকল্পটি বাস্তবায়নে একসঙ্গে কাজ করে। লিড এজেন্সির দায়িত্ব পালন করে ডিএই। প্রকল্পে কারিগরি সহায়তা দেয় এফএও।

প্রকল্পটি খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের ১১টি জেলার ৩০টি উপজেলার ২৫০টি ইউনিয়নে বাস্তবায়িত হয়। এটি দুই লাখ ৫০ হাজার ক্ষুদ্র কৃষক পরিবারকে সরাসরি সহায়তা দেয়। চলতি জুন মাসে প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল সফলভাবে সম্পন্ন হয়।

প্রকল্পের ফলাফল অনুযায়ী, নয় বছরের বাস্তবায়নকালে এটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। উপকারভোগী কৃষক পরিবারের ৮৮ শতাংশেরও বেশি উৎপাদন, বিক্রি ও লভ্যাংশের হার বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া ৮৩ শতাংশেরও বেশি পরিবার উচ্চমূল্যের কৃষিপণ্য থেকে অন্তত ২০ শতাংশ আয় বৃদ্ধির অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে।

প্রকল্প এলাকায় দারিদ্র্যের হার ৩৩ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে কমে ১৩ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে এসেছে। একই সঙ্গে নারীদের ন্যূনতম খাদ্য বৈচিত্র্য অর্জনের হার ৩৪ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ৮৫ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছেছে। প্রকল্পটি দারিদ্র্য হ্রাস, পারিবারিক সম্পদ বৃদ্ধি এবং খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা শক্তিশালী করতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।

বাংলাদেশের জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় অঞ্চলে এসএসিপি জলবায়ু অভিযোজন, পুষ্টি-সংবেদনশীল কৃষি, খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা, নারীর ক্ষমতায়ন, যুবসম্পৃক্ততা এবং পরিবেশবান্ধব কৃষি চর্চার একটি কার্যকর মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা আশাবাদ ব্যক্ত করেন, এই প্রকল্পের মাধ্যমে অর্জিত শিক্ষা, উদ্ভাবন ও অংশীদারত্ব ভবিষ্যতের কৃষি উন্নয়ন কর্মসূচির জন্য গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দেবে। সেই সঙ্গে দেশকে প্রযুক্তিনির্ভর, বাজারমুখী ও জলবায়ু-সহনশীল কৃষিব্যবস্থার দিকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করবে।

একিউএফ/এমএস