ফুটবলে জার্মানির ব্যাপারে কথা বলতে গেলে বারবার যে একটি উক্তি ঘুরে ফিরে সামনে আসে, সেটি বিখ্যাত ইংলিশ ব্রডকাস্টার গ্যারি লিনেকারের। ১৯৯০ সালে তিনি বলেছিলেন, ‘ফুটবল খুবই সাধারণ একটি খেলা; ২২ জন খেলোয়াড় ৯০ মিনিট ধরে একটি বলের পেছনে ছুটে বেড়ায়, আর দিন শেষে জার্মানি জিতে যায়।’
Advertisement
সঠিক ভুলের হিসেব কষতে গেলেও ব্যাপারটা অনেকটা তেমনই। জার্মানি বিশ্বকাপের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ধারাবাহিক দল হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করতে পেরেছে।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ১২ বার সেমিফাইনাল এবং সর্বোচ্চ ৮ বার ফাইনাল খেলা দলটি বিশ্বকাপ জিতেছে মোট ৪ বার। ১৯৫৪, ১৯৭৪, ১৯৯০ এবং সর্বশেষ ২০১৪ সালে বিশ্বচ্যাম্পিয়নের খেতাব জিতেছে ডি ম্যানশাফটরা। সবচেয়ে বেশি রানারআপ হবার রেকর্ডটিও এই জার্মানিরই।
শুধু তাই নয়, বিশ্বকাপের ইতিহাসে এখন অবধি একমাত্র গোলকিপার হিসেবে গোল্ডেন বল জয়ের কৃতিত্ব অর্জন করেছেন যে অলিভার কান, তিনিও এই জার্মানিরই গোলকিপার ছিলেন।
Advertisement
এমনকি এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপ ফুটবলের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ডটির মালিক মিরোস্লাভ ক্লোসাও একজন জার্মান ফুটবলার। যদিও এই ২০২৬ বিশ্বকাপেই তার ১৬ গোলের রেকর্ডটি ছাড়িয়ে যেতে পারেন ১৩ গোল নিয়ে চতুর্থ অবস্থানে থাকা লিওনেল মেসি কিংবা ১২ গোল করে পঞ্চম অবস্থানে থাকা কিলিয়ান এমবাপে।
তবে এসব রেকর্ডকে দূরে সরিয়ে রেখে গত দুটো বিশ্বকাপের দিকে নজর দিলে একটু ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। ২০১৮ সালে দক্ষিণ কোরিয়া এবং ২০২২ সালে জাপানের কাছে হেরে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিতে হয়েছিলো জার্মানিকে। তাই এবার শিরোপা জয়ের আলাপে কোথাও ফেভারিটের তকমা গায়ে লাগেনি ব্রাজিলকে ৭ গোল দিয়ে বিধ্বস্ত করা ২০১৪ আসরের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের। সবাই যেন এবারের আসরে বাতিলের খাতায়ই ফেলে দিয়েছেন জার্মানিকে।
কিন্তু জার্মানির সাম্প্রতিক পারফর্ম্যান্স বলছে ভেঙে পড়লেও উঠে দাঁড়ানোর জন্য প্রস্তুত তারা। গত বছরের ৫ সেপ্টেম্বরে বিশ্বকাপ বাছাই পর্বের ম্যাচে স্লোভাকিয়ার বিপক্ষে ২-০ গোলে হারের পর থেকে আর কোনো ম্যাচে হারেনি তারা। এমনকি এই স্লোভাকিয়াকে সেই বছরই ১৮ নভেম্বর পরের লেগে ঘরের মাঠে ৬-০ গোলে বিধ্বস্ত করে দেয় নাগেলসম্যানের শিষ্যরা।
এবারের বিশ্বকাপের জন্য ২৬ সদস্যের স্কোয়াড ঘোষণা করেছে জার্মানি। ৩৮ বছর বয়সী কোচ জুলিয়ান নাগেলসম্যান এবারের বিশ্বকাপে সর্বকনিষ্ঠ কোচ হিসেবে জার্মানির ডাগআউটে দাঁড়াবেন। এমনকি জার্মানির বিশ্বকাপ দলের গোলকিপার ম্যানুয়েল নয়্যারের বয়সও এই কোচের চেয়ে বেশি!
Advertisement
তবে অভিজ্ঞতার হিসেব কষতে গেলে নাগেলসম্যানকে অনভিজ্ঞ বলবার সুযোগ একটুও নেই। বুন্দেসলিগার জায়ান্ট বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে ২০২১-২২ মৌসুমে জিতেছেন বুন্দেসলিগা টাইটেল। এছাড়া পর পর দুই মৌসুমে বায়ার্নের হয়েই জিতেছেন ডিএফএল সুপার কাপ।
এছাড়া জার্মানি জাতীয় দলের বেশিরভাগ খেলোয়াড়ই এসেছেন বায়ার্ন মিউনিখ থেকে। অর্থাৎ এই খেলোয়াড়দের নিয়ে কাজ করার পূর্ব অভিজ্ঞতা নাগেলসম্যানকে দিতে পারে বাড়তি সুবিধা।
৪-২-৩-১ ফর্মেশনেই নাগেলসম্যান তার একাদশ সাজাবেন বলে ধারণা করা যায়, যেখানে গোলবারের নিচে তার ডাকে অবসর ভেঙে ফিরে আসা নয়্যারকে দেখতে পাওয়ারই ইঙ্গিতই দিয়েছেন কোচ। তবে সাম্প্রতিক ম্যাচগুলোতে অলিভার বাউম্যানকেই নিয়মিত মূল একাদশে খেলতে দেখা গেছে, অর্থাৎ ম্যাচভেদে রোটেশন দেখা যেতে পারে। তৃতীয় গোলকিপার হিসেবে থাকছেন আলেক্সান্ডার নুবেল।
সেন্টার ব্যাকে বায়ার্নের জোনাথন তাহ এবং ডর্ট্মুন্ডের নিকো স্লোটারবেকেরই শুরুর একাদশে থাকার ইঙ্গিত দিয়েছেন কোচ। ব্যাক আপ হিসেবে থাকছেন এন্টোনিও রুডিগার, ওয়াল্ডেমার এন্টন এবং ম্যালিক থিয়াও।
জশুয়া কিমিখ ক্লাবে ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবে খেললেও বিশ্বকাপে সম্ভবত তাকে রাইট ব্যাক পজিশনেই দেখা যাবে। অন্যদিকে লেফট ব্যাকে অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ডেভিড রাউম এগিয়ে থাকলেও সাম্প্রতিক ফর্ম এবং জার্মানির সর্বশেষ ম্যাচগুলোর আলোকে নাথানিয়েল ব্রাউনের শুরুর একাদশে থাকার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
তবে ফুলব্যাকদের যথেষ্ট ব্যাক আপ স্কোয়াডে রয়েছে কিনা সেটি নিয়ে একটি প্রশ্নের জায়গা থেকেই যায়। ডিফেন্সিভ মিডে ডাবল পিভটে অ্যালেক্সান্ডার পাভলোভিচ অনেকটা নিশ্চিতভাবেই শুরুর একাদশে থাকবেন। তবে তার সঙ্গী হিসেবে নাগেলসম্যান ফেলিক্স এনমেচাকে রাখবেন নাকি লিওন গোরেটস্কাকে, সেটি দেখার জন্য মুখিয়ে থাকবেন জার্মান ভক্তরা। এছাড়া ব্যাক আপ অপশন হিসেবে আছেন এঞ্জেলো স্টিলার এবং প্যাস্কেল গ্রস। বড় টুর্নামেন্টে অভিজ্ঞতার বিচারে মিডফিল্ড নিয়ে অবশ্য প্রশ্ন রয়েই যায়।
এটাকিং মিডে জার্মানির মূল অস্ত্র হবেন জামাল মুসিয়ালা। তবে একটা মৌসুম ইনজুরিতে থাকার পর এখন সেরা ছন্দে নেই বায়ার্নের এই তারকা। এমনকি সম্প্রতি সাবেক লিভারপুল কোচ জুর্গেন ক্লপ এবং সাবেক বায়ার্ন কিংবদন্তি ফুটবলার থমাস মুলার নাগেলসম্যানকে পরামর্শ দিয়েছেন মুসিয়ালাকে শুরুর একাদশে না রাখার। তবে নাগেলসম্যান তার সিদ্ধান্তে অনড় থাকার ইঙ্গিতই দিয়েছেন। মুসিয়ালার ব্যাক আপ হিসেবে দলে রয়েছেন নাদিয়েম আমিরি এবং আসান ওয়েদ্রাউগো।
লেফট উইংয়ে থাকবেন লিভারপুল তারকা ফ্লোরিয়ান ভির্টজ। ভির্টজ প্রথাগত উইঙ্গার না হলেও জার্মান দলে তাকে উইঙ্গার হিসেবেই বেশি খেলিয়েছেন জুলিয়ান নাগেলসম্যান। রাইট উইংয়ে লেরয় সানে শুরুর একাদশে থাকবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
শেষ মুহূর্তে লেনার্ট কার্লের ইনজুরিতে যেন লেরয় সানের কপাল খুলে গেছে। কারণ কার্ল থাকলে কোচের সানেকে শুরুর একাদশে রাখার সম্ভাবনা কমই ছিলো।এদের ব্যাক আপ হিসেবে দলে রয়েছেন জ্যামি লেওয়েলিং এবং ম্যাক্সিমিলিয়ান বায়ার।
স্ট্রাইকার বা নম্বর নাইন রোলে কোচ কাকে খেলাবেন সেটা একটা চমকের বিষয় হতে পারে জার্মান ভক্তদের জন্য। কারণ সর্বশেষ ম্যাচগুলো থেকে জার্মানির বিশ্বকাপ একাদশে স্ট্রাইকার কে হচ্ছেন সেটা আন্দাজ করাটা খুব কঠিন।
সর্বশেষ তিনটি প্রীতি ম্যাচে তিনজন ফরোয়ার্ডকে শুরুর একাদশে রেখে পরখ করেছেন জার্মান কোচ নাগেলসম্যান। অবশ্য রবিবার কুরাসাওয়ের বিপক্ষে ম্যাচে কাই হ্যাভারর্টজের শুরুর একাদশে থাকার দিকেই ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।
প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব আর্সেনালের এই ফরোয়ার্ড চলতি মৌসুমে ১২ ম্যাচে ২ টি গোল এবং ৩ টি এসিস্ট করেছেন। তবে প্রথাগত নম্বর নাইন ফরোয়ার্ড নন তিনি। মূলত ফলস নাইন হিসেবে উইঙ্গারদের জন্য স্পেস তৈরির কাজে বেশি মনোযোগী থাকা এই ফরোয়ার্ড চলতি মৌসুমে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালেও গোল করেছিলেন।
অন্যদিকে আরেক ফরোয়ার্ড ডেনিজ উন্দাভ রয়েছেন তার ক্যারিয়ারের সেরা ফর্মে। বুন্দেসলিগায় ২৯ ম্যাচে ১৯টি গোল এবং ৬টি এসিস্ট করেছেন। বুন্দেসলীগায় গোল্ডেন বুটের রেসে চলতি মৌসুমে হ্যারি কেইনের পরে দ্বিতীয় অবস্থানেই আছেন তিনি।
এদিকে প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব নিউক্যাসেলে খেলা নিক ওল্টেমাডে ৩৩ ম্যাচে ৮ গোল এবং ৩ এসিস্ট নিয়ে যে খুব একটা ফর্মে আছেন তা বলার সুযোগ নেই। তবে প্রায় ২ মিটার উচ্চতার এই ফরোয়ার্ডের এরিয়েল বল জেতার সক্ষমতা হেডে গোল করার সম্ভাবনা অনেকটাই বাড়িয়ে দিতে পারে।
সর্বশেষ তিন ম্যাচের তিনটিতেই জয় পেয়েছে জার্মানি। তবে কে হতে যাচ্ছেন বিশ্বকাপের মূল একাদশের নিয়মিত নম্বর নাইন এই বিষয়টি নিয়ে নাগেলসম্যানের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানোর জন্য বিশ্বকাপের মঞ্চটাকে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্তটা কতটা সুবিধাজনক হবে সেটা ভাবনার বিষয় বটে।
বিশ্বকাপের এবারের আসরটাকে কোচ নাগেলসম্যান দেখছেন একটু ভিন্নভাবেই। ম্যাচ-পূর্ব সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘ম্যাচে ফেভারিট হলেই জয় নিশ্চিত হয়ে যায় না। আমরা তখনই জিততে পারব, যখন নিখুঁত পারফরম্যান্স উপহার দিতে পারব। আমরা আমাদের সেরা খেলাটা দেখানোর চেষ্টা করব।’
দীর্ঘ দুই বিশ্বকাপে পর পর ব্যর্থতার পর এবারের আসরে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টায় থাকবে। তবে মাঠের লড়াইয়েই বোঝা যাবে, এবার তারা কতটা গোছানো দল।
লিখেছেন: মোস্তাকীম আহম্মেদ রাহুল
এমএমআর