সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লোকগান গেয়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাওয়া শিল্পী লায়লা বাউলের পাশে দাঁড়িয়েছে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়। তার শিল্পসাধনার স্বীকৃতি হিসেবে ৩ লাখ টাকার আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়েছে।
Advertisement
আজ (১৭ জুন) সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কার্যালয়ে আয়োজিত এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী লায়লা বাউলের হাতে ৩ লাখ টাকার একটি চেক তুলে দেন। এ সময় মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
চেক হস্তান্তরের পর মন্ত্রীর দপ্তরেই গান পরিবেশন করেন লায়লা বাউল। তার কণ্ঠে লোকসংগীত ও বাউল গান উপভোগ করেন উপস্থিত অতিথিরা। মাটির গন্ধমাখা সুরে মুখর হয়ে ওঠে পুরো পরিবেশ।
অনুষ্ঠানে লায়লা বাউলের প্রতিভার প্রশংসা করে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী বলেন, প্রকৃত প্রতিভা কখনও চাপা থাকে না। শত প্রতিকূলতা ও বাধা পেরিয়েও তা একসময় মানুষের সামনে বিকশিত হয়। তিনি উদাহরণ হিসেবে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কথা উল্লেখ করেন।
Advertisement
মন্ত্রী আরও বলেন, বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি ও বাউল গান দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই তৃণমূল পর্যায়ে ছড়িয়ে থাকা প্রতিভাবান শিল্পীদের খুঁজে বের করা, তাদের মূল্যায়ন করা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া সরকারের দায়িত্ব।
আরও পড়ুন ‘নয়ন ভরা জল’ নজরুলসংগীত গেয়ে ভাইরাল জীর্ণ শাড়ি পরা কে এই লায়লা বাউলঅনুষ্ঠানে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মিজ কানিজ মওলাসহ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
ফরিদপুর শহরের পরিচিত মুখ লায়লা বাউল। শহরের অলিগলি, রেলস্টেশন, বাসস্ট্যান্ড, শ্মশানঘাট কিংবা হাটবাজার-যেখানে মানুষের ভিড়, সেখানেই খালি পায়ে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায় তাকে। কখনো লোকগান, কখনো আবার পুরোনো বাংলা গান গেয়ে নিজের মতো সময় কাটান এই ভবঘুরে নারী। তবে এবার জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের গান গেয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছেন তিনি।
গত ২৪ মে বিকেলে ফরিদপুর শহরের ময়েজ মঞ্জিলে নজরুল জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ফরিদপুর সাহিত্য পরিষদ। সেখানেই খালি গলায় নজরুলসংগীত পরিবেশন করেন লায়লা বাউল। তার গাওয়া ‘নয়নভরা জল গো তোমার’ গানটি মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে ফেসবুকে। এক রাতের মধ্যেই ভিডিওটি নেটিজেনদের নজরকাড়ে।
Advertisement
অনুষ্ঠানে দেখা যায়, জীর্ণ শাড়ি পরে খালি পায়ে মঞ্চে দাঁড়িয়ে মনের আনন্দে গান গাইছেন লায়লা। তার কণ্ঠ ও গায়কীতে মুগ্ধ হন উপস্থিত দর্শকরা। পরে ভিডিওটি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে অনেকেই তার প্রশংসা করেন। কেউ কেউ আবার ভারতের ভাইরাল শিল্পী রানু মণ্ডলের সঙ্গে তুলনাও করেন।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, লায়লা বাউল প্রায় ২০ বছর ধরে ফরিদপুর শহরের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তার এক মেয়ে ও এক পালক ছেলে রয়েছে। সন্তানরা বড় হয়ে সংসারী হলেও লায়লা আর সংসারে ফেরেননি। শহরের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে ঘুরে গান গেয়েই কেটে যাচ্ছে তার জীবন।
কথিত আছে, কোনো ভিসা-পাসপোর্ট ছাড়াই তিনি হেঁটে আজমির শরিফ পর্যন্ত চলে যান। লোকসংগীতের পাশাপাশি দেশি-বিদেশি শিল্পীদের গানও গাইতে পারেন তিনি।
আরও পড়ুন মেসিকে মাঠে বসে দেখার স্মৃতিচারণ মনির খানেরফরিদপুর সাহিত্য ও সংস্কৃতি উন্নয়ন সংস্থার সাধারণ সম্পাদক হাসানউজ্জামান বলেন, ‘প্রায় ২০ বছর ধরে তাকে শহরে দেখছি। তিনি খুবই ভালো মনের মানুষ। শহরের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়ান, গান করেন, কিন্তু কারও কোনো ক্ষতি করেন না। অনুষ্ঠানে হঠাৎ করেই তাকে গান গাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তার গান এভাবে ভাইরাল হবে, তা ভাবিনি।’
ফরিদপুর সাহিত্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মোফিজ ইমাম মিলন বলেন, ‘অনেক বছর আগে থেকেই লায়লার গান শুনে মুগ্ধ আমি। শিল্পকলা একাডেমিতে গানের চর্চা চলার সময় চুপচাপ বসে থাকতে দেখতাম তাকে। একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম, কেন এভাবে ঘুরে বেড়ান? উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি মানুষ দেখি। দুনিয়াতে কত রকমের মানুষ, কারও সঙ্গে কারও মিল নাই। মানুষ দেখতে আমার ভাল্লাগে।’
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ফরিদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য নায়াব ইউসুফ আহমেদ। তিনি বলেন, ‘নজরুল শুধু বিদ্রোহের কবি নন, তিনি প্রেম ও সাম্যেরও কবি। লায়লার খালি গলায় সুরেলা গান শুনে আমি নিজেও মুগ্ধ হয়েছি।’
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফাতেমা ইসলাম, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আফজাল হোসেন খান পলাশ, নাট্যকার ড. অনুপম হায়াৎ, প্রবীণ সাংবাদিক বদিউজ্জামান চৌধুরীসহ স্থানীয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা।
এমএমএফ/জেআইএম