পঞ্চগড়ের সদর উপজেলা হাড়িভাসা ইউনিয়নের মিরগড় সীমান্ত। সীমানা ঘেঁষে বয়ে চলেছে করতোয়া নদী। নদীর এপার-ওপার দুই দেশের সীমান্ত পিলার। উভয় পাশে চলছে বিজিবি-বিএসএফ-এর সতর্ক টহল।
Advertisement
কিছুদিন ধরেই পঞ্চগড়-১৮ বিজিবি ব্যাটালিয়নের আওতাধীন মিরগড় সীমান্তজুড়ে চলছে পুশ-ইন আতঙ্ক। তবে পুশ-ইন ঠেকাতে বিজিবির সঙ্গে টহল দিচ্ছেন স্থানীয়রা। পুশ-ইন আতঙ্কে দিনভর দৈনন্দিন কাজ করে রাতে ঠিকঠাক ঘুমাতে পারছেন না সীমান্তের লোকজন।
সোমবার (১৫ জুন) সরেজমিনে সদর উপজেলার মিরগড় সীমান্ত ঘুরে দেখা গেছে, সীমান্ত নিরাপত্তায় বিজিবির সঙ্গে স্থানীয়রাও বেশ তৎপর। বিএসএফের পুশ-ইন ঠেকাতে বিজিবি সদস্যরা তাদের টহলসহ নজরদারি বৃদ্ধি করেছে।
সীমান্তের বাসিন্দারাও দিনের পাশাপাশি রাত জেগে লাঠি, বাঁশি আর টর্চলাইট নিয়ে পাহারা দিচ্ছেন। এখানকার সাধারণ মানুষরাও দিনরাত চোখ-কান খোলা রাখছেন। সন্দেহজনক ঘোরাফেরা দেখলেই বিজিবিকে খবর দেন।
Advertisement
শুধু মিরগড় সীমান্ত নয়। একই অবস্থা তিনদিক ভারতীয় সীমান্ত বেষ্টিত পঞ্চগড়ের অন্য সীমান্ত এলাকার। সম্প্রতি জেলার তেঁতুলিয়া, বোদা ও সদর উপজেলার বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা দিয়ে পুশ-ইনের প্রবণতা বেশি দেখা গেছে। পুশ-ইন চেষ্টার কারণে অনেক সময় এসব সীমান্ত এলাকায় বিজিবি-বিএসফের মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছে। ফলে আতঙ্কে মানুষজন ঠিকমতো ঘুমাতে পারেন না।
দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গত বছরের মাঝামাঝিতে সীমান্ত দিয়ে দফায় দফায় পুশ-ইনের ঘটনা ঘটে। সীমান্তবাসীর দাবি, সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গে সরকার পরিবর্তনের পর সীমান্তজুড়ে আবারও বেড়েছে পুশ-ইন চেষ্টা।
সর্বোত্তরের জেলা পঞ্চগড়ের তিনদিকে (উত্তর, পূর্ব ও পশ্চিম) রয়েছে ভারতের সঙ্গে প্রায় ২৮৪ কিলোমিটার সীমান্ত। বর্ডার গাড বাংলাদেশ’র (বিজিবি) নীলফামারী-৫৬, ঠাকুরগাঁও-৫০ এবং পঞ্চগড়-১৮ ব্যাটালিয়ন দায়িত্ব পালন করছে দীর্ঘ এই সীমান্ত এলাকায়। কাঁটাতারের বেড়া নেই, এমন অরক্ষিত অংশ এবং জনবল সংকটে দীর্ঘ সীমান্ত এলাকায় একযোগে নজরদারি করা বেশ কঠিন।
এজন্য কয়েকটি সীমান্ত এলাকায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, গ্রাম পুলিশ ও সচেতন নাগরিকদের সমন্বয়ে অনানুষ্ঠানিক পাহারা দল গঠন করা হয়েছে। রাতে এসব দল সীমান্তবর্তী গ্রামে টহল এবং দিনে সন্দেহজনক গতিবিধি দেখলে বিজিবিকে খবর দেয়।
Advertisement
স্থানীয়দের মতে, সীমান্তবর্তী এ জেলার ভৌগোলিক অবস্থান সীমান্ত নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বেশ গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ সীমান্ত এলাকাজুড়ে রয়েছে বিস্তীর্ণ ফসলি জমি, নদী, খাল এবং জনবসতি। এখানে সার্বক্ষণিক নজরদারি নিশ্চিতে প্রয়োজন আধুনিক প্রযুক্তি ও পর্যাপ্ত জনবল।
পুশ-ইনকে কেন্দ্র করে সীমান্তে অনেক সময় বিজিবি-বিএসএফ মুখোমুখি অবস্থান সীমান্তের বাসিন্দাদের জন্য আতঙ্কের সৃষ্টি করে। এ ধরনের ঘটনা স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক অস্থিরতাও সৃষ্টি করে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উপর পড়তে পারে বিরূপ প্রভাব বলে জানান স্থানীয়রা।
এছাড়া পুশ-ইনের মতো অমানবিক ঘটনায় সামাজিক ও দুই রাষ্ট্রের কূটনৈতিক বিষয় জড়িত। একটি দেশের নাগরিককে অন্য দেশে ঠেলে দেওয়া আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থি বলেও বিজিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সম্প্রতি নীলফামারী-৫৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের আওতাধীন পঞ্চগড় সদরের হাড়িভাসা ইউনিয়নের বড়বাড়ি সীমান্তে ভারতের নারী, শিশুসহ ১০ জনকে পুশ-ইনের চেষ্টা করে বিএসএফ। তবে স্থানীয়দের সহায়তায় বিজিবির বাঁধার মুখে সীমান্তের শূন্য রেখায় অবস্থান নেয় ওই ১০ জন।
এরপর তাদের ফেরত দিতে বিজিবির আহ্বানে ওই সীমান্তের শূন্য রেখায় কোম্পানি কমান্ডার ও ব্যাটালিয়ন কমান্ডার পর্যায়ে একাধিক পতাকা বৈঠক হয়। বৈঠকে তাদের বাংলাদেশি নাগরিক বলে উল্লেখ করে ফেরত নিতে বললে তাতে অস্বীকৃতি জানায় বিএসএফ। সবশেষ তিনদিন অমানবিক অবস্থানের পর রাতের আঁধারে বিএসএফ তাদের ভারতে নিতে বাধ্য হয়।
আরও পড়ুন পুশ-ইনের নতুন করিডোর ময়মনসিংহ-শেরপুর সীমান্ত?গত বছরও একই সীমান্ত দিয়ে একাধিক পুশ-ইনের ঘটনা ঘটে। গত বছরের মে থেকে শুরু করে পরবর্তী তিন মাসে ১১ দফায় নারী, শিশুসহ ১৬৬ জনকে পুশ-ইন করে বিএসএফ। তবে তাদের অধিকাংশ বাংলাদেশি নাগরিক বলে শনাক্ত করা হয়। তারা অবৈধভাবে ভারতে গিয়ে বসবাস করছিলেন। পরে বিজিবি এবং থানা পুলিশের তৎপরতায় পরিচয় নিশ্চিত হয়ে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
নীলফামারী- ৫৬ বিজিবির আওতাধীন সদর উপজেলার হাড়িভাসা ইউনিয়নের সীমান্তঘেঁষা প্রধানপাড়া গ্রামের বাসিন্দা হোসেন আলী বলেন, ‘আগে রাত হলে ঘুমাতাম। সীমান্তে অস্থিরতার কারণে এখন রাতে ঘুম নেই। রাত জেগে অনেকেই বিজিবির সঙ্গে পাহারা দিচ্ছি। দিনে অপরিচিত কোনো লোক দেখলে খোঁজখবর নেই। সন্দেহজনক মনে হলে বিজিবিকে খবর দেয়। পুশ-ইনের কারণে সব সময় আতঙ্কে থাকি। মনে হয়, কখন জানি বিজিবি-বিএসএফ গোলাগুলি শুরু হয়।’
একই সীমান্তের বাসিন্দা কৃষক ফয়জুল ইসলাম বলেন, ‘শুনেছি পশ্চিমবঙ্গে নতুন ভোট হয়েছে। সেখানে সরকার পরিবর্তনের পর থেকে পুশ-ইনের ঘটনা বাড়ছে। এর আগে গত বছরের মাঝামাঝিতে কয়েক বার পুশ-ইন হয়েছিল। গত বছর একবার নারী, শিশুসহ ২১ জনকে পুশ-ইন করেছিল বিএসএফ। তবে বেশ কিছুদিন ধরে শান্তিতে ছিলাম। আবার পুশ-ইন শুরু হয়েছে।
মিরগড় সীমান্ত এলাকার পাথর শ্রমিক জয়নদ্দীন বলেন, ‘এ সীমান্ত দিয়ে এখনো পুশ-ইনের ঘটনা ঘটেনি। এ সীমান্তে বিজিবি টহল ও নজরদারি বৃদ্ধি করেছে। তাদের সঙ্গে আমরাও পাহারা দিচ্ছি। সঙ্গে আনসার সদস্যরাও আছে। তাদের সঙ্গে আমরাও লাঠি, বাঁশি ও টর্চ লাইট নিয়ে পাহারা দিচ্ছি।’
হাড়িভাসা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সাইয়েদ নূর-ই-আলম বলেন, ‘পুশ-ইনের ঘটনা নতুন নয়। এর আগেও ঘটেছে। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার গঠনের পর নতুন করে তৎপরতা দেখা যাচ্ছে। পুশ-ইন ঠেকাতে স্থানীয়রা বিজিবির সঙ্গে রাত জেগে টহল দিচ্ছে। কোনো বাংলাদেশি ভারতে থাকলে সেটার আইনানুগ ব্যবস্থা আছে। উভয় দেশের উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকের মাধ্যমে তাদের মানবিকভাবে ফেরত দেবে। কিন্তু এ ধরনের অমানবিক ঘটনা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।’
আরও পড়ুন বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে বাড়ছে উত্তেজনাপঞ্চগড় ১৮ বিজিবি ব্যাটালিয়নের মিরগড় কোম্পানি কমান্ডার সুবেদার মো. আক্তারুজ্জামান বলেন, ‘১৮ বিজিবির দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় এ পর্যন্ত কোনো পুশ-ইনের ঘটনা ঘটেনি।’
তিনি আরও বলেন, ‘স্থানীয়রা সহযোগিতা করছেন। সীমান্তে সবাই সজাগ আছি। যে কোনো অপরাধ প্রতিরোধ করতে সক্ষম হবো ইনশাল্লাহ।’
নীলফামারীর-৫৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘পুশ-ইন নিয়ে একাধিক পতাকা বৈঠকে কড়া প্রতিবাদ করেছি। রাতের আঁধারে কাউকে জোর করে ঠেলে পাঠিয়ে দেওয়া কোনোভাবেই মেনে নিতে পারি না। সীমান্ত এলাকায় মাইকিং করে স্থানীয়দের সচেতন করা হচ্ছে। বিজিবি সীমান্তে সর্বদা সজাগ রয়েছে।’
এসএইচএ/এএইচ/জেআইএম