হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবানের সাম্প্রতিক নির্বাচনি পরাজয় বিশ্বকে একটি বিষয় নতুন করে মনে করিয়ে দিয়েছে। সেটি হলো—নিজের সুবিধামতো রাজনৈতিক নিয়মকানুন লিখলেও একজন প্রতাপশালী শাসক মুক্ত ও নিরপেক্ষ নয়, এমন নির্বাচনেও হেরে যেতে পারেন।
Advertisement
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান অবশ্য অরবানের চেয়েও দীর্ঘ সময় ধরে রাজনীতির সব প্রতিকূলতাকে জয় করে টিকে আছেন। ক্ষমতার ২৩ বছর পরও তার ঝুলি থেকে নতুন নতুন রাজনৈতিক চাল বের হচ্ছে। তবে বিশ্লেষকদের প্রশ্ন—এরদোয়ানের কৌশল কি এবার আসলেই ফুরিয়ে আসছে?
সেকুলার মডেল থেকে এরদোয়ান যুগকয়েক দশক ধরে তুরস্কের সামরিক ও বেসামরিক শাসকেরা মুস্তফা কামাল আতাতুর্কের দেখানো ধর্মনিরপেক্ষ বা সেকুলার রাজনৈতিক মডেল অনুসরণ করে আসছিলেন। অটোমান সাম্রাজ্যের ধ্বংসাবশেষ থেকে তুর্কি প্রজাতন্ত্র গড়ে তোলা আতাতুর্কের এই মডেলে ক্ষমতা ছিল মূলত বড় বড় শহরের জাতীয়তাবাদী ও কট্টর ধর্মনিরপেক্ষ এলিটদের হাতে।
আরও পড়ুন বাংলাদেশ সফরে হাকান ফিদান: কে এই তুরস্কের ‘দ্বিতীয় ক্ষমতাধর’ নেতা?কিন্তু ২০০২ সালে এরদোয়ান এবং তার জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (একেপি) ক্ষমতার দৃশ্যপটে আসে। আর্থ-সামাজিকভাবে পিছিয়ে পড়া এবং রক্ষণশীল সাধারণ মুসলিমদের সমর্থনে তারা আনাতোলিয়া অঞ্চলের প্রান্তিক মানুষকে তুরস্কের রাজনীতির কেন্দ্রে নিয়ে আসে।
Advertisement
এরদোয়ান টানা ১১ বছর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর ২০১৪ সালে দেশটির প্রথম সরাসরি ভোটে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হন। এরপর ২০১৭ সালের এক সাংবিধানিক গণভোটের মাধ্যমে তিনি সংসদীয় ব্যবস্থার বদলে প্রেসিডেন্টশাসিত সরকার ব্যবস্থা চালু করেন। এই নতুন ক্ষমতা এরদোয়ানকে নতুন আইন তৈরি, পুরোনো আইন সংশোধন, শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়োগ এবং সশস্ত্র বাহিনীর ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ এনে দেয়।
অধিকার পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলো তার বিরুদ্ধে গণমাধ্যম, আদালত ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ তুললেও এরদোয়ান ২০১৮ এবং ২০২৩ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ফের জয়ী হন।
আরও পড়ুন ‘ঝড় আসছে’ / তুরস্ক-মিশরের সঙ্গে নতুন যুদ্ধের ইঙ্গিত ইসরায়েলি গুপ্তচরের বিরোধীদের ওপর চাপ ও আদালতের বিতর্কিত রায়সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা, লাগামহীন মূল্যস্ফীতি এবং ক্রমবর্ধমান একনায়কতান্ত্রিক আচরণের কারণে ভোটাররা এরদোয়ানের ওপর মুখ ফিরিয়ে নিতে শুরু করেছেন। ২০২৪ সালের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আতাতুর্কের দল রিপাবলিকান পিপলস পার্টি (সিএইচপি) বড় জয় পায়। বিশেষ করে ইস্তাম্বুল শহরের মেয়র নির্বাচনে জয়ী হন সিএইচপির তরুণ ও ক্যারিশম্যাটিক নেতা একরেম ইমামোগ্লু, যা এরদোয়ানের জন্য বড় ধাক্কা ছিল।
ঐতিহাসিকভাবেই এরদোয়ান যে কোনো রাজনৈতিক ধাক্কা সামলাতে বিরোধীদের পথ কঠিন করে তোলেন। ফৌজদারি তদন্তের নামে শত শত বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকে গ্রেফতার করা হয়েছে, যাকে সিএইচপি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে আসছে। ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এরদোয়ানের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ভাবা হচ্ছিল ইমামোগ্লুকে। কিন্তু ২০২৫ সালে দুর্নীতির অভিযোগে তাকে গ্রেফতার করা হয়। তার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ তোলা হচ্ছে তাতে সর্বমোট ২৩০০ বছরের বেশি কারাদণ্ড হতে পারে। গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি কারাগারে আছেন।
Advertisement
এরদোয়ানের সবশেষ রাজনৈতিক চালটি দেখা গেছে গত ২১ মে। সেদিন তুরস্কের একটি আপিল আদালত সিএইচপির অভ্যন্তরীণ কাউন্সিলের নির্বাচনের ফলাফল বাতিল করে দেন, যার মাধ্যমে দলটির জনপ্রিয় নেতা ওজগুল ওজেলকে পদচ্যুত করে সাবেক চেয়ারম্যান কেমাল কিলিকদারোগ্লুকে পুনর্বহাল করা হয়। ৭৭ বছর বয়সী কিলিকদারোগ্লু মূলত ২০১১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত টানা পাঁচটি সংসদীয় নির্বাচনে এবং সবশেষ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এরদোয়ানের কাছে হারের জন্য পরিচিত। আদালতের এই সিদ্ধান্তের পর তুরস্কে নতুন করে রাজনৈতিক অস্থিরতা শুরু হয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে শেয়ার বাজারে এবং রাজপথে শুরু হয়েছে বিক্ষোভ।
২০২৮ সালের সমীকরণ ও এরদোয়ানের ভবিষ্যৎআদালতের এই রায়ের মাধ্যমে এরদোয়ান আবারও তার সবচেয়ে বিপজ্জনক প্রতিদ্বন্দ্বীকে সরিয়ে দিতে এবং বিরোধীদের বিভক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন বলে মনে হচ্ছে। তবে এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে, কারণ এরদোয়ানের সামনে পথ ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে।
আরও পড়ুন তুরস্কের ড্রোন বিপ্লব: ছোট ঘর থেকে বিশ্বজয়ের গল্প বায়রাক্তারেরতুরস্কের বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী একজন প্রেসিডেন্ট পাঁচ বছর মেয়াদি দুই মেয়াদের বেশি দায়িত্বে থাকতে পারেন না। সেই হিসেবে ২০২৮ সালের নির্বাচনে এরদোয়ানের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার আইনি সুযোগ নেই। অবশ্য এর দুটি ব্যতিক্রমী পথ বা ‘লুপহোল’ রয়েছে। এক, তিনি সংবিধান সংশোধন করতে পারেন। দুই, আগাম নির্বাচন ডেকে নিজের দ্বিতীয় মেয়াদ সংক্ষিপ্ত করে তৃতীয় মেয়াদের জন্য দাঁড়াতে পারেন। কিন্তু এই দুটি পথ বেছে নেওয়ার জন্য এরদোয়ানের দল একেপির পার্লামেন্টে যে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন, তা নেই।
তা সত্ত্বেও এরদোয়ানের সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলো ইঙ্গিত দেয় যে তিনি সহজে রাজনৈতিক মঞ্চ ছেড়ে যাওয়ার পাত্র নন। আপাতত বিরোধী শিবিরকে নতুন করে ঐক্যবদ্ধ হয়ে একজন একক প্রার্থীর অধীনে মাঠে নামার এবং এরদোয়ানের পরবর্তী চালের জন্য অপেক্ষা করার প্রস্তুতি নিতে হবে।
সূত্র: টাইমকেএএ/