এই মাসের শুরুতে ঢাকায় পাকিস্তান এডুকেশন এক্সপো ২০২৬ উদ্বোধনকালে বাংলাদেশের শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন পাকিস্তানের শিক্ষা ব্যবস্থার ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, ‘আমি স্টলগুলো পরিদর্শন করেছি এবং দেখেছি তাদের শিক্ষা ব্যবস্থা কতটা চমৎকারভাবে উন্নত হয়েছে।’ একই সময়ে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য ৫০০টি পূর্ণ অর্থায়নকৃত আল্লামা মুহাম্মদ ইকবাল বৃত্তি প্রদানের পাকিস্তানের উদ্যোগকে তিনি ‘উষ্ণভাবে স্বাগত’ জানান। শিক্ষামন্ত্রীর এই বক্তব্য যতটা সৌজন্যমূলক, ততটাই তা আলোচনার দাবি রাখে।
Advertisement
সাক্ষরতা, প্রাথমিক শিক্ষায় ভর্তি, নারীশিক্ষা এবং লিঙ্গসমতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে এসব অর্জন আন্তর্জাতিক মহলেও প্রশংসিত। ফলে প্রশ্ন উঠতেই পারে—শিক্ষা সংস্কার ও অনুপ্রেরণার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কেন এমন একটি দেশের দিকে তাকাবে, যার নিজস্ব শিক্ষা ব্যবস্থা নানা কাঠামোগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি?
পাকিস্তানের শিক্ষাব্যবস্থার বাস্তবতা নিয়ে আলোচনা শুরু করা যাক। সর্বশেষ পাকিস্তান ইকোনমিক সার্ভে অনুযায়ী, দেশটির শিক্ষাখাতে সরকারি ব্যয় ২০১৮ সালের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। সে সময় শিক্ষাখাতে বরাদ্দ ছিল মোট জিডিপির প্রায় ২ শতাংশ; ২০২৫ সালে তা কমে ০.৮ শতাংশে নেমে এসেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একইভাবে জুলাই ২০২৪ থেকে মার্চ ২০২৫ পর্যন্ত সময়কালে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ প্রায় ২৯ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে বলেও তথ্য পাওয়া যায়। অথচ জাতিসংঘ-সমর্থিত ইনচিওন ডিক্লারেশন অনুযায়ী দেশগুলোকে জিডিপির ৪ থেকে ৬ শতাংশ শিক্ষায় বিনিয়োগের আহ্বান জানানো হয়েছে। পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরেই সেই লক্ষ্যমাত্রা থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছে।
সেভ দ্য চিলড্রেনের ২০২৫ সালের এক তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানে প্রায় ২ কোটি ৬০ লাখ শিশু বিদ্যালয়ের বাইরে রয়েছে, যা বিশ্বের অন্যতম উচ্চ হার। বেলুচিস্তানের মতো অঞ্চলে মেয়েদের শিক্ষায় অংশগ্রহণের হারও উদ্বেগজনকভাবে কম। এসব তথ্য দেশটির শিক্ষা খাতের গভীর চ্যালেঞ্জেরই প্রতিফলন।
Advertisement
যখন একজন মন্ত্রী কোনো দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রশংসা করেন, তখন তিনি শুধু ব্যক্তিগত মতামত প্রকাশ করেন না; তিনি শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং সমাজের কাছেও একটি বার্তা পৌঁছে দেন। তাই এ ধরনের বক্তব্যে বাস্তবতা, সতর্কতা এবং দায়িত্বশীলতার ভারসাম্য থাকা প্রয়োজন। কারণ শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
এবার আসা যাক বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে। বৈশ্বিক উচ্চশিক্ষার মান মূল্যায়নের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় র্যাঙ্কিং একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়। কিউএস ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাঙ্কিংস ২০২৬ অনুযায়ী, পাকিস্তানের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয় কায়েদ-ই-আজম বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ৩৫৪তম। দেশটির দ্বিতীয় শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয় ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্সেস অ্যান্ড টেকনোলজির অবস্থান ৩৭১তম। যদিও পাকিস্তানের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উপস্থিতি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে, তবুও সামগ্রিকভাবে দেশটির উচ্চশিক্ষা এখনও বিশ্বসেরাদের কাতারে পৌঁছাতে পারেনি।
টাইমস হায়ার এডুকেশন ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাঙ্কিংস ২০২৬-এ পাকিস্তানের ৪৮টি প্রতিষ্ঠান অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তবে এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রতিষ্ঠান ‘রিপোর্টার’ বা ‘পার্টিসিপেন্ট’ শ্রেণিতে রয়েছে, যাদের আনুষ্ঠানিক সংখ্যাগত র্যাঙ্কিং প্রকাশ করা হয়নি। বিষয়টি ইঙ্গিত করে যে, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে পৌঁছাতে দেশটির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর এখনও অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে।
প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ যদি আন্তর্জাতিক মানের উচ্চশিক্ষা গড়ে তুলতে চায়, তাহলে তার অনুপ্রেরণার উৎস কোথায় হওয়া উচিত? জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর কিংবা ভারত—এসব দেশের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বসেরা ২০০-এর মধ্যে অবস্থান করছে। গবেষণা, উদ্ভাবন, আন্তর্জাতিকীকরণ এবং শিল্প-একাডেমিয়া সংযোগের ক্ষেত্রেও তারা অনেক এগিয়ে। বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা উন্নয়নের কৌশলগত অংশীদার হিসেবে এসব দেশকে অধিকতর গুরুত্ব দেওয়া স্বাভাবিকভাবেই অধিক ফলপ্রসূ হতে পারে।
Advertisement
বাংলাদেশ নিজেও শিক্ষাখাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর চেষ্টা করছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষাকে অন্যতম অগ্রাধিকার খাত হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। যদিও বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায়ও বহু সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তবুও শিক্ষা-অর্থায়ন, নারীশিক্ষা এবং প্রাথমিক শিক্ষার বিভিন্ন সূচকে দেশটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। সেই প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানকে শিক্ষাগত সাফল্যের মডেল হিসেবে উপস্থাপন করা কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে আলোচনা হওয়া স্বাভাবিক।
এছাড়া আরও কিছু বিষয় রয়েছে, যেগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। বিভিন্ন গবেষক ও পর্যবেক্ষক পাকিস্তানের কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠ্যক্রমের আদর্শিক প্রভাব, ক্যাম্পাস নিরাপত্তা এবং নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বিদ্যমান কিছু কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করেছেন। এসব বিষয় নিয়ে পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও আলোচনা হয়েছে। ফলে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের সেখানে পাঠানোর আগে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষার মান, ক্যাম্পাস পরিবেশ এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত মূল্যায়ন করা জরুরি।
অবশ্যই এর অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে শিক্ষা সহযোগিতা হওয়া উচিত নয়। গবেষণা, শিক্ষার্থী বিনিময়, যৌথ একাডেমিক কার্যক্রম এবং বৃত্তি কর্মসূচি—এসব ক্ষেত্র পারস্পরিক সহযোগিতার সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে সেই সহযোগিতা বাস্তবতা, তথ্য এবং মানসম্মত মূল্যায়নের ভিত্তিতে হওয়া প্রয়োজন।
শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য নিয়ে বিতর্কের মূল কারণও এখানে। কোনো দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার শক্তি ও সীমাবদ্ধতা উভয় দিক বিবেচনায় না এনে তাকে নিঃশর্তভাবে ‘চমৎকারভাবে উন্নত’ হিসেবে বর্ণনা করলে বাস্তবতার একটি অসম্পূর্ণ চিত্র তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে যখন সেই বক্তব্য তরুণ শিক্ষার্থীদের সিদ্ধান্ত ও প্রত্যাশাকে প্রভাবিত করতে পারে।
বাংলাদেশের শিক্ষা খাতের অর্জন সহজে আসেনি। নারীশিক্ষা, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি, শিক্ষায় প্রবেশাধিকার এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে যে অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে, তা দীর্ঘদিনের নীতি, বিনিয়োগ এবং সামাজিক প্রচেষ্টার ফল। তাই ভবিষ্যতের শিক্ষা সংস্কারও হওয়া উচিত তথ্যভিত্তিক মূল্যায়নের ওপর, কেবল কূটনৈতিক সৌজন্য বা বৃত্তির প্রতিশ্রুতির ওপর নয়।
যখন একজন মন্ত্রী কোনো দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রশংসা করেন, তখন তিনি শুধু ব্যক্তিগত মতামত প্রকাশ করেন না; তিনি শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং সমাজের কাছেও একটি বার্তা পৌঁছে দেন। তাই এ ধরনের বক্তব্যে বাস্তবতা, সতর্কতা এবং দায়িত্বশীলতার ভারসাম্য থাকা প্রয়োজন। কারণ শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, কার্লটন ইউনিভার্সিটি, অটোয়া, কানাডা।
এইচআর/এমএফএ/এএসএম