ফরিদপুরের বোয়ালমারীর কৃষি উদ্যোক্তা হাবিবুর রহমান। বিভিন্ন ফসল ও সবজির পাশাপাশি তিনি বিদেশি ফল আলুবোখারার বাগান করেছেন। এতেই তিনি বাজিমাৎ করেছেন। আলুবোখারার বাগান করে রীতিমতো তিনি সফল। সব খরচ বাদেও তিনি এরই মধ্যে খরচের কয়েকগুণ টাকা লাভবান হয়েছেন।
Advertisement
বোয়ালমারী পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের লোকনাথ গ্রামের মৃত মকসেদ মোল্লার ছেলে হাবিবুর রহমান তার বাড়ির পাশে মসলা জাতীয় বিদেশি ফল আলুবোখারার চাষ করে এলাকায় রীতিমতো সাড়া ফেলেছেন। তার বাগান দেখে এখন অনেকেই আগ্রহী হচ্ছেন। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসছে তার বাগান দেখতে। নিচ্ছেন পরামর্শ।
স্থানীয় কৃষি বিভাগ জানায়, আলুবোখারা একটি বিদেশি ও মসলা জাতীয় ফল। বিশেষ করে বিরিয়ানি রান্নায় আলুবোখারার প্রয়োজনীয়তা বেশি। আলুবোখারা গাছে সাধারণত জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে ফুল আসে। ফুল আসার চার থেকে পাঁচ মাস পর জুন মাসের দিকে ফল পুরোপুরি পরিপক্ব হয়। কাঁচা অবস্থায় এর রং হয় গাঢ় সবুজ। আর ফল পরিপক্ব হলে উজ্জ্বল খয়েরি রং ধারণ করে। পুরোপুরি পাকলে লাল এবং কালো রং হয়ে যায়। যা দেখতে অনেকটা কালো জামের মতো। ফলটি নরম ও রসালো। ৫-৬ বছর বয়সী একটি গাছ থেকে ১০-১৫ কেজির মতো আলুবোখারা পাওয়া যায়। প্রতিটি ফলের ওজন সাধারণত ১০-১২ গ্রাম পর্যন্ত হয়ে থাকে। তবে এ গাছের পরিচর্যা ও সার-কীটনাশক খুব বেশি প্রয়োজন হয় না। সাধারণ সবজি জাতীয় ফসলের মতো পরিচর্যা করলেই হয়।
সরেজমিনে জানা যায়, প্রত্যন্ত অঞ্চলের কৃষি জমিতে আলুবোখারার বাগানটি গড়ে উঠেছে। দূর থেকে অনেকেই চিনতে পারেন না এটি কিসের বাগান। এ অঞ্চলে এই প্রথম চাষ হয়েছে আলুবোখারা। প্রতিটি গাছেই অসংখ্য ফল। সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে খয়েরি, কালো রং ধারণ করে আছে ফলগুলো। প্রতিদিনই বিক্রির জন্য গাছ থেকে পাড়া হচ্ছে। অনেকেই খোঁজ পেয়ে বাড়ি থেকে কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। অনেক ক্রেতা অনলাইনে অর্ডার দিয়ে কিনছেন।
Advertisement
হাবিবুর রহমানের ছেলে মো. জহির রহমান বলেন, ‘বাগানটা আব্বুর সাথে দেখাশোনা করি। প্রথমদিকে আব্বু যখন চারাগুলো কৃষি অফিস থেকে এনে রোপণ করেন, আমি আর আম্মু মনে করতাম আব্বু কী গাছ রোপণ করছেন। বছর দুই পরে ফল এলো। আস্তে আস্তে গাছে গাছে ফল বাড়লো; তখন ভালো লাগা ধরলো। তবে প্রথমদিকে আব্বু পরিচর্যা বুঝতে না পেরে বেশ কয়েকটি গাছ তুলে ফেলে সবজি চাষ করেন। সাতটি গাছ রেখে দেন। এখন গাছগুলোতে প্রচুর ফল ধরেছে। এর চাহিদাও ব্যাপক। প্রতি কেজি ৭০০-৮০০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। এতে আমাদের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়েছে।’
আরও পড়ুন বান্দরবানে কাজুবাদাম ঘরে তুলতে ব্যস্ত চাষিরাবাগান মালিক হাবিবুর রহমানের স্ত্রী মোসাম্মৎ জেসমিন বেগম জাগো নিউজকে বলেন, ‘বছর পাঁচেক আগে আমাদের বাড়িতে কৃষি অফিসার আসতেন এবং এলাকার ভালো কৃষকদের নিয়ে সভা করতেন। এরপর আমাদের আলুবোখারার কিছু চারা দেন। সেগুলো লাগানোর পর কয়েক বছর অল্প ফল আসে। তবে এই বছর প্রতিটি গাছে ব্যাপক ফল এসেছে। এক-দেড় মাসে প্রায় ৫-৬ মণ বিক্রি ও বিলি করেছি। দেড় লাখ টাকার ওপরে বিক্রি হয়েছে। গাছে আরও কয়েক মণ হবে। সব মিলিয়ে কয়েক লাখ টাকা বিক্রি করতে পারবো। যাতে সব খরচের তুলনায় কয়েকগুণ লাভ হবে।’
লোকনাথ গ্রামের বাসিন্দা রফিক ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘এটি একটি দামি ফল। এর বাগান করে হাবিবুর রহমান সফল। আলুবোখারা ভালো দামের। এ জন্য আমি চাষ করতে চাই। এখান থেকে কিছু কলম করে চারা নিয়ে বাগান করতে চাই।’
মো. রেজাউল মোল্লা বলেন, ‘এগুলো বিরিয়ানির ভেতর দিলে খুব স্বাদ হয়। হাবিবুরের দেখাদেখি অনেকেই বাগান করতে আগ্রহী। এককথায় আলুবোখারার বাগান করে হাবিবুর রহমান পুরোপুরি সফল। বাগান করে তিনি বাজিমাৎ করেছেন।’
Advertisement
আব্দুর রহিম নামে এক তরুণ বাগান দেখতে এসেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি ৩৩ বছর বয়সে জীবনের প্রথম আলুবোখারার গাছ ও ফল দেখলাম। কাঁচা খেতেও বেশ সুস্বাদু। প্রচুর ফল ধরেছে। দেখতে এসে নিজহাতে গাছ থেকে ফল পেড়ে খেলাম। আমিও এর বাগান শুরু করবো।’
কৃষি উদ্যোক্তা ও বাগান মালিক হাবিবুর রহমান বলেন, ‘কয়েক বছর আগে কৃষি অফিস থেকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ২৫টি আলুবোখারার গাছ পেয়েছিলাম। বাড়ির পাশের কৃষিজমিতে গাছগুলো রোপণ করি। রোপণের এক বছর পর না বুঝে অনেকটা রাগ করে ১৮টি গাছ কেটে ফেলি। বর্তমানে বাগানে ৭টি গাছ আছে। বাগান করতে তেমন পরিশ্রম, সার ও পরিচর্যার প্রয়োজন হয় না। এলাকার মাটি ও আবহাওয়ায় বড় পরিসরে বাগান করে লাভবান হওয়া সম্ভব। তবে উঁচু জমি ও দোআঁশ মাটি হতে হবে। যাতে গাছের গোড়ায় পানি না জমে।’
আরও পড়ুন বিদেশি ফল মিরাকল বেরি যেভাবে চাষ করবেনহাবিবুর রহমান আরও বলেন, ‘গাছ লাগানোর দুই বছর পর থেকে প্রচুর ফল আসতে শুরু করে। বাজারে ৭০০-৮০০ টাকা কেজিদরে বিক্রি করছি। ফল সংরক্ষণ করে বিক্রি করতে পারলে স্থানীয় বাজারে প্রতি কেজি ১ হাজারের বেশি বিক্রি করা সম্ভব। আমার সব খরচ বাদে কয়েকগুণ লাভবান হয়েছি। বাগানে আরও বেশ কয়েক মণ আছে। প্রতিদিনই দূর-দূরান্ত থেকে বাগান দেখতে এবং কিনতে লোকজন আসে। এ বছরই বেশি জমিতে বাণিজ্যিক আকারে বাগান তৈরির কার্যক্রম শুরু করেছি।’
বাগান দেখতে আসা আরেক সফল উদ্যোক্তা আকাশ সাহা জাগো নিউজকে বলেন, ‘জেলার মধ্যে এ অঞ্চলে মসলা জাতীয় ফল আলুবোখারা নেই বললেই চলে। পরিসরে ছোট হলেও এটিই প্রথম বাগান। আলুবোখারা বিরিয়ানির সঙ্গে খেয়েছি কিন্তু কখনো গাছ এবং কাঁচা অবস্থায় দেখিনি। খবর শুনে দেখতে এসেছি। নিজহাতে পেড়ে খেলাম এবং বাড়ির জন্য কয়েক কেজি কিনে নিলাম। বাড়িতে নিয়ে আচার বানাবো।’
বোয়ালমারী উপসহকারী কৃষি অফিসার অভিজিৎ বিশ্বাস বলেন, ‘আলুবোখারা মসলা জাতীয় ফল। এটি পোলাও, বিরিয়ানি, আচার ও চাটনি তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। আলুবোখারার পুষ্টিগুণ ও বহুমুখী ব্যবহারের কারণে বিশ্বজুড়ে এর জনপ্রিয়তা আছে। এ ছাড়া বিভিন্ন অভিজাত ও সুস্বাদু খাবার তৈরিতেও এটি ব্যবহৃত হয়ে থাকে।’
বোয়ালমারী উপজেলা কৃষি অফিসার আলভীর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘ইরাক, ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন জায়গায় এবং ভারতের কিছু এলাকায় আলুবোখারার চাষ হয়। বর্তমানে আমাদের দেশেও চাষ হচ্ছে। বোয়ালমারীর কৃষি উদ্যোক্তা হাবিবুর রহমানের বাড়িতে আলুবোখারা চাষ হচ্ছে। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে হাবিবুর রহমানের পাশে আছি। তাকে সার্বিক সহযোগিতা করা হচ্ছে।’
বোয়ালমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম রকিবুল হাসান বলেন, ‘এটি ভালো খবর। একেবারে আনকমন একটি বাগান করে সফল হয়েছেন কৃষি উদ্যোক্তা হাবিবুর রহমান। এ উপজেলাসহ আশপাশে আলুবোখারার চাষের খবর পাইনি। হাবিবুর রহমানকে ধন্যবাদ জানাই। উপজেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগ তার পাশে থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে।’
আরও পড়ুন ভোজ্যতেলের চাহিদা কমাবে ‘পেরিলা’, হতে পারে রপ্তানিএনকেবিএন/এসইউ