আন্তর্জাতিক রাজনীতির ইতিহাসে প্রায়ই দেখা যায় যে, শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো কখনোই সরাসরি চাপ প্রয়োগের মধ্যেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখে না। কখনো সংবাদমাধ্যমকে ব্যবহার করা হয়, কখনো নিরাপত্তা উদ্বেগের গল্প তৈরি করা হয়, কখনো মানবাধিকার, কখনো সন্ত্রাসবাদ, আবার কখনো আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন তুলে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রকে কূটনৈতিকভাবে চাপে ফেলার চেষ্টা করা হয়। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা বিশ্লেষণ করলে মনে হয়,ঠিক এমনই একটি নতুন কূটনৈতিক ও প্রচারণাগত চাপ সৃষ্টির চেষ্টা চলছে।
Advertisement
সম্প্রতি ভারতের একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে ভারতে নিযুক্ত ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত রিউভেন আজারের দেওয়া সাক্ষাৎকার সেই প্রশ্নকে আরও জোরালো করেছে। তিনি বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে হামাসের কার্যক্রম বিস্তারের অভিযোগ তুলে যে ভাষায় বক্তব্য দিয়েছেন, তা শুধু বিস্ময়কর নয়, বরং অনেকাংশে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতাকে অবজ্ঞা করার শামিল।
প্রশ্ন হলো—কেন বাংলাদেশ? এর অন্যতম কারণ হলো আমাদের পাসপোর্টে আবারও ইসরাইল ব্যতীত কথাটি আবারও ফিরিয়ে আনার ঘোষণা। যেটি হাসিনা সরকার কৌশল করে আমাদের পাসপোর্ট থেকে মুছে দিয়েছিল।
যে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অবদানকারী? যে দেশ দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান বজায় রেখেছে? যে দেশের নিরাপত্তা বাহিনী উগ্রবাদ দমনে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছে? যে দেশের মানুষ সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদকে ঘৃণা করে। সেই বাংলাদেশ সম্পর্কে এত বড় কথা বলার রহস্য কি?
Advertisement
যদি কোনো রাষ্ট্রের কাছে নির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ থাকে, তাহলে তার জন্য রয়েছে রাষ্ট্রীয় ও কূটনৈতিক চ্যানেল। কিন্তু গণমাধ্যমের পর্দায় বসে একটি দেশের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করার প্রচেষ্টা নিঃসন্দেহে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেই প্রতীয়মান হয়।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এই বক্তব্য কোনো নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে নয়, বরং ভারতের একটি প্রভাবশালী গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—এটি কি নিছক একটি সাক্ষাৎকার, নাকি বৃহত্তর কোনো রাজনৈতিক বার্তার অংশ?
বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অপপ্রচার নতুন নয়।
সীমান্ত হত্যা বছরের পর বছর ধরে চলছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো বহুবার উদ্বেগ জানিয়েছে। এরপর শুরু হয়েছে কথিত ‘পুশ-ইন’। সীমান্ত দিয়ে জোরপূর্বক মানুষ ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ আন্তর্জাতিক মহলেও আলোচিত হয়েছে। জাতিসংঘ পর্যন্ত বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এর মধ্যেই আবার বাংলাদেশের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট নতুন বয়ান হাজির করা হয়েছে।
Advertisement
ঘটনাগুলোকে আলাদা আলাদা করে দেখলে হয়তো সেগুলো বিচ্ছিন্ন মনে হতে পারে। কিন্তু সবগুলো ঘটনাকে এক সুতোয় গাঁথলে যে চিত্র সামনে আসে তা হলো—বাংলাদেশের স্বাধীন কূটনৈতিক অবস্থানকে ঘিরে একটি চাপ সৃষ্টির প্রয়াস।
বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়া ও চীন সফরের পরিকল্পনা ঘোষণা করার পর থেকেই আঞ্চলিক কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। ভারত সফরের আমন্ত্রণ থাকা সত্ত্বেও প্রথম দ্বিপক্ষীয় সফরের জন্য মালয়েশিয়া এবং পরবর্তীতে চীনকে অগ্রাধিকার দেওয়া অনেকের কাছে বাংলাদেশের নতুন কূটনৈতিক দিকনির্দেশনার ইঙ্গিত হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে।
সেখানেই ভারতের কিছু নীতিনির্ধারক মহলের অস্বস্তি শুরু হয়েছে কি না, সেই প্রশ্ন এখন অনেকেই তুলছেন।
কারণ বাস্তবতা হলো, বিএনপির পররাষ্ট্রনীতি ঐতিহাসিকভাবেই ভারসাম্যপূর্ণ। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সময় থেকে দলটির পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি ছিল—জাতীয় স্বার্থ, সমতা, মর্যাদা এবং বহুমুখী কূটনৈতিক সম্পর্ক। কোনো একটি রাষ্ট্রের ওপর অতিনির্ভরতা নয়, বরং সবার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক—এটাই ছিল সেই নীতির মূল দর্শন।
অন্যদিকে সাম্প্রতিক ইতিহাসে বাংলাদেশ এমন এক পররাষ্ট্রনীতি প্রত্যক্ষ করেছে, যেখানে একটি নির্দিষ্ট রাষ্ট্রের প্রতি অস্বাভাবিক ঝোঁক নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকে জনগণ শিক্ষা নিয়েছে। বাংলাদেশের মানুষ এখন এমন একটি পররাষ্ট্রনীতি চায়, যা হবে সম্পূর্ণভাবে বাংলাদেশের স্বার্থকেন্দ্রিক। ভারতের জন্য সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো—বাংলাদেশ আর আগের বাংলাদেশ নয়। আজকের বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সম্ভাবনাময় অর্থনীতি। বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত কেন্দ্রবিন্দু। আঞ্চলিক বাণিজ্য ও সংযোগ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশ্বের বড় শক্তিগুলো নতুন করে বাংলাদেশকে মূল্যায়ন করছে। ফলে বাংলাদেশকে পুরোনো দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখার সুযোগ আর নেই।
দুঃখজনকভাবে ভারতের কিছু রাজনৈতিক ও গণমাধ্যম মহলে এখনো সেই পুরোনো মানসিকতার প্রতিফলন দেখা যায়। তারা মনে করে বাংলাদেশকে চাপের মধ্যে রেখে নীতিগত অবস্থান পরিবর্তন করানো সম্ভব। কিন্তু ইতিহাস বলছে, আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন কোনো জাতিকে ভয় দেখিয়ে বা অপপ্রচার চালিয়ে দীর্ঘমেয়াদে প্রভাবিত করা যায় না।
ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূতের বক্তব্যও সেই কারণেই শুধু একটি কূটনৈতিক মন্তব্য নয়; এটি বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ও অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করার একটি বিপজ্জনক প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
বাংলাদেশ সরকারের উচিত এই ধরনের বক্তব্যকে হালকাভাবে না নেওয়া। শুধু আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানানোই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন কূটনৈতিকভাবে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ, আন্তর্জাতিক মহলে প্রকৃত তথ্য তুলে ধরা এবং বাংলাদেশের বিরুদ্ধে পরিচালিত যে কোনো অপপ্রচারের দ্রুত ও কার্যকর জবাব দেওয়া।
কারণ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নীরবতা অনেক সময় সম্মতির লক্ষণ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়।
ভারতকেও বুঝতে হবে, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তি যদি সত্যিই বন্ধুত্ব হয়, তাহলে সেই সম্পর্ক হবে সমমর্যাদা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার। বড় রাষ্ট্র-ছোট রাষ্ট্রের মানসিকতা দিয়ে ২১শ শতাব্দীর কূটনীতি পরিচালনা করা যায় না।
পরিশেষে বলতে চাই,বাংলাদেশকে ঘিরে যেকোনো অপপ্রচার, চাপ প্রয়োগ বা কূটনৈতিক ষড়যন্ত্রের খেলাকে সবোর্চ্চ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে, পাশাপাশি জবাবও দিতে হবে রাষ্ট্রীয় প্রজ্ঞা, জাতীয় ঐক্য এবং দৃঢ় কূটনৈতিক অবস্থানের মাধ্যমে।
কারণ বাংলাদেশ কারও করুণা বা অনুমতির ওপর দাঁড়িয়ে নেই। এই রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে, টিকে আছে জনগণের শক্তিতে, আর এগিয়ে যাবে নিজের জাতীয় স্বার্থ ও আত্মমর্যাদার ভিত্তিতে। কেউ যদি সেই বাস্তবতাকে অস্বীকার করতে চায়, তাহলে শেষ পর্যন্ত তাদেরকেই সেই মূল্য পরিশোধ করতে হবে।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন। ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com
এইচআর/এএসএম