ক্যাম্পাস

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ফের অস্থিরতার আশঙ্কা

দেশের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) আবারও অস্থিতিশীল হয়ে ওঠার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলায় জড়িতদের বিচার, আবাসিক হলে রুম দখলের অভিযোগ এবং সাবেক ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের নতুন করে সক্রিয় হওয়ার নানা ঘটনায় ক্যাম্পাসে উত্তেজনা বাড়ছে।

Advertisement

সাধারণ শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে যে কোনো সময় বড় ধরনের সংঘাতের সৃষ্টি হতে পারে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সূত্র বলছে, গত ৫ আগস্টের পর নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়া নিষিদ্ধ বা বিতর্কিত সাবেক ছাত্রলীগ কর্মীরা আবারও ক্যাম্পাসে সুসংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে। প্রশাসনের উদাসীনতায় তারা গোপনে বিভিন্ন মাধ্যমে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। তাদের এ আকস্মিক তৎপরতাকে ক্যাম্পাসকে অস্থিতিশীল করার একটি পরিকল্পিত নীলনকশা হিসেবে দেখছেন অংশীজনরা।

আরও পড়ুন জাবির পাশে গেরুয়ায় সংঘর্ষে আহত বেড়ে ৪০, পরিস্থিতি উত্তপ্ত

গত ১৫ জুন অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেটে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে হামলায় জড়িতদের বিচারের রায় হয়েছে। সেখানে অভিযুক্ত ২১ শিক্ষক ও দুই কর্মকর্তার মধ্যে একজন শিক্ষককে বাধ্যতামূলক অবসর, ৯ জন শিক্ষক ও একজন কর্মকর্তাকে পদাবনতি ও বেতন অবনমন, দুই শিক্ষককে সতর্কীকরণ এবং সাতজন শিক্ষক ও একজন কর্মকর্তাকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তৎকালীন ভিসি, প্রো-ভিসি (প্রশাসন) ও কোষাধ্যক্ষের বিরুদ্ধে পৃথক তিনটি স্ট্রাকচার কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। এটা নিয়ে আওয়ামী শিক্ষক কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে বলে জানা যায়।

Advertisement

এছাড়া গত ১২ মে ধর্ষণচেষ্টার ঘটনাকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সাবেক ছাত্রলীগ কর্মীদের আকস্মিক সক্রিয়তা এবং সাধারণ আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একই সঙ্গে এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের পোস্টারিং তাদের সক্রিয়তার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় অস্থিতিশীল করার চেষ্টাকে দৃশ্যমান করেছে।

আরও পড়ুন জাবিতে জুলাই হামলার বিচার নিয়ে বিতর্ক, সাক্ষীদের হুমকি

অভিযোগ রয়েছে, ধর্ষণচেষ্টার ঘটনার প্রতিবাদে আয়োজিত আন্দোলনকে পুঁজি করে ক্যাম্পাস অস্থিতিশীল এবং পরিস্থিতি ঘোলাটে করার পেছনে সরাসরি আওয়ামী লীগের সম্পৃক্ততা রয়েছে। মূলত, দ্বাদশ জাতীয় সংসদের সাতক্ষীরা জেলার সাবেক এক আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্যের মেয়ে, শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত এক আওয়ামীপন্থি সাংবাদিকের মেয়েকে এই আন্দোলনের সম্মুখসারিতে দেখা যায়। এছাড়াও সাবেক ছাত্রলীগ কর্মীদের উপস্থিতিও ছিল।

নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সাবেক একজন সহ-সম্পাদক জানান, ধর্ষণচেষ্টার ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রলীগ কর্মীদের তৎপর থাকতে বলা হয়েছিল। এ ঘটনায় পরবর্তীতে জাবি ছাত্রলীগের ত্রাণ ও দুর্যোগবিষয়ক সম্পাদক মাহবুব আলম শান্তর নামে পোস্টারিং করা হয়েছিল। এমনকি এর আগে কয়েক দফায় গভীর রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেইন গেটে তাদের মানববন্ধন করার নির্দেশও দেওয়া হয়। মূলত, দলীয় কর্মীদের কাজে লাগিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে অসহযোগিতা করা ছিল এর উদ্দেশ্য।

আরও পড়ুন জাবিতে পুলিশ শিক্ষার্থী সংঘর্ষে আহত ৩০

জাকসুর সমাজসেবা ও মানবসম্পদ উন্নয়নবিষয়ক সম্পাদক আহসান লাবিব বলেন, সম্প্রতি নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের সদস্যরা জাবিতে বিভিন্ন ধরনের অপতৎপরতা পরিচালনা করছে। ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা সংঘটিত হচ্ছে এবং বিভিন্ন ইস্যুতে ক্যাম্পাসকে অস্থিতিশীল করার অপচেষ্টা করছে। ক্যাম্পাসে নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠনের পোস্টারিং, ডেইরি গেটে এসে মানববন্ধনের মতো কর্মকাণ্ড পরিলক্ষিত হচ্ছে। আবার, গত সিন্ডিকেটে জুলাই হামলায় অভিযুক্ত ছাত্রলীগের কিছু সদস্যকে দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে যা অপ্রত্যাশিত ও অগ্রহণযোগ্য।

Advertisement

তিনি আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে ছাত্রলীগের কার্যক্রম রোধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি। ছাত্রলীগ ইস্যুতে যদি তারা কঠোর না হয়, তবে এই দেশবিরোধী সন্ত্রাসীরা যদি এরকম অপতৎপরতা চালিয়ে যেতে থাকি, তবে আমরা শিক্ষার্থীরা তাদের প্রতিহত করবো।

আরও পড়ুন সংঘর্ষের ঘটনায় জাবিতে তদন্ত কমিটি

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক একেএম রাশিদুল আলম বলেন, আমরা এ বিষয়ে সর্বদায় সজাগ এবং সতর্ক রয়েছি। যদি কেউ এ ধরনের ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছে বলে প্রমাণিত হয় তাহলে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা বিধি এবং রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবো। সকলকে এ বিষয়ে সচেতন থাকার আহ্বান করছি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসান বলেন, আমরা লক্ষ্য করেছি, ক্যাম্পাসের ক্রিয়াশীল সংগঠনের বাইরেও অনেকেই দেওয়াল লিখন, পোস্টারিং করে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে। আমাদের শিক্ষাক্রম যদি স্বাভাবিক চলার ক্ষেত্রে বিঘ্ন ঘটে, তাহলে অপরাধীকে চিহ্নিত করে সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে।

তিনি আরও বলেন, বিচারের ক্ষেত্রে আমরা কাউকে ছাড় দেইনি, আবার কারও ওপর জুলুম করিনি। তদন্ত কমিটির দেওয়া রিপোর্টের সাপেক্ষে বিচার হয়েছে। বিচারের বিষয়ে কারও যৌক্তিক প্রশ্ন থাকলে, সেটা সিন্ডিকেট চাইলে আমলে নিতে পারে এবং পুনর্বিবেচনা করতে পারে।

কেএইচকে/জেআইএম