জোকস

বিশ্বকাপ ফুটবলের উন্মাদনায় বদলে গেল গ্রামের নাম

সামছুল আলম শিমুল

Advertisement

গ্রামের নাম আক্কেলপুর। নাম শুনলেই মনে হয় এখানে সবাই জন্মগতভাবে জ্ঞানী, বিচক্ষণ এবং দূরদর্শী। কিন্তু বাস্তবতা একটু ভিন্ন। এলাকার মানুষজন বরং সহজ-সরল, একটু বোকা-সোকা টাইপের। গ্রামের নামটা নিয়েই ঝামেলা। আশপাশের গ্রামের লোকজন সুযোগ পেলেই নানা ছন্দে খোঁচা মারে।

হাটে-বাজারে, মেলায়, এমনকি বিয়ের দাওয়াতেও শুনতে হয়—

‘আক্কেলপুরের আক্কেল, কাজের বেলায় ফক্কেল!’ ‘আক্কেলপুরে জন্ম নিলে, মাথায় নাকি গোবর মিলে!’

Advertisement

এতদিন মানুষ চুপচাপ সহ্য করেছে। কিন্তু ফুটবল বিশ্বকাপ আসতেই যেন জমে থাকা ক্ষোভে আগুন ধরে গেল। চায়ের দোকান, বাজার, মসজিদের সামনে, এমনকি নাপিতের দোকানেও একটাই আলোচনা এই নাম আর রাখা যাবে না। অন্তত বিশ্বকাপ চলাকালীন কয়েকটা দিনের জন্য হলেও নামটা বদলাতে হবে। নামটা হতে হবে ফুটবল-সংশ্লিষ্ট, আধুনিক এবং একটু আন্তর্জাতিক ঘরানার।

আরও পড়ুন স্বামী আর্জেন্টিনা-স্ত্রী ব্রাজিল সাপোর্টার

সমস্যা একটাই গ্রামের অর্ধেক মানুষ ব্রাজিলের সমর্থক, আর বাকি অর্ধেক আর্জেন্টিনার। ব্রাজিল সমর্থকরা প্রস্তাব দিল, গ্রামের নাম হোক ‘নেইমারনগর’। কেউ বললো ‘সেলেসাওপুর’। একজন আবার একটু বাড়াবাড়ি করে ‘রিও ডি আক্কেলপুর’ নামও প্রস্তাব করল।

আর্জেন্টিনা সমর্থকরা পাল্টা বললো, ‘মেসিপুর’ ছাড়া কিছুই মানা হবে না। কেউ কেউ আবার ‘মারাদোনাবাদ’ নামও ছুঁড়ে দিল।

অবস্থা এমন দাঁড়াল যে, গ্রামের পরিবেশ ধীরে ধীরে অস্থিরতার দিকে যেতে লাগল। শেষমেশ সিদ্ধান্ত হলো, গ্রামের শেষ প্রান্তের বটতলার নিচে জরুরি বৈঠক বসবে।

Advertisement

সন্ধ্যা নামতেই বৈঠক শুরু হলো। এলাকার গণ্যমান্য লোকজন হাজির। প্রথমেই একজন বক্তা উঠে বললেন, আমাদের গ্রামের সবচেয়ে প্রবীণ ব্যক্তি হাজী কুদ্দুস মিয়া। বয়স প্রায় ৯৮। তিনি সারাজীবন ফুটবল ভালোবেসেছেন। তার সম্মানে গ্রামের নাম ফুটবল-সম্পর্কিত কিছু রাখা উচিত।

কথা শেষ হতেই অন্য পক্ষ প্রতিবাদে ফেটে পড়ল। একজন দাঁড়িয়ে বললো, এই যুক্তি মানলে তো সব সিদ্ধান্ত সিনিয়ররা নিত। কিন্তু যোগ্যতা আর পারফরম্যান্সই আসল বিষয়! বটতলা কয়েক সেকেন্ডের জন্য চুপ হয়ে গেল। তারপর সবাই মাথা নেড়ে বুঝে না বুঝে একধরনের সম্মতি দিল।

এরপর আরেকজন প্রস্তাব দিল, ভোটাভুটি করা যাক।

সঙ্গে সঙ্গে সাবেক মেম্বার আপত্তি জানালেনম, ভোট এত সহজ না। আগে প্রচারণা লাগবে, আচরণবিধি লাগবে, পর্যবেক্ষক লাগবে… এত অল্প সময়ে সম্ভব না!

সবাই সেটাও মেনে নিল। আর্জেন্টিনা পক্ষ বললো, পুরো গ্রামে তাদের সমর্থনে পতাকা বেশি ঝুলছে। ব্রাজিল পক্ষ সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল, পতাকা গুনে যদি নাম ঠিক করা হয়, তাহলে অনেক কিছুই উল্টে যাবে! এদেশের নাম তখন আর বাংলাদেশ থাকবে না। নেইল বাইটিং ফিনিশিংয়ে হয় ব্রাজিল হবে, নয় আর্জেন্টিনা হবে।

আরও পড়ুন আজকের জোকস: পুরুষের যে কষ্ট কখনো যাবে না

তর্ক-বিতর্কে সময় গড়িয়ে সন্ধ্যা থেকে রাত হয়ে গেল। চা শেষ, বিস্কুট শেষ, ধৈর্যও শেষ কিন্তু সিদ্ধান্ত আর আসে না।শেষমেশ গ্রামের এক নিরপেক্ষ মানুষ, যিনি ফুটবল বোঝেন কম, কিন্তু ঝামেলা বোঝেন বেশি, তিনি একটা প্রস্তাব দিলেন, দুই দলের মধ্যে একটা ফুটবল ম্যাচ হোক। যারা জিতবে, তাদের পছন্দের নামেই গ্রামের নাম হবে।

প্রস্তাব সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হলো। পরদিন বিশাল আয়োজন। দর্শক, ব্যানার, বাঁশি, ধারাভাষ্য সব প্রস্তুত। খেলা শুরু হলো।নির্ধারিত নব্বই মিনিট শেষে স্কোর ২-২। অতিরিক্ত সময়েও একই ফল। তারপর টাইব্রেকার। প্রথম পাঁচ শট শেষে আবার সমতা। আরও পাঁচ শট তবুও সমান। এরপর গোলকিপাররা শট নিল, কোচরা নিল, এমনকি লাইন্সম্যানদের নামানোর কথাও উঠল তবুও কোনো ফল নেই।

রাত বাড়তে লাগল।

খেলোয়াড় ক্লান্ত, দর্শক ক্লান্ত, রেফারি ক্লান্ত এমনকি বলটাও যেন অবসরে যেতে চাইছিল। শেষে সবাই আবার বটতলায় ফিরে এলো। একজন জিজ্ঞেস করলো, তাহলে এখন কী হবে?

দীর্ঘ নীরবতা নেমে এলো।

ঠিক তখন পাশের গ্রামের এক দর্শক, যে এতক্ষণ চুপচাপ সব দেখছিল, উঠে দাঁড়াল। এরপর বললো, তিন দিন ধরে আপনারা নাম বদলানোর জন্য সভা করলেন। ভোট ভাবলেন, পতাকা গুনলেন, ম্যাচ খেললেন কিন্তু কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারলেন না।

সে একটু থেমে চারপাশে তাকাল। এত কিছুর পরও যদি এই গ্রামের নাম আক্কেলপুর থাকে, তাহলে ‘আক্কেল" শব্দটাই অভিধান থেকে বাদ দিতে হয়।

বটতলায় আবার নীরবতা নেমে এলো।

লোকটা শেষে বললো, আমার মতে, বিশ্বকাপ শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই গ্রামের নাম হওয়া উচিত… বেআক্কেলপুর। সেদিন আশ্চর্যজনকভাবে কেউ আর কিছু বলল না। না ব্রাজিল সমর্থকরা, না আর্জেন্টিনা সমর্থকরা। প্রিয় পাঠক, আপনিও অংশ নিতে পারেন আমাদের এ আয়োজনে। আপনার মজার (রম্য) গল্পটি পাঠিয়ে দিন jagofeature@gmail.com ঠিকানায়। লেখা মনোনীত হলেই যে কোনো শুক্রবার প্রকাশিত হবে।

কেএসকে