প্রথম বিস্ময়কর দৃশ্য দেখা গেল, নতুন বলে ইনিংসের দ্বিতীয় ওভারেই আক্রমণে আব্দুল গাফফার সাকলায়েন। মাত্র দ্বিতীয় টি-টোয়েন্টি খেলতে নামা সাকলায়েনের বোলিংয়ে মূল অস্ত্র স্লোয়ার কাটার। সেখানে তার হাতেই তুলে দেওয়া হলো নতুন বল!
Advertisement
এরপর প্রায় দুইশো ছোঁয়া লক্ষ্য তাড়ায় ওপেনাররা বেশ উড়ন্ত শুরুই এনে দেন। টপ মিডল অর্ডারও সেটা টেনে নিয়ে গেছে। তবে এরপর আচমকা যেন বাংলাদেশের ব্যাটারদের মনে হলো, ম্যাচ জেতা নিশ্চিত হয়ে গেছে! নিজেরা খোলসের ভিতর ঢুকলেন, আর তাতে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ খেসারত দিল ম্যাচ ও সিরিজ হেরে।
শুক্রবার চট্টগ্রামে সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচে ৭ রানে হেরেছে বাংলাদেশ। টস জিতে আগে ব্যাটিং করে ১৯৬ রান করে অস্ট্রেলিয়া। জবাবে ৬ উইকেট হারিয়ে ১৮৯ রানে থামে বাংলাদেশের ইনিংস। এই হারে টি-টোয়েন্টি সিরিজ এক ম্যাচ হাতে রেখেই জিতে নিয়েছে অস্ট্রেলিয়া।
টস হেরে এদিন আগে বোলিং করতে নামে বাংলাদেশ। নাসুম আহমেদকে দিয়ে শুরু করা বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক তাওহীদ হৃদয় দ্বিতীয় ওভারে বল তুলে দেন সাকলায়েনকে। অথচ তার হাতে নাহিদ রানা ও মোস্তাফিজুর ছিল। মোস্তাফিজকে নিয়ে পরে বোলিং করানোর পরিকল্পনা থাকলেও নাহিদ রানাকে শুরুতেই আক্রমণে আনা একদম প্রত্যাশিতই ছিল।
Advertisement
পুরো ওয়ানডে সিরিজে নাহিদ রানার বিপক্ষে ভুগেছেন অজি ব্যাটাররা। সিরিজে টিকে থাকার লড়াইয়ে শুরুতেই নাহিদ রানার গতি দিয়ে অসিদের চাপে ফেলার সুযোগ ছিল স্বাগতিকদের সামনে। কিন্তু হৃদয় শুরুতেই রক্ষণাত্মক কৌশল বেছে নিলেন।
ব্যাটিংয়ে মিচেল মার্শ, লেগ সাইডে বাউন্ডারি তুলনামূলক ছোট। ব্যাটাররা ছোট পাশটাই আক্রমণের জন্য বেছে নেন সবসময়। অথচ মাত্র দ্বিতীয় টি-টোয়েন্টি খেলতে নামা সাকলায়েনকে ওই ছোট পাশ লেগ সাইডে থাকা অবস্থাতেই বোলিংয়ে আনেন হৃদয়। তাতে যা হওয়ার তাই হলো, ২ ওভারে ৩৪ রান দিলেন তিনি। প্রথম ২ ওভারে ২৭ রান করা অস্ট্রেলিয়াকে পাওয়ার প্লেতেই বেশ চেপে ধরেছিল বাংলাদেশ, তুলে নিয়েছিল ৩ উইকেট। তবে এরপর টিম ডেভিড ও ম্যাট রেনশ মিলে সেই চাপ দূরে ঠেলে তাণ্ডব চালান বাংলাদেশের বোলারদের ওপর। দুজনে মিলে গড়েন ৯৭ রানের জুটি। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের সামনে লক্ষ্য দাঁড়ায় ১৯৭ রান।
এত বড় লক্ষ্য তাড়ায় শুরুটা যেমন দরকার তেমন পেয়েছিল বাংলাদেশ। প্রথম ৬ ওভারে ১ উইকেট হারিয়ে স্কোরবোর্ডে ৭২ রান। একমাত্র আউট হওয়া তানজিদ তামিম করলেন ১৫ বলে ৩০ রান। আর ১ উইকেট হারিয়ে পরের ১০ ওভারে সংগ্রহ দাঁড়ালো ১০৩ রান। শেষ ১০ ওভারে প্রয়োজন ৯৪ রান। এখনকার টি-টোয়েন্টিতে এটা তাড়া করা খুব একটা কঠিন না।
ঝামেলাটা শুরু হয় ৩ বলের ব্যবধানে ইমন আর সাইফ ফিরে যাওয়ায়। ইমন ২২ বলে ৩৬ আর সাইফ করলেন ৩৩ বলে ৪২ রান। সাইফের আউট দেখলে অবশ্য বিস্ময়কর লাগার কথা। অফ স্টাম্পের বাইরের বল জায়গায় দাঁড়িয়ে মারতে চেয়েছিলেন তিনি। ক্রিকেটীয় ব্যাকরণ অনুযায়ী এতে সাফল্য আসার কথা নয়! সাইফও পারলেন না, অদ্ভুতভাবে বল তুলে দিলেন আকাশে!
Advertisement
অথচ ওই সময়ে সেট ব্যাটার হিসেবে সাইফের উইকেটে টিকে থাকার দরকার ছিল। ম্যাচ শেষে ইমনের কণ্ঠেও একই বার্তা, ‘(সাইফ) লম্বা খেললে আমাদের জন্য ভালো হতো। কিন্তু আমরা তো মানুষ, তাই মাঝে মাঝে ভুল হয়ে যায়। আমি আশা করি যে উনি হয়তোবা নেক্সট ইনিংসে এখান থেকে বেরিয়ে আসবে।’
এসব সময়ে লিটন কুমার দাস ঠিকই ইনিংস টেনে নিয়ে যান শেষ পর্যন্ত। চোটের কারণে না খেলা অধিনায়ককে তাই মিস করেছেন ইমন, ‘দাদা তো ওই ভূমিকাটা খুব ভালোভাবে পালন করে। তাই অবশ্যই আমরা ওনাকে খুব মিস করছি।’
সাইফ আর ইমনের ৫৩ রানের জুটি ভাঙার পর ব্যাটাররা বিস্ময়করভাবে খোলসে ঢুকে যান। হৃদয় যখন ব্যাটিংয়ে নামেন বাংলাদেশের প্রয়োজন ৪৩ বলে ৬৬ রান, হাতে ৭ উইকেট। সেই হৃদয় প্রথম ১৬ বল ফেস করে করলেন ১৬ রান! ৪৩ বলে ৬৬ রান থেকে শেষ দুই ওভারে বাংলাদেশের সমীকরণ দাঁড়ায় ৩৪ রানের।
অর্থাৎ মাঝের ৩১ বলে বাংলাদেশের স্কোরবোর্ডে জমা হয় মাত্র ২২ রান। এর মধ্যে অবশ্য শামীম পাটোয়ারি আজ ব্যর্থ হয়েছেন। কিন্তু একটা দল যখন লক্ষ্য তাড়ায় এত ভালো শুরু পায়, তখন অধিনায়কের থাকতে হয় ইতিবাচক! কিন্তু হৃদয় আজ কী ভাবলেন, আর কী করলেন? প্রথম ১৬ বলে ১৭-এর জায়গায় ২৫ থেকে ৩০ রান করলেও বাংলাদেশকে শেষদিকে এত চাপে পড়তে হতো না।
অন্যদিকে সাকলায়েন। ১২ বলে ৩৪ রান লাগা অবস্থায় ১৯তম ওভারের প্রথম ৫ বলে করলেন ৫ রান! অথচ অন্যপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছেন হৃদয়। তখন হৃদয়কেও খুব একটা সাকলায়েনের সঙ্গে কথা বলতে দেখা যায়নি। সাকলায়েনও শুধু হিট করে গেছেন, কিন্তু তাতে দলেরই ক্ষতি হয়েছে।
মাত্র দ্বিতীয় ম্যাচ হিসেবে হয়তো সাকলায়েনকে অনেকে বেনিফিট অব ডাউট দিতে পারেন। তবে তিনি যে রান করতে পারেননি, এটার চেয়ে বড় সমস্যা হলো গেম সেন্স! তিনি যেহেতু পারছেন না, সিঙ্গেল নিয়ে অধিনায়কের কাঁধেই দায়িত্ব ছেড়ে দিলেই হতো! ১১ বলে ১৩ রান করেছেন সাকলায়েন, ওই পরিস্থিতিতে যেটা রীতিমতো অন্যায়।
হৃদয় অবশ্য শেষদিকে কাভার করার চেষ্টা করেছেন। ১৯তম ওভারের শেষ বলে ছক্কা হাঁকানোর পর শেষ ওভারে আরও ২ ছক্কা ও ১ চার মেরেছেন। কিন্তু সর্বনাশটা তো আগেই করে রেখেছেন। স্কোরবোর্ড দেখলে ২২ বলে ৩৬ রানকে খুব ভালোই মনে হবে। কিন্তু খেলাটা সরাসরি দেখলে বা আরেকটু গভীরে গেলে দেখা যাবে হৃদয় শুরুতেই ডিফেন্সিভ মনোভাবে খেলেছেন। শেষ পর্যন্ত সেটাই আসলে বাংলাদেশের ক্ষতি করেছে। অথচ ওপেনার ও টপ মিডল অর্ডারদের এমন শুরুর পর যে কোনো দলের অধিনায়কের নামার কথা আকাশসমান আত্মবিশ্বাস নিয়ে! অথচ হৃদয়ের ক্ষেত্রে দেখা গেল উল্টো দৃশ্য।
অস্ট্রেলিয়ার মতো দলের বিপক্ষে যে কোনো ফরম্যাটে জয় সবসময় অর্জন। সেক্ষেত্রে টি-টোয়েন্টিতে ১৯৬ রানের লক্ষ্য তাড়া করে জয়ের দুর্দান্ত একটা সুযোগ ছিল বাংলাদেশের সামনে। অধিনায়ক আর সাকলায়েনের অপরিপক্ব পরিকল্পনা আর আত্মবিশ্বাসের অভাবে সেই সুযোগ হাতছাড়া হলো।
এই বিশ্বকাপের (ফুটবল) ডামাডোলে চট্টগ্রামের সাগরিকায় গ্যালারির বেশিরভাগ জায়গায় ছিল দর্শকে ঠাসা! তাদের জন্যও বাংলাদেশের এই হারটা খুব একটা ভালো কিছু হলো না। যদিও আগের সময়ের সঙ্গে তুলনা করলে উন্নতি অবশ্যই হয়েছে। তবে ওয়ানডে সিরিজের মাঝে মোস্তাফিজুর রহমান ড্রেসিংরুমে বলছিলেন, আমাদের সেরা হতে গেলে সবখানেই উন্নতি করতে হবে। ঠিক তাই, উন্নতির শেষ নেই, তাই এসব জায়গা নিয়েই কাজ করতে হবে।
আমেরিকা, কানাডা ও মেক্সিকোতে চলছে ফুটবল বিশ্বকাপ। সেই বিশ্বকাপের ডামাডোলে ক্রিকেট মাঠে দর্শক সমাগম কেমন হবে- এ নিয়ে ছিল নানা আলোচনা। কিন্তু চট্টগ্রামের দর্শক সেই শঙ্কাকে উড়িয়ে দেয়। প্রথম টি-টোয়েন্টি তো বটেই, দ্বিতীয় ম্যাচেও শহীদ বীরশ্রেষ্ঠ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান ক্রিকেট স্টেডিয়ামে ছিল দর্শকদের উপচে পড়া ভিড়।
এই দর্শকঠাসা গ্যালারির সামনে অস্ট্রেলিয়াকে হারানোর দারুণ সুযোগ তৈরি করেছিল বাংলাদেশ। শুরু থেকে মিডল ওভার পর্যন্ত দাপট দেখিয়েছেন স্বাগতিক ব্যাটাররা। এক পর্যায়ে মনে হচ্ছিল, জয়ের আনুষ্ঠানিকতা শুধু সময়ের অপেক্ষা। কিন্তু দ্রুত উইকেট পতনে বদলে যায় ম্যাচের চিত্র, শেষ পর্যন্ত হার নিয়েই মাঠ ছাড়তে হয় টাইগারদের।
এসকেডি/আইএইচএস/