বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের জন্য বিপুল পরিমাণ কৃষিজমি অধিগ্রহণের উদ্যোগ নিয়ে কৃষকদের চরম অসন্তোষ ও বিক্ষোভের মুখে পড়েছেন পশ্চিমবঙ্গের নবনির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। এরই মধ্যে মুর্শিদাবাদ জেলার সীমান্ত এলাকা থেকে এরই মধ্যে ১৪২ দশমিক ৭৯ একর জমি ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
Advertisement
বিষয়টি নিয়ে জেলাপ্রশাসকের কাছে ডেপুটেশন অর্থাৎ প্রতিবাদলিপি জমা দিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রোটেকশন অব ডেমোক্রেটিক রাইটস (এপিডিআর)। প্রতিবাদলিপিতে ‘বেআইনিভাবে’ জমি অধিগ্রহণের পাশাপাশি মানুষকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানো ও হোল্ডিং সেন্টার (আটককেন্দ্র) নির্মাণেরও বিরোধিতা করা হয়েছে।
এপিডিআর হলো হলো ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের অন্যতম প্রাচীন ও সক্রিয় একটি মানবাধিকার সংগঠন। ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সংগঠনটি মূলত নাগরিক স্বাধীনতা, বাক-স্বাধীনতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার জন্য পরিচিত।
এপিডিআরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৩ জুন এপিডিআর মুর্শিদাবাদ জেলা কমিটির সদস্যরা ডোমকল ব্লকের ঘোষপাড়া সর্বপল্লী ভুতগাড়ির মাঠ পর্যবেক্ষণ করেন। এই মাঠে প্রায় দেড় হাজার বিঘা তিন ফসলি জমি রয়েছে। এই জমির ওপর নির্ভরশীল দক্ষিণ ঘোষপাড়া, সর্বপল্লী, ফরাজীপাড়া, মুরাদপুর এবং উত্তর ঘোষপাড়া- এই পাঁচ গ্রামের অন্তত ৬০০ পরিবার। এসব জমিতে পাট, গম, কলাই, মশুরি, রসুন, পেঁয়াজ ও বিভিন্ন সবজির চাষ হয়।
Advertisement
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলেছেন এপিডিআরের জেলা কমিটির ৯ সদস্য। কৃষকরা তাদের জানিয়েছেন, প্রত্যেকের জমির পরিমাণ মোটেই বেশি নয়। পরিবারপিছু কৃষকদের এক-দেড় কিংবা দুই বিঘা জমি রয়েছে। অর্থাৎ তারা ক্ষুদ্র কৃষক।
বাপ-ঠাকুরদার আমল থেকে এখানকার কৃষকরা এই জমিতে চাষ করছেন। জলঙ্গি নদীর ব্যাপক ভাঙনে অনেক উর্বর জমি তলিয়ে গেছে। ফলে এই জমির ওপর এলাকার কৃষকদের বেঁচে থাকা নির্ভর করছে। মাঠে যেসব কৃষি জমি আছে, তা সবই সরকারি খাতায় নথিভুক্ত। জমিও যথেষ্টই উর্বর।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এই জমি চলে গেলে প্রায় তিন হাজার মানুষ পথে বসবে। এই জমি তারা কিছুতেই বিক্রি করবে না। কৃষকরা মনে করছেন, ক্ষতিপূরণের উদ্দেশ্যে দেওয়া অর্থ জমির তুলনায় কিছুই নয়। জমি বছরের পর বছর ধরে তাদের পরিবারে খাবার জোগাচ্ছে। অন্যদিকে, ক্ষতিপূরণের ‘সামান্য’ টাকা কিছু দিনের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে।
এপিডিআরের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, গত ৩১ মে মুর্শিদাবাদের সীমান্তবর্তী ডোমকল মহকুমার এই অঞ্চলে ‘বিএসএফ লাল পতাকার সীমানা লাগিয়ে অধিগ্রহণ করতে গেলে কৃষকরা বিক্ষোভ শুরু করেন। ভুতগাড়ির মাঠসংলগ্ন সড়কে বিপুলসংখ্যক কৃষক অবরোধ শুরু করলে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। জলঙ্গি থানার পুলিশ ও বিএসএফ একসঙ্গে সেই জমায়েত ছত্রভঙ্গ করতে এলে কৃষকদের সঙ্গে বাগবিতণ্ডা বেঁধে যায়।
Advertisement
এপিডিআরের প্রতিবেদনে বলা হয়, শেষ পর্যন্ত এলাকার পুলিশ প্রশাসন কৃষকদের চাষের জমি দখল না করার মৌখিক আশ্বাস দিলে কৃষকরা সড়ক ছেড়ে যান।
এ বিষয়ে রাহুল চক্রবর্তী বলেন, কৃষকের অনুমতি ছাড়া জমি নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। রেকর্ডভুক্ত জমি এভাবে অধিগ্রহণ করা যায় না। তার মতে, এটি সম্পূর্ণভাবে পশ্চিমবঙ্গের ২০১৩ সালের জমি অধিগ্রহণ আইনের পরিপন্থি। জেলা প্রশাসককে বলা হয়েছে যে ভুতগাড়ির মাঠের প্রায় দেড় হাজার বিঘা জমি যেন কোনোভাবেই বিএসএফের দখলে না যায়।
রাহুল চক্রবর্তী অভিযোগ করেন, এই জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে কেউ যাতে মুখ খুলতে না পারে, সেজন্য একই সঙ্গে দুটি বড় নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে।
রাহুল চক্রবর্তীর বক্তব্য অনুযায়ী, কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের জন্য জলঙ্গি এলাকায় ২৪ একর ও পুরো মুর্শিদাবাদ জেলায় ৭৫ একর জমি বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। এই বেড়া নির্মাণ কেন্দ্র করে কৃষকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। আবার এই বিষয়ে কেউ যাতে মুখ খুলতে না পারে, সেজন্য একই সঙ্গে দুটি বড় নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে।
তিনি আরও দাবি করেন, হোল্ডিং সেন্টারে রাখা হচ্ছে, তাদের পরিচয় সংবাদমাধ্যম বা মানবাধিকার কর্মীদের কাউকেই জানানো হচ্ছে না। এপিডিআরের দাবি, অবিলম্বে এসব হোল্ডিং সেন্টার বন্ধ করার পাশাপাশি, সেখানে যাদের রাখা হয়েছে তাদের পরিচয় জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। সেই সঙ্গে আটকে রাখা মানুষগুলোর সঙ্গে মানবাধিকার কর্মী ও সংবাদমাধ্যমকে সাক্ষাতের সুযোগ দিতে হবে।
রাহুল চক্রবর্তী বলেন, বর্তমানে যে প্রক্রিয়ায় মানুষকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানো হচ্ছে তা সম্পূর্ণ বেআইনি, অসাংবিধানিক, মানবতাবিরোধী ও আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থি। তার মতে, এভাবে কাউকে সীমান্ত পার করানো গ্রহণযোগ্য নয়।
তিনি আরও বলেন, কোনো ব্যক্তিকে বিদেশি সন্দেহ করা হলে, তাকে আগে আদালতে হাজির করতে হবে। আদালত যদি তাকে বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে চিহ্নিত করেন ও বাংলাদেশে পাঠানোর নির্দেশ দেন, তাহলে কেন্দ্রীয় বা রাজ্য সরকার বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করবে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির প্রকৃত ঠিকানা ও পরিচয় যাচাই করে নিশ্চিত হওয়ার পরই তাকে বাংলাদেশে পাঠানো যেতে পারে।
ডিডি/এসএএইচ