কোনো পারিবারিক অনুষ্ঠান, অফিস পার্টি কিংবা বন্ধুদের আড্ডায় এমন দৃশ্য প্রায়ই দেখা যায়যে, সবাই খাওয়া শেষ করলেও প্লেটে একটি কেকের টুকরো বা খাবারের শেষ অংশ পড়ে থাকে। সেখানে উপস্থিত অনেকেই সেটি খেতে চান, কিন্তু কেউ হাত বাড়ান না। যেন একটি সাধারণ কেকের টুকরো হঠাৎ করেই সামাজিক সংকোচ, দ্বিধা আর নীরব প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে পরিণত হয়।
Advertisement
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, এই আচরণের পেছনে কাজ করে মানুষের সামাজিক মানসিকতা, আত্ম-উপস্থাপনের প্রবণতা এবং অন্যের দৃষ্টিতে নিজেকে গ্রহণযোগ্য রাখার ইচ্ছা।
ভালো ভাবমূর্তি ধরে রাখার চেষ্টাখ্যাতনামা সমাজবিজ্ঞানী ও মনস্তাত্ত্বিক চিন্তাবিদ এরভিং গফম্যানের ইম্প্রেশন ম্যানেজমেন্ট থিওরি অনুযায়ী, মানুষ সবসময় অন্যদের সামনে নিজের একটি ইতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরতে চায়। আমরা চাই না কেউ আমাদের লোভী, স্বার্থপর বা অতিরিক্ত খাবারপ্রিয় হিসেবে দেখুক।
এই কারণেই শেষ কেকের টুকরোটি নিতে গিয়ে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে যে, অন্যরা কী ভাববে? কিংবা লোকজন কি মনে করবে আমি খুব লোভী? এই সামাজিক মূল্যায়নের আশঙ্কাই মানুষকে অনেক সময় নিজের ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও পিছিয়ে যেতে বাধ্য করে।
Advertisement
মজার বিষয় হলো, প্রথমে প্লেটে থাকা কেকের টুকরোগুলোর তুলনায় শেষ টুকরোটির প্রতি মানুষের আগ্রহ অনেক বেশি হতে পারে। মনোবিজ্ঞানে একে বলা হয় ‘স্কার্সিটি থিওরি’ বা দুষ্প্রাপ্যতার প্রভাব। মানুষের মস্তিষ্ক স্বাভাবিকভাবেই সীমিত বা বিরল জিনিসকে বেশি মূল্য দেয়। যখন কোনো খাবার বা বস্তু সংখ্যায় একটিতে নেমে আসে, তখন সেটির প্রতি আকর্ষণ হঠাৎ বেড়ে যায়।
তাই অনেক সময় দেখা যায়, কেউ হয়তো শুরুতে কেক খেতে আগ্রহী ছিলেন না, কিন্তু যখন মাত্র একটি টুকরো পড়ে থাকে, তখন সেটি হঠাৎ করেই অনেক বেশি আকর্ষণীয় মনে হয়।
অনেকেই মনে করেন, শেষ টুকরোটি যিনি তুলে নেন তিনি হয়তো একটু বেশি লোভী বা নিজের কথা বেশি ভাবেন। তবে মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা অনায়াসে শেষ টুকরোটি নিয়ে নেন, তারা সাধারণত ‘সেলফ-অ্যাসিওর্ড ডিসিশন মেকিং বা আত্মবিশ্বাসী সিদ্ধান্ত গ্রহণে অভ্যস্ত।
তারা পরিস্থিতিকে অতিরিক্ত বিশ্লেষণ না করে বাস্তব দিকটি বিবেচনা করেন। তাদের চিন্তাভাবনা অনেকটা এমন যে-কেউ খাচ্ছে না, খাবার নষ্ট হওয়ারও প্রয়োজন নেই, তাই আমি খেয়ে ফেলছি। এটি অনেক সময় আত্মবিশ্বাস এবং বাস্তবমুখী চিন্তার পরিচয়, স্বার্থপরতার নয়।
Advertisement
অনেক সময় একটি খাবার টেবিলে দীর্ঘক্ষণ পড়ে থাকে, কারণ সবাই মনে মনে অপেক্ষা করেন অন্য কেউ আগে নিক। সামাজিক মনোবিজ্ঞানে এই ঘটনাকে বলা হয় ডিফিউশন অব রেসপন্সিবিলিটি বা দায়িত্বের বিভাজন। যখন একটি পরিস্থিতিতে অনেক মানুষ উপস্থিত থাকেন, তখন প্রত্যেকে মনে করেন অন্য কেউ উদ্যোগ নেবে। ফলে সবাই অপেক্ষা করতে থাকেন, কিন্তু বাস্তবে কেউই এগিয়ে আসেন না। শেষ পর্যন্ত একজন ব্যক্তি নীরবতা ভেঙে খাবারটি তুলে নেন।
দ্বন্দ্ব এড়ানোর মানসিকতাও কাজ করেমনস্তত্ত্ববিদদের মতে, শেষ টুকরোটি না নেওয়ার প্রবণতা অনেক সময় কনফ্লিক্ট অ্যাভয়ডেন্স বিহেভিয়ার বা দ্বন্দ্ব এড়িয়ে চলার মানসিকতার সঙ্গে সম্পর্কিত।
শৈশব থেকে যারা অন্যদের খুশি রাখার পরিবেশে বড় হন বা সবসময় মানিয়ে চলতে শেখেন, তারা নিজের চাহিদাকে সহজেই গৌণ করে ফেলেন। তারা মনে করেন, নিজের ইচ্ছার চেয়ে দলের স্বস্তি ও সামাজিক ভারসাম্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ফলে শেষ কেকের টুকরোটি খেতে ইচ্ছা হলেও তারা সেটি অন্য কারও জন্য ছেড়ে দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
সামাজিক মূল্যায়নের ভয়বর্তমান ডিজিটাল যুগে মানুষের মধ্যে সোশাল ইভালুয়েশন অ্যানজাইটি বা সামাজিক মূল্যায়নের উদ্বেগ আগের তুলনায় অনেক বেশি দেখা যায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবে মানুষ প্রায়ই ভাবেন, অন্যরা তাদের আচরণকে কীভাবে দেখছে। এর ফলে খুব ছোট ঘটনাও বড় মানসিক দ্বিধার কারণ হয়ে উঠতে পারে। একটি কেকের শেষ টুকরো নেওয়ার মতো সাধারণ ঘটনাও তখন নেতিবাচক বিচার পাওয়ার আশঙ্কা তৈরি করে।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, শেষ কেকের টুকরোটি খাওয়া বা না খাওয়ার মাধ্যমে কারো ব্যক্তিত্ব, ভদ্রতা বা নৈতিকতা বিচার করা যায় না। এটি মূলত সামাজিক প্রত্যাশা, ব্যক্তিগত ইচ্ছা এবং আত্মবিশ্বাসের মধ্যে চলা একটি সূক্ষ্ম মানসিক প্রক্রিয়া।
আরও পড়ুন নারীরা কখন সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন থাকেন?টেবিলের মাঝখানে পড়ে থাকা কেকের টুকরোটি কোনো মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষার বিষয় নয়। সেটি তৈরি হয়েছিল উপভোগ করার জন্য। তাই যদি সবাই খাওয়া শেষ করে ফেলেন এবং আপনার খেতে ইচ্ছা হয়, তাহলে হয়তো সেটি খেয়ে ফেলাই সবচেয়ে সহজ এবং বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত।
সূত্র: দ্য ইকোনমিক টাইমস, মিডিয়াম ও অন্যান্য
এসএকেওয়াই