অনেকেই গান শোনা ছাড়া নিজেদের কল্পনাই করতে পারেন না। কাজের সময় হোক বা বিশ্রামের মুহূর্ততে গান যেন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেছে। কারো জন্য এটি সকাল শুরু করার শক্তি, আবার কারো জন্য দিনের ক্লান্তি দূর করার ওষুধ। সংগীত শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়, এটি মানুষের মস্তিষ্ক, অনুভূতি এবং মানসিক অবস্থার ওপর গভীর প্রভাব ফেলে।
Advertisement
তাই সংগীত দিবসকে শুধু গান শোনার দিন হিসেবে নয়, বরং মানব মনের সঙ্গে সংগীতের সম্পর্ক বোঝার একটি বিশেষ উপলক্ষ হিসেবেও দেখা যায়। বিশ্বজুড়ে সংগীতকে ঘিরে উদ্যাপন, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা প্রকাশের জন্য নির্ধারিত এই দিনটি হলো বিশ্ব সংগীত দিবস, যা পালিত হয় ২১ জুন।
সংগীত ও মস্তিষ্কের গভীর সম্পর্কবিজ্ঞানীদের মতে, গান শোনার সময় আমাদের মস্তিষ্কের রিওয়ার্ড সিস্টেম সক্রিয় হয়ে ওঠে। এই সিস্টেম থেকে ডোপামিন নামের একটি গুরুত্বপূর্ণ হরমোন নিঃসৃত হয়, যা আনন্দ, উৎসাহ এবং সুখ অনুভূতির সঙ্গে সম্পর্কিত। যখন আমরা প্রিয় গান শুনি, তখন ডোপামিনের মাত্রা বেড়ে যায়, ফলে মন ভালো হয়ে যায় এবং মানসিক চাপ কমে আসে।
ডোপামিন মানুষের আবেগ, অনুপ্রেরণা এবং আনন্দ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সংগীত এই হরমোনের একটি প্রাকৃতিক উদ্দীপক হিসেবে কাজ করে, যা আমাদের মনকে মুহূর্তেই পরিবর্তন করতে পারে।
Advertisement
গবেষণায় দেখা গেছে, সংগীত আমাদের মস্তিষ্কের তরঙ্গ বা ব্রেন ওয়েভের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। ধীর, শান্ত এবং সুরেলা সংগীত আলফা তরঙ্গ সক্রিয় করে, যা মানসিক প্রশান্তি, রিল্যাক্সেশন এবং গভীর শান্তির অনুভূতির সঙ্গে যুক্ত। অন্যদিকে দ্রুত তালযুক্ত ও উচ্চমাত্রার সংগীত বিটা তরঙ্গ বাড়ায়, যা মনোযোগ, সতর্কতা এবং এনার্জি বৃদ্ধি করে। ব্রেন ওয়েভ পরিবর্তনের মাধ্যমে আমাদের মেজাজ পরিবর্তিত হয়। তাই একই ব্যক্তি এক ধরনের গান শুনে শান্ত অনুভব করতে পারেন, আবার অন্য ধরনের গান শুনে উদ্যমী হয়ে উঠতে পারেন।
স্মৃতি ও আবেগের অদৃশ্য সংযোগগান শুধু মেজাজ নয়, আমাদের স্মৃতির সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। একটি নির্দিষ্ট গান অনেক সময় আমাদের অতীতের কোনো ঘটনা, সম্পর্ক বা অনুভূতির দরজা খুলে দেয়। এটি ঘটে কারণ সংগীত মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাস অংশকে সক্রিয় করে, যা স্মৃতি সংরক্ষণ এবং পুনরুদ্ধারের জন্য দায়ী। এই কারণেই একই গান কারও জন্য আনন্দের স্মৃতি ফিরিয়ে আনে, আবার কারও জন্য বিষণ্নতার অনুভূতি জাগাতে পারে। সংগীত তাই শুধু শোনা নয়, বরং অনুভব করার একটি অভিজ্ঞতা।
স্ট্রেস কমাতে সংগীতের ভূমিকাবিশেষজ্ঞদের মতে, সংগীত মানসিক চাপ কমানোর একটি অত্যন্ত কার্যকর উপায়। ধীর গতির, নরম সুরের গান শোনার ফলে শরীরে কর্টিসল নামক স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা কমে যায়। এর ফলে মন শান্ত হয় এবং শরীরও স্বাভাবিকভাবে রিল্যাক্স অনুভব করে।
কর্টিসল হলো শরীরের স্ট্রেস নিয়ন্ত্রণকারী একটি হরমোন। এর মাত্রা কমানো মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংগীত এখানে একটি প্রাকৃতিক থেরাপি হিসেবে কাজ করে, যাকে অনেক সময় মিউজিক থেরাপি বলা হয়।
Advertisement
সংগীত শুধু আবেগ বা বিনোদন নয়, এটি আমাদের দৈনন্দিন জীবনকেও প্রভাবিত করে। সকালে দ্রুত তালযুক্ত গান এনার্জি বাড়াতে সাহায্য করে, কাজের সময় ইনস্ট্রুমেন্টাল বা লোফাই মিউজিক মনোযোগ ধরে রাখতে সহায়তা করে, আর রাতে ধীর সুরের গান ঘুমের প্রস্তুতি তৈরি করে। এইভাবে সংগীত আমাদের শরীরের অভ্যন্তরীণ ঘড়ির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলে এবং আমাদের জীবনযাত্রাকে আরও ভারসাম্যপূর্ণ করে তোলে।
আরও পড়ুন মন খারাপের দিনে কেন চায়ের কথাই আগে মনে পড়ে? বিশ্ব সংগীত দিবসের তাৎপর্যবিশ্ব সংগীত দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, গান শুধু বিনোদন নয় বরং একটি থেরাপি, একটি অনুভূতি এবং একটি জীবনধারা। প্রযুক্তি, ব্যস্ততা এবং চাপের এই যুগে সংগীত আমাদের মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
মানুষের আবেগ, সম্পর্ক, স্মৃতি এবং মানসিক স্বাস্থ্য সবকিছুর সঙ্গেই সংগীত গভীরভাবে যুক্ত। তাই এই দিনটি শুধু উদ্যাপনের নয়, বরং সংগীতকে নতুনভাবে অনুভব করার একটি সুযোগ।
গান শোনা আমাদের মুড পরিবর্তনের সবচেয়ে সহজ, প্রাকৃতিক এবং শক্তিশালী উপায়গুলোর একটি। এটি কখনো আমাদের আনন্দ বাড়ায়, কখনো দুঃখ কমায়, আবার কখনো পুরোনো স্মৃতির দরজা খুলে দেয়। তাই বিশ্ব সংগীত দিবসে শুধু গান শোনা নয়, বরং সংগীতকে জীবনের অংশ হিসেবে অনুভব করাই সবচেয়ে বড় উদযাপন।
সূত্র: হেলথলাইন, মেডিকেল নিউজ টুডে
এসএকেওয়াই