ফেসবুক পোস্ট, জুম মিটিং, এক্সে বিবৃতি আর অলিগলিতে ‘জয় বাংলা’ ও ‘শেখ হাসিনার ভয় নাই রাজপথ ছাড়ি নাই’ এমন স্লোগান দিয়ে কয়েক সেকেন্ডের ঝটিকা মিছিল—এতেই নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করেছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের তৃণমূল। কিন্তু দলটির ভেতরে এখন ক্রমেই একটি উপলব্ধি স্পষ্ট হচ্ছে, শুধু অনলাইনে উপস্থিতি দেখিয়ে রাজনৈতিক দল হিসেবে টিকে থাকা সম্ভব নয়।
Advertisement
২৩ জুন দলের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সামনে রেখে সেই বাস্তবতারই মুখোমুখি হয়েছে আওয়ামী লীগ। কয়েক দিন ধরে দেশের বিভিন্ন স্থানে দলটির নেতাকর্মীদের ঝটিকা মিছিল ও আকস্মিক কর্মসূচি দেখা গেছে। দীর্ঘদিন পর অনেকটা প্রকাশ্যে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেওয়ার চেষ্টা করছেন তারা।
তবে এসব বিষয়ে প্রশাসনও সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে কোনো ধরনের সমাবেশ, মিছিল কিংবা নাশকতার চেষ্টা কঠোরভাবে দমন করা হবে বলে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
সূত্রগুলোর দাবি, দলটির উগ্রপন্থি ও উচ্ছৃঙ্খল অংশ বিদেশে অবস্থানরত নেতাদের নির্দেশনা ও উসকানিতে মাঝেমধ্যেই ঝটিকা মিছিল, গোপন বৈঠক এবং উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে সরকারের কঠোর অবস্থান ও নিরাপত্তা বাহিনীর তৎপরতায় তারা বড় ধরনের কোনো নাশকতা বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির সুযোগ পায়নি।
Advertisement
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, ২৩ জুন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী কেন্দ্র করে নতুন করে অরাজকতা, নাশকতা এবং জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করার অপচেষ্টা হতে পারে। এ লক্ষ্যে বিভিন্ন স্থানে গোপন যোগাযোগ, উসকানিমূলক প্রচারণা এবং নাশকতার পরিকল্পনার তথ্যও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
আরও পড়ুন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী: ৬ জেলায় সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্তএমন পরিস্থিতিতে সম্ভাব্য যে কোনো নাশকতা কঠোরভাবে মোকাবিলার প্রস্তুতি নিয়েছে সরকার। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ সদর দপ্তর ও র্যাব দেশব্যাপী সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে। প্রণয়ন করা হয়েছে চার স্তরের বিশেষ নিরাপত্তা পরিকল্পনা। রাজধানী ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথে চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি কার্যক্রম জোরদার ও সার্বিক নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি রাতের টহল দ্বিগুণ করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দেশের ছয়টি জেলায় সেনাবাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশের স্থিতিশীলতা বিনষ্ট, জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি কিংবা নাশকতার যে কোনো অপচেষ্টা কঠোর হাতে দমন করা হবে। আইন ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
২০ দিনে ঢাকায় গ্রেফতার ১১০২৩ জুন কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ঝটিকা মিছিল, মিছিলের প্রস্তুতি ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় গত ১ জুন থেকে ২০ জুন পর্যন্ত দলটির প্রায় ১১০ জন নেতাকর্মী পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়েছেন।
Advertisement
আমাদের কাছে কোনো হুমকি বা থ্রেট নেই। তবুও আমরা নগরবাসীর নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে কয়েক স্তরের নিরাপত্তা সাজিয়েছি। নগরবাসীকে নিরাপদ রাখতে পুলিশ কোনো ধরনের শিথিলতা দেখাবে না। যে কোনোভাবে ঢাকা শহরকে নিরাপদ রাখতে পুলিশ মাঠে থাকবে।—এস এন মো. নজরুল ইসলাম
এরমধ্যে গত ১৮ জুন সকাল ৯টার দিকে রাজধানীর মহাখালী বাস টার্মিনালের মূল সড়কে মিছিল বের করে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা। এসময় মিছিল থেকে তিন-চারটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। পরে সেখান থেকে চারজনকে আটক করে পুলিশ।
গত রোববার গাজীপুরে মিছিল বের করেন যুবলীগ নেতাকর্মীরা/ছবি: জাগো নিউজ
এছাড়া সম্প্রতি রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানাধীন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে মিছিল করার প্রস্তুতিকালে হাতেনাতে ছয়জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। মোহাম্মদপুর কলেজ গেট এলাকা থেকে ঝটিকা মিছিলের প্রস্তুতিকালে হাতেনাতে আওয়ামী লীগের আটজন সক্রিয় কর্মীকে গ্রেফতার করে মোহাম্মদপুর থানা পুলিশ।
আরও পড়ুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী / প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আ’লীগ গোয়েন্দা নজরদারির পরিকল্পনাএকটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যে কোনো ধরনের নাশকতা বা অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে আরও সতর্ক হতে হবে। পাশাপাশি কঠোর গোয়েন্দা নজরদারি বজায় রাখতে হবে। দেশ ও জনগণের জানমালের সুরক্ষায় পুলিশ প্রশাসনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রেখে স্বাধীন ও উন্মুক্তভাবে আইন প্রয়োগের পূর্ণ সুযোগ দিতে হবে।
ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ যেন নতুন করে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা করতে না পারে, সেজন্য মাঠপর্যায়ে কড়া নির্দেশনা দিতে হবে। সারাদেশে সাঁড়াশি অভিযান চালাতে হবে। বিভিন্ন স্থান থেকে সম্ভাব্য নাশকতাকারীদের গ্রেফতার করতে হবে।
ঢাকায় ১৮ হাজার পুলিশ নামাবে ডিএমপিআওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে রাজধানীতে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়ার কথা জানিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। আগামীকাল মঙ্গলবার (২৩ জুন) দলটির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিনে ঢাকায় ১৮ হাজার পুলিশ মোতায়েন থাকবে। দুই শতাধিক জায়গায় পুলিশের বিশেষ পিকেট ও চেকপোস্ট বসানোর কথা বলা হয়েছে।
ডিএমপির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আগামী ২৩ জুন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ঢাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যাপক ও নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে ডিএমপি। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর বিভিন্ন কর্মসূচি কেন্দ্র করে যে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে এবং নগরের নিরাপত্তা বজায় রাখতে পুরো ঢাকাকে নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে ফেলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, মঙ্গলবার ডিএমপির বিশেষায়িত ইউনিটগুলোও মাঠে থাকবে। এর মধ্যে ডিবি এবং সিটিটিসি ইউনিট সার্বক্ষণিক মোতায়েন থাকবে। পাশাপাশি যে কোনো ধরনের আগাম নাশকতা বা ষড়যন্ত্র রুখে দিতে সাদা পোশাকে স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি) এবং আইএডি (ইন্টারনাল অ্যাফেয়ার্স ডিভিশন) ব্যাপক গোয়েন্দা কার্যক্রম চালাবে।
আরও পড়ুন আ.লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে ঢাকায় ১৮ হাজার পুলিশ মোতায়েনযে কোনো জরুরি পরিস্থিতি দ্রুত ও কার্যকরভাবে মোকাবিলা করার জন্য মহানগরের বিভিন্ন পয়েন্টে ১৫টি কুইক রেসপন্স টিম প্রস্তুত রাখা হবে। এছাড়া ঢাকার চারটি প্রধান নিয়ন্ত্রণ কক্ষে জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য পর্যাপ্ত ফোর্স স্ট্যান্ডবাই বা রিজার্ভ রাখা হবে, যেন ডাক পাওয়া মাত্রই তারা অ্যাকশনে যেতে পারে।
দেশজুড়ে পুলিশের সতর্কতাআওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে গত বৃহস্পতিবার পুলিশ সদর দপ্তর থেকে এ বিষয়ে একটি ‘জরুরি বার্তা’ পাঠানো হয়েছে। দেশের সব মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার ও রেঞ্জ ডিআইজি বরাবর পাঠানো ওই বার্তায় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে দলটির ‘সম্ভাব্য কর্মকাণ্ড মূল্যায়ন’ করার কথা বলা হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার ঢাকায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মিছিল/ভিডিও থেকে নেওয়া ছবি
সেখানে বলা হয়, সেদিন (২৩ জুন) দলটির তরফে দেশের বিভিন্ন জেলায় দলীয় কার্যালয়ে পতাকা উত্তোলন এবং প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর ব্যানার নিয়ে প্রকাশ্যে মিছিল করতে পারে। ফলে দেশের অন্যান্য রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে এনসিপির নেতাকর্মী ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের সঙ্গে সংঘর্ষ তৈরির আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি তাদের কর্মকাণ্ডে বাধা দিলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপরও ক্ষুব্ধ হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে।
এ অবস্থায় এসব বিষয় গুরুত্বে নিয়ে ‘প্রয়োজনীয় সতর্কতা ও নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ’ করতে নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হয়েছে পুলিশ সদর দপ্তরের ওই বার্তায়।
পুলিশ কর্মকর্তাদের ভাষ্য, একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন থেকে আগাম সতর্কতার অংশ হিসেবে সারাদেশে ওই বার্তা দেওয়া হয়েছে।
৬ জেলায় হচ্ছে সেনা মোতায়েনকার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে দেশের ছয় জেলায় সেনাবাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এই ছয় জেলার মধ্যে রয়েছে—ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ ও চট্টগ্রাম।
সেনা মোতায়েনের কারণ ব্যাখ্যা করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া মাফিয়া চক্র আওয়ামী লীগের কিছু অপতৎপরতা সরকারের গোচরীভূত হয়েছে। দেশের বিভিন্ন জেলায় তারা মিছিল বা সমাবেশের মাধ্যমে জনমনে অস্থিরতা সৃষ্টির অপচেষ্টা চালাচ্ছে। তারা যেন কোনো প্রকার বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে না পারে, সেজন্য দেশের সব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ কোনো সংগঠনের নামে রাজপথে শক্তি প্রদর্শনের কোনো সুযোগ নেই। কেউ আইনকে চ্যালেঞ্জ করে মিছিল, সমাবেশ বা বিশৃঙ্খলার চেষ্টা করলে তা শুরু হওয়ার আগেই প্রতিহত করা হবে।—এ এইচ এম শাহদাত হোসাইন
তিনি জানান, এরই ধারাবাহিকতায় সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে যে কোনো ধরনের নাশকতা ও বিশৃঙ্খলা প্রতিরোধ এবং বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তার লক্ষ্যে ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’র আওতায় ছয়টি জেলায় ২২ জুন থেকে ৩০ জুন মেয়াদে সেনা মোতায়েন করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক চিঠিতে বলা হয়, কার্যক্রম নিষিদ্ধ বিভিন্ন সংগঠন কর্তৃক দেশের বিভিন্ন স্থানে বেআইনি মিছিল, শোডাউন ও অন্যান্য কর্মসূচির মাধ্যমে নাশকতা এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। ফলে দেশের বিভিন্ন জেলার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটার পাশাপাশি জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে।
আরও পড়ুন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে ঢাকায় সতর্ক অবস্থানে পুলিশএমতাবস্থায় ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকা, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন এলাকা, গাজীপুর মেট্রোপলিটন এলাকা, নারায়ণগঞ্জ জেলা, গোপালগঞ্জ জেলা এবং ফরিদপুর জেলার শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা, জননিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও জনগণের জানমালের সুরক্ষার লক্ষ্যে ২২ থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’র আওতায় প্রয়োজনীয় সংখ্যক সেনাসদস্য মোতায়েনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয় চিঠিতে।
দেশের ৫ জেলায় বিজিবি মোতায়েনএকই দিন দেশের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলায় দেশের পাঁচ জেলায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন করা হয়েছে। জেলাগুলো হলো- কক্সবাজার, মাদারীপুর, শেরপুর, গাজীপুর ও মৌলভীবাজার। সোমবার (২২ জুন) রাতে বিজিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. শরীফুল ইসলাম এ তথ্য জানান।
তিনি বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে কক্সবাজার, মাদারীপুর, শেরপুর, গাজীপুর ও মৌলভীবাজার জেলায় বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে আজ ১ জুন সন্ধ্যা থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত বিজিবি সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবে।
‘সামনে আসবি না, মাইরা ফালামু’সাম্প্রতিক সময়ে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ঝটিকা মিছিল করেছেন। গত রোববার গাজীপুরে মিছিল বের করেন যুবলীগ নেতাকর্মীরা। মিছিল থেকে পুলিশকে উদ্দেশ্য করে বলতে শোনা যায়, ‘ওই, একটাও সামনে আসবি না। একটাও সামনে আসবি না। মাইরা ফালামু, মাইরা ফালামু। একটাও সামনে আসবি না।’ পরে মিছিল থেকে পুলিশকে হুমকি দেওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
ধানমন্ডি ৩২ নম্বর (বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণ), বনানী কবরস্থান, ২৩ বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ের কেন্দ্রীয় কার্যালয় এবং গুলিস্তানসহ রাজধানীর অন্তত ৪২টি পয়েন্টে কঠোর ব্লক চেকিং ও সিসিটিভি নজরদারি বাড়ানো হয়েছে
ওই মিছিলের ভিডিওতে দেখা যায়, গাজীপুর মহানগরীর ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের কলম্বিয়া এলাকায় শাকিল এন্টারপ্রাইজ নামের একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সামনে থেকে ৩০-৩৫ জন যুবক একটি ব্যানার নিয়ে মিছিল শুরু করেন। ব্যানারে লেখা ছিল, ‘২৩ জুন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সফল হোক, সার্থক হোক। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ওপর আরোপিত অবৈধ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে’।
ব্যানারের নিচে ‘গাজীপুর মহানগর যুবলীগ’ লেখা ছিল। এছাড়া ব্যানারের এক পাশে শেখ হাসিনা ও অন্য পাশে গাজীপুর মহানগর যুবলীগের আহ্বায়ক কামরুল আহসান সরকারের ছবি দেখা যায়।
তেজগাঁও শিল্প এলাকায় আওয়ামী লীগের একটি ঝটিকা মিছিল/ফাইল ছবি
যে কোনোভাবে প্রতিহত করবে র্যাবর্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) পক্ষ থেকে কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করা হয়েছে। র্যাব-২ এর অধিনায়ক (অতিরিক্ত ডিআইজি) নয়মুল হাসান কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
জানতে চাইলে তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ২৩ জুন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী কেন্দ্র করে কেউ যদি বিশৃঙ্খলা করতে চায় বা ঝুঁকি তৈরি করতে চায় তাহলে তারা নিজেরাই ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। যে কোনোভাবেই হোক আমরা প্রতিহত করবো।
এছাড়া র্যাবের কেন্দ্রীয় কমান্ড থেকে দেশের প্রতিটি ব্যাটালিয়ন ও চেক পোস্টে বিশেষ অপারেশনাল বার্তা পাঠানো হয়েছে। র্যাব স্পষ্ট করেছে, কেউ যদি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মুখোমুখি হতে চায় বা ঝুঁকি তৈরি করে, তবে তারা নিজেরাই বড় ধরনের বিপদে পড়বে। ঢাকাসহ র্যাবের ১৫টি ব্যাটালিয়নকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সাইবার ওয়ার্ল্ডেও নজরদারি করছে র্যাবের সাইবার মনিটরিং ইউনিট।
ছড়াতে পারে উসকানিমূলক কনটেন্টগুজব অথবা এআই ভিডিও অথবা উসকানিমূলক কনটেন্ট ছড়িয়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করার পাঁয়তারা করতে পারেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি সূত্র জানায়, ঝটিকা বা গুপ্ত মিছিলগুলোর ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে জড়িতদের আইডেন্টিফাই করার চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রবিরোধী বা উসকানিমূলক কোনো কনটেন্ট ছড়ানো হচ্ছে কি না- তা দেখতে সাইবার ক্রাইম ইউনিটগুলো ২৪ ঘণ্টা সক্রিয় রয়েছে।
আরও পড়ুন যুবলীগের মিছিল থেকে পুলিশকে হুমকি ‘সামনে আসবি না, মাইরা ফালামু’ যে কোনোভাবে ঢাকাকে নিরাপদ রাখতে চায় পুলিশডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন মো. নজরুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, আমাদের কাছে কোনো হুমকি বা থ্রেট নেই। তবুও আমরা নগরবাসীর নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে কয়েক স্তরের নিরপত্তা সাজিয়েছি। নগরবাসীকে নিরাপদ রাখতে পুলিশ কোনো ধরনের শিথিলতা দেখাবে না। যে কোনোভাবে ঢাকা শহরকে নিরাপদ রাখতে পুলিশ মাঠে থাকবে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের হুমকিতে নগরবাসীর আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।
তিনি বলেন, ধানমন্ডি ৩২ নম্বর (বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণ), বনানী কবরস্থান, ২৩ বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ের কেন্দ্রীয় কার্যালয় এবং গুলিস্তানসহ রাজধানীর অন্তত ৪২টি পয়েন্টে কঠোর ব্লক চেকিং ও সিসিটিভি নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। আকস্মিক ঝটিকা মিছিল বা সংঘাতময় পরিস্থিতি তাৎক্ষণিকভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখতে ডিএমপির বিশেষায়িত দাঙ্গা দমন ইউনিট, সোয়াত ও জলকামান প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পুলিশের পাশাপাশি বিজিবি, র্যাব, এপিবিএন ও সেনাবাহিনী মোতায়েন থাকবে।
জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) এ এইচ এম শাহদাত হোসাইন জাগো নিউজকে বলেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ কোনো সংগঠনের নামে রাজপথে শক্তি প্রদর্শনের সুযোগ নেই। কেউ আইনকে চ্যালেঞ্জ করে মিছিল, সমাবেশ বা বিশৃঙ্খলার চেষ্টা করলে তা শুরু হওয়ার আগেই প্রতিহত করা হবে।
গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে, সম্ভাব্য উসকানিদাতা ও সংগঠকদের চিহ্নিত করা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিঘ্নিত করার যে কোনো প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করা হবে। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর পরিচয় নয়, আইনের প্রয়োগই হবে একমাত্র বিবেচ্য বিষয়। সারাদেশে ব্যাপক পুলিশি নিরাপত্তা নেওয়া হয়েছে—যোগ করেন তিনি।
টিটি/এমকেআর/ এমএফএ