মতামত

ফেসবুকে হা হা রিঅ্যাক্টের আড়ালে যে সমাজ

মানুষের মৃত্যু হয়েছে। কেউ দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন। কেউ আত্মহত্যা করেছেন। কোনো মা সন্তান হারিয়েছেন, কোনো শিশু বাবাকে হারিয়েছে। সংবাদটি ফেসবুকে প্রকাশ হওয়ার কিছুক্ষণ পর দেখা গেল সেখানে শত শত মানুষের প্রতিক্রিয়া। তাদের মধ্যে অনেকেই শোক প্রকাশ করেছেন, কেউ সমবেদনা জানিয়েছেন। কিন্তু সেই একই পোস্টের নিচে চোখে পড়ে কিছু ‘হা হা’ রিঅ্যাক্ট।

Advertisement

এমন দৃশ্য এখন আর নতুন নয়। বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের কাছে এটি এক পরিচিত বাস্তবতা। প্রশ্ন হলো, একজন মানুষের মৃত্যু বা বিপর্যয়ের সংবাদে কেউ কেন হাসির প্রতিক্রিয়া জানায়? এটি কি নিছক অসাবধানতা, নাকি এর পেছনে রয়েছে আরও গভীর কোনো সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক সংকট?

ফেসবুকের রিঅ্যাক্ট বাটন চালু হয়েছিল মানুষের আবেগ প্রকাশকে আরও বৈচিত্র্যময় করার জন্য। শুধু ‘লাইক’ নয়, ভালোবাসা, বিস্ময়, দুঃখ, রাগ কিংবা হাসির মতো অনুভূতি প্রকাশের সুযোগ তৈরি হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল যোগাযোগকে মানবিক করা। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তি মানবিকতার বদলে আমাদের সামাজিক আচরণের দুর্বলতাগুলোই উন্মোচন করেছে।

বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা এখন কয়েক কোটিরও বেশি। তাদের একটি বড় অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয়। কিন্তু প্রযুক্তি ব্যবহারের বিস্তার যত দ্রুত ঘটেছে, ডিজিটাল নাগরিকত্বের শিক্ষা ততটা বিস্তৃত হয়নি। ফলে অনেক ব্যবহারকারী জানেন না কোন পরিস্থিতিতে কোন রিঅ্যাক্ট ব্যবহার করা উচিত।

Advertisement

অনেকেই মনে করেন, মৃত্যু বা দুর্ঘটনার সংবাদে দেওয়া ‘হা হা’ রিঅ্যাক্টের একটি অংশ নিছক ভুলবশত ঘটে। বিশেষ করে বয়সে প্রবীণ বা প্রযুক্তিতে অনভিজ্ঞ ব্যবহারকারীরা কখনো কখনো সঠিক ইমোজি নির্বাচন করতে পারেন না। কিন্তু সমস্যার সবটুকু এখানে সীমাবদ্ধ নয়।

সামাজিক মনোবিজ্ঞানের গবেষণা বলছে, অনলাইন পরিবেশে মানুষের আচরণ অনেক সময় বাস্তব জীবনের আচরণ থেকে ভিন্ন হয়ে যায়। সামনাসামনি দাঁড়িয়ে কেউ যে নির্মমতা দেখাতে পারত না, ভার্চুয়াল জগতে সেটি সহজেই দেখাতে পারে। মনোবিজ্ঞানীরা একে বলেন Online Disinhibition Effect—অর্থাৎ অনলাইনে দায়িত্ববোধ ও সামাজিক সংকোচের হ্রাস। পর্দার আড়ালে থাকা মানুষ নিজের কাজের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখতে পায় না বলে অনেক সময় সহানুভূতির জায়গাটিও দুর্বল হয়ে পড়ে।

এ কারণেই আমরা দেখি, কারও ব্যক্তিগত বিপর্যয়, শারীরিক অসুস্থতা কিংবা পারিবারিক শোকের খবরেও কেউ কেউ বিদ্রূপাত্মক মন্তব্য করে, হাসির প্রতিক্রিয়া দেয় কিংবা কৌতুক তৈরি করে। এটি শুধু অসভ্যতা নয়; বরং সামাজিক সহমর্মিতার অবক্ষয়ের একটি লক্ষণ। তবে এর সঙ্গে আরেকটি বিষয়ও গভীরভাবে জড়িত—সাইবার বুলিং।

আজকের পৃথিবীতে সাইবার বুলিং শুধু স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের সমস্যা নয়; এটি সমাজের সব বয়সের মানুষের জন্য একটি বাস্তব হুমকি। কোনো ব্যক্তি রাজনৈতিক মতের কারণে, ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে, সামাজিক অবস্থানের কারণে কিংবা ব্যক্তিগত শত্রুতার কারণেও অনলাইনে আক্রমণের শিকার হতে পারেন। অনেক ক্ষেত্রে ‘হা হা’ রিঅ্যাক্ট একটি সংগঠিত বিদ্রূপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

Advertisement

একটি সভ্য সমাজকে বিচার করা যায় তার দুর্বল, বিপর্যস্ত ও শোকাহত মানুষের প্রতি আচরণ দেখে। যদি কোনো মৃত্যুসংবাদেও আমাদের আঙুল ‘হা হা’ বাটনে চলে যায়, তবে সমস্যাটি প্রযুক্তির নয়; সমস্যাটি আমাদের মনোজগতে। আর সেই মনোজগতের সংস্কার ছাড়া ডিজিটাল যুগেও মানবিক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব নয়।

ধরা যাক, একজন ব্যক্তি নিজের অসুস্থতার কথা জানিয়ে একটি পোস্ট দিলেন। সেখানে শত শত ‘হা হা’ রিঅ্যাক্ট জমা হলো। বাস্তবে এটি কোনো হাসির প্রতিক্রিয়া নয়; এটি এক ধরনের ডিজিটাল অপমান। একইভাবে কোনো মৃত ব্যক্তির সংবাদে ‘হা হা’ রিঅ্যাক্ট দেওয়া শোকাহত পরিবারের জন্য দ্বিতীয়বার আঘাতের সমান।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সাইবার বুলিংয়ের প্রভাব নিয়ে বহু গবেষণা হয়েছে। গবেষণাগুলো দেখিয়েছে, অনলাইন অপমান, বিদ্রূপ ও সামাজিক প্রত্যাখ্যান মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। উদ্বেগ, বিষণ্নতা, আত্মসম্মানবোধের অবনতি, এমনকি আত্মহত্যাপ্রবণতার সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীরা এ ধরনের আচরণের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

বাংলাদেশেও বিষয়টি উদ্বেগজনক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাউকে হেয় করা, ট্রল করা কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে উপহাস করার প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। রাজনৈতিক বিভাজন, সামাজিক মেরুকরণ এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক বিদ্বেষ এই সংস্কৃতিকে আরও উসকে দিচ্ছে। ফলে মানুষ পোস্টের বিষয়বস্তু না দেখে পোস্টদাতার পরিচয় দেখে প্রতিক্রিয়া জানাতে শুরু করেছে।

এখানেই সবচেয়ে বড় বিপদ। কারণ একটি সভ্য সমাজে মতের পার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু মানবিকতার পার্থক্য থাকা উচিত নয়। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মৃত্যুতে আনন্দ প্রকাশ, ভিন্ন মতের মানুষের বিপর্যয়ে বিদ্রূপ করা কিংবা শোকের মুহূর্ত উপহাসে পরিণত করা কোনো সুস্থ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির লক্ষণ নয়।

এ সমস্যার আরেকটি মাত্রা হলো ‘ডিজিটাল অসংবেদনশীলতা’। প্রতিদিন অসংখ্য দুর্ঘটনা, যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, সহিংসতা ও মৃত্যুর সংবাদ দেখতে দেখতে অনেক মানুষের আবেগগত প্রতিক্রিয়া ভোঁতা হয়ে যাচ্ছে। মনোবিজ্ঞানে একে বলা হয় Compassion Fatigue বা সহমর্মিতার ক্লান্তি। ফলে অন্যের কষ্টকে আর বাস্তব কষ্ট বলে মনে হয় না; তা পরিণত হয় কেবল আরেকটি স্ক্রলযোগ্য কনটেন্টে।

কিন্তু মানুষ যদি মানুষের দুঃখে ব্যথিত না হয়, তবে প্রযুক্তির অগ্রগতি কোনো অর্থ বহন করে না।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কয়েকটি বিষয় জরুরি।

এজন্য ডিজিটাল সাক্ষরতা শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু ইন্টারনেট ব্যবহার শেখানো নয়, অনলাইনে দায়িত্বশীল আচরণ শেখানোও প্রয়োজন। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠক্রমে ডিজিটাল নাগরিকত্বের ধারণা অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।

এছাড়া পরিবারকে ভূমিকা নিতে হবে। শিশুরা অনলাইনে কী দেখছে, কী শিখছে এবং কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে—সে বিষয়ে সচেতনতা প্রয়োজন। কারণ ভার্চুয়াল আচরণের ভিত্তি তৈরি হয় বাস্তব জীবনের মূল্যবোধ থেকে।

এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। অপব্যবহার, হয়রানি ও সংগঠিত সাইবার বুলিং শনাক্ত করার প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ব্যক্তিগত আত্মসমালোচনা। একটি রিঅ্যাক্ট দেওয়ার আগে আমাদের ভাবতে হবে—আমি যদি ওই মানুষের জায়গায় থাকতাম, তবে এই প্রতিক্রিয়াটি কেমন লাগত? প্রযুক্তি যতই আধুনিক হোক, মানবিকতার বিকল্প এখনো আবিষ্কৃত হয়নি।

ফেসবুকের একটি ছোট্ট ‘হা হা’ রিঅ্যাক্ট কখনো কখনো একটি বড় সামাজিক সত্য প্রকাশ করে। সেটি হলো—আমরা প্রযুক্তিতে দ্রুত এগোলেও মানবিকতায় সব সময় সমান গতিতে এগোতে পারিনি। পর্দার ওপারে থাকা মানুষটিও যে একজন মানুষ, তারও অনুভূতি, কষ্ট, শোক এবং মর্যাদা আছে—এই সহজ সত্যটি ভুলে গেলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আর যোগাযোগের মাধ্যম থাকে না; তা পরিণত হয় অসংবেদনশীলতার প্রদর্শনীতে।

একটি সভ্য সমাজকে বিচার করা যায় তার দুর্বল, বিপর্যস্ত ও শোকাহত মানুষের প্রতি আচরণ দেখে। যদি কোনো মৃত্যুসংবাদেও আমাদের আঙুল ‘হা হা’ বাটনে চলে যায়, তবে সমস্যাটি প্রযুক্তির নয়; সমস্যাটি আমাদের মনোজগতে। আর সেই মনোজগতের সংস্কার ছাড়া ডিজিটাল যুগেও মানবিক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব নয়।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট। ডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ।drharun.press@gmail.com

এইচআর/এমএফএ/এমএস