তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য প্রথম দফার আলোচনার পর মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স দাবি করেনছেন, পরমাণু পরিদর্শকদের পুনরায় ইরানে প্রবেশের অনুমতি দিতে হবে। তবে তার এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান।
Advertisement
সুইজারল্যান্ডে আলোচনার পর জেডি ভ্যান্স জানিয়েছিলেন যে, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার সঙ্গে আলোচনা ‘আজ থেকেই শুরু হতে পারে’। কিন্তু পরমাণু কর্মসূচি পরিদর্শনের বিষয়ে তেহরান নতুন কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি বলে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে জানিয়েছে।
এমন সময় এই ঘটনা ঘটল যখন যুক্তরাষ্ট্র সাময়িকভাবে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার ফলে কয়েক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো ইরান মার্কিন ডলারে তাদের তেল বিক্রি করতে পারবে।
সোমবার কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীদের দেওয়া এক যৌথ বিবৃতিতে জানানো হয়, সুইজারল্যান্ডের শহর বার্গেনস্টকে প্রথম দফার আলোচনার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান ‘৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর রোডম্যাপ’ তৈরিতে সম্মত হয়েছে।
Advertisement
এই আলোচনাকে একটি ‘খুব ভালো ভিত্তি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট। তিনি জানান, উভয় পক্ষ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং ‘আঞ্চলিক যুদ্ধবিরতির জন্য সংঘাত নিরসন’ নিয়ে আলোচনা করেছে।
সোমবার ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা ৬০ দিনের জন্য মওকুফ করেছে মার্কিন অর্থ বিভাগ, যার মধ্য দিয়ে ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের অবরোধের মূল ভিত্তিকে ভেঙে দেওয়া হয়েছে বলেই মনে করা হচ্ছে, যা ঐতিহাসিকভাবে তেহরানের অর্থনীতিকে স্থবির করে রেখেছিল।
এর ফলে ২১ অগাস্ট পর্যন্ত ইরান অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল উৎপাদন, বিক্রি এবং সরবরাহের অনুমোদন দেয়। এই নিষেধাজ্ঞা শিথিলের আওতায় ইরানি তেল সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রেও আমদানি করা যাবে।
এটি ব্যাংকিং লেনদেন, বীমা ও পরিবহনের পথ খুলে দিয়েছে এবং অপরিশোধিত তেল বিক্রির জন্য ইরান আগে যে জটিল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করতো তার প্রয়োজনীয়তা দূর করেছে।
Advertisement
যদিও মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেছেন, এই ৬০ দিনের ছাড়ের বিনিময়ে তেহরান হরমুজ প্রণালি খোলা রাখা এবং আইএইএ-এর পরমাণু পরিদর্শকদের পুনরায় দেশে প্রবেশের অনুমতি দিতে সম্মত হয়েছিল।
পরিদর্শকরা কখন ইরানে ফিরবেন, সোমবার সকালে সাংবাদিকরা জেডি ভ্যান্সের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এই প্রক্রিয়া ‘চলতি সপ্তাহের মধ্যেই’ শুরু হবে, এমনকি পরিদর্শকদের সঙ্গে আলোচনা ‘আজই হতে পারে’।
সামাজিক মাধ্যমে এ বিষয়ে পোস্ট করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনিও দাবি করেছেন যে, ‘প্রধান অস্ত্র পরিদর্শনে সম্মত হবে’ ইরান।
তবে ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, পরমাণু পরিদর্শনের বিষয়ে ‘নতুন কোনো প্রতিশ্রুতি’ তারা দেননি।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, জাতিসংঘের পরিদর্শকদের সঙ্গে যেকোনো সম্পৃক্ততা ‘পার্লামেন্ট ও সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের বিদ্যমান প্রক্রিয়ার অধীনেই’ হবে।
এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি আইএইএ। গত গ্রীষ্মে ১২ দিনের যুদ্ধের সময় ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যেসব স্থানে বোমা হামলা চালিয়েছিল, সেখানে পরিদর্শনের সুযোগ স্থগিত করে দিয়েছিল ইরান।
পরের মাসেই জাতিসংঘের পরমাণু পর্যবেক্ষক সংস্থা জানিয়েছিল যে, তারা দেশটিতে থাকা তাদের পরিদর্শকদের সরিয়ে নিয়েছে।
২০১৫ সালে ইরান এবং ছয় বিশ্বশক্তি- যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ফ্রান্স, রাশিয়া, জার্মানি ও যুক্তরাজ্য- একটি চুক্তিতে পৌঁছেছিল, যার মাধ্যমে ইরানে পরমাণু স্থাপনা পরিদর্শনের সুযোগ পায় আইএইএ।
নিজের প্রথম মেয়াদে অর্থাৎ ২০১৮ সালে এই চুক্তিকে ‘বাজে চুক্তি’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন ট্রাম্প।
ভ্যান্স সোমবার জানান যে, যুক্তরাষ্ট্র আবারও ‘ইরানের ওপর কঠোর আঘাত’ করতে পারে, ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প এই হুঁশিয়ারি দেওয়ার পর আলোচনা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার হুমকি দিয়েছিল ইরানিরা।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট বলেন, তিনি ইরানি আলোচকদের জানিয়েছিলেন যে, ট্রাম্প কেবল ইরানের ‘উসকানিমূলক মন্তব্যের’ জবাব দিচ্ছিলেন।
সোমবার ওভাল অফিস থেকে ইরানের উদ্দেশে নতুন করে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ট্রাম্প। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ইরান যদি তাদের চুক্তি মেনে না চলে বা আচরণ ঠিক না রাখে, তবে আমি যা করার তা-ই করব।
এদিকে ইরানি গণমাধ্যম জানিয়েছে, দেশটির প্রধান আলোচকরা সোমবার আলোচনা থেকে বেরিয়ে গেছেন, তবে উভয় পক্ষের মধ্যে কারিগরি আলোচনা অব্যাহত থাকবে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার মধ্যস্থতাকারী- কাতার ও পাকিস্তানের বিবৃতিতে জানানো হয়েছে যে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে ‘ভুল বোঝাবুঝি ও দুর্ঘটনা এড়াতে’ একটি ‘যোগাযোগ ব্যবস্থা’ তৈরি করা হয়েছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর সহায়তায় যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও লেবাননের মধ্যে একটি ‘সংঘাত নিরসন সেল’ তৈরিতে উভয় পক্ষ সম্মত হয়েছে, যার লক্ষ্য লেবাননে সামরিক অভিযানের অবসান ঘটানো।
লেবানন পরিস্থিতিকে ‘আসল পরীক্ষা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচিও। শনিবার রাত থেকে লেবানন, ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে লড়াই কমে এসেছে এবং একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি এখনো বজায় রয়েছে।
টিটিএন