ইলিয়াস মশহুদ
Advertisement
বিখ্যাত সাধকপুরুষ হজরত শাহজালাল (রহ.) স্বপ্নে নির্দেশ পেয়ে সুদূর আরব থেকে দীর্ঘ পথ পাড়িয়ে দিয়ে ১৩০৩ খ্রিষ্টাব্দে সিলেটে আসেন। গৌড়গোবিন্দের প্রবল প্রতিরোধ, অগ্নিবাণ ও নানা কৌশল ব্যর্থ করে শাহজালাল (রহ.) ও তাঁর সঙ্গীরা সিলেট বিজয় করেন। বিজয়ের পর শ্রীহট্ট ‘জালালাবাদ’ নামে পরিচিতি লাভ করে এবং ইসলাম প্রচার ও প্রতিষ্ঠার নতুন দ্বার উন্মোচিত হয়।
পরবর্তীতে তাঁর সঙ্গীর সংখ্যা ৩৬০-এ পৌঁছে। তাঁরা ইসলাম প্রচার, শিক্ষা বিস্তার এবং নওমুসলিমদের প্রশিক্ষণে আত্মনিয়োগ করেন। শাহজালালের (রহ.) নেতৃত্বে সিলেট আধ্যাত্মিক ও জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হিসেবে বিকশিত হয়। তাঁর খ্যাতিতে আকৃষ্ট হয়ে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ তাঁর সাক্ষাৎ লাভে আসতেন; এমন কি বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতাও তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তাঁর দাওয়াতি ও আধ্যাত্মিক কর্মধারার প্রভাবে সিলেট বাংলার অন্যতম আধ্যাত্মিক রাজধানীতে পরিণত হয়।
খাজনামুক্ত সিলেট ও প্রাচীন রাজ-ঐতিহ্যশাহজালাল মুজাররদে ইয়ামেনি (রহ.) সিলেট বিজয়ের পর দিল্লির সুলতান শামসুদ্দিন ফিরোজ শাহ শাহজালালকে সিলেটের শাসনভার গ্রহণের প্রস্তাব দেন; কিন্তু তিনি সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। পরে সুলতান বিশেষ ঘোষণা জারি করে সিলেট শহর খাজানামুক্ত (কসবে সিলেট) করে দরবেশ শাহজালাকে (রহ.) সম্মানিত করেন, যা এখনো (দরগাহ সংশ্লিষ্ট এলাকায়) বহাল আছে।
Advertisement
যখনই দিল্লির রাজপুরুষগণ সিলেটের শাসনকর্তা নিযক্ত হতেন, প্রথা অনুযায়ী শাসনভার গ্রহণের পূর্বে দরগাহে এসে জিয়ারত সম্পন্ন করে দরগাহর স্থলাভিষিক্ত খাদিমগণ কর্তৃক স্বীকৃত হয়েই কার্যভার গ্রহণ করতেন এবং এ প্রথা ব্রিটিশ রাজত্বের প্রারম্ভকাল পর্যন্ত প্রচলিত ছিল। দরগাহর পুরোনো রেকর্ডপত্র অনুসন্ধানে দেখা যায়, দিল্লির রাজপুরুষগণ রাজকীয় আড়ম্বরে দরগাহে এলে খানকার শেখ রাজপুরুষদের মাথায় পাগড়ি বেঁধে অনুষ্ঠানিকভাবে তাদের প্রতি শাহজালালের মনোনয়ন জ্ঞাপন না করা পর্যন্ত জনসাধারণ শাসনকর্তা হিসেবে তাদের গ্রহণ করতেন না। (হজরত শাহজালাল রহ., শামসুল আলম সি.এস.পি, পৃষ্ঠা: ৫২, ইফা, ১৯৮৩)
আরও পড়ুন হজরত শাহজালাল ইয়েমেনি (রহ.) শাহজালালের সমাধিশাহজালালের সমাধিকে দরগাহ টিলা বলে অভিহিত করা হয়। টিলার উত্তর দিকে প্রাচীরবেষ্টিত স্থানে শাহজালালের সমাধি অবস্থিত। চার কোণে চারটি উঁচু স্তম্ভ দ্বারা তা নির্মিত। তাঁর সমাধির পশ্চিম দিকের প্রাচীর ঘেঁষে একটি ছোট মসজিদ রয়েছে, যা সিলেটের তদানীন্তন মাজিস্ট্রেট ও কালেক্টর উইলস দ্বারা পুননির্মিত হয়। দরবেশের সমাধির পূর্ব-পশ্চিমে যথাক্রমে ইয়ামেনের যুবরাজ শেখ আলি ও ভারতের গৌড়রাজ্যের উজির মকবুল খানের কবর রয়েছে।
ঐতিহাসিক স্থাপনাশাহজালালের দরগাহর দক্ষিণ দিকে প্রবেশপথে বাহির থেকে পাশে চিল্লাখানা ও দরবেশের সহাধ্যায়ী হাজি ইউছুফ, হাজি খলিল ও হাজি দরিয়া নামক তিনজন ওলির সমাধি বিদ্যমান। তাঁদের পাশে দরগাহর ভূতপূর্ব মুতাওয়াল্লি আবু তুরাবের কবর। এখান থেকে পশ্চিমের প্রবেশপথে বাহির থেকে আরেকটি বেষ্টনীর পাশে আবু নাসির ও আবু নসর নামে দরগাহর আরও দুজন মুতাওয়ািল্ল পাশাপাশি অন্তিম শয্যায় শায়িত আছেন। এর দক্ষিণে একটি উঁচু স্থানে গম্বুজবিশিষ্ট ঘড়িঘর নামে এক দালান দেখতে পাওয়া যায়। এই ঘড়িঘরের পূর্বদিকে প্রকাণ্ড গম্বুজওয়ালা বৃহৎ অট্টালিকা, যা এই অঞ্চলে গম্বুজ নামে পরিচিত। এই গম্বুজটি মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের আমলে সিলেট সরকারের সবচেয়ে সুপরিচিত ফৌজদার ফরহাদ খান দ্বারা নির্মিত।
গম্বুজের দক্ষিণে দরগাহ মসজিদ নামে খ্যাত মুসলমানদের একটি বৃহৎ উপসানাগার রয়েছে। বাংলার সুলতান আবু মুজাফফার ইউসুফ শাহের সময়ে (১৪০০ খ্রিষ্টাব্দে) মন্ত্রী মজলিশে আতার কর্তৃক দরগাহ চত্বরে মসজিদটি নির্মিত হয়েছিল। পরে বাহারাম খান ফৌজদারের সময়ে (১৭৪৪ খ্রিষ্টাব্দ) এটি পুননির্মিত হয়। সিলেট শহরের মুসলমানদের উপাসনাগার হিসেবে এটি সর্ববৃহৎ মসজিদ। এই মসজিদের সামনে উত্তর-দক্ষিণ হয়ে লম্বালম্বি একটি প্রাঙ্গণ রয়েছে। টিলার ওপর পাথরের গাঁথুনি দিয়ে সুদৃঢ়ভাবে প্রাঙ্গণটি প্রস্তুত করা হয়েছে। টিলা থেকে নিচে অবতরণের জন্য এই প্রাঙ্গণের পূর্ব ও দক্ষিণ দিকে সিঁড়ি আছে। সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলে দরগাহ টিলা ঘেঁষে একচালা একটি ঘর পাওয়া যায়। এই ঘর মহিলা দর্শনার্থীদের ইবাদতের জন্য নির্মিত। এর উত্তরে মুসল্লিদের অজুর জন্য নতুনভাবে নির্মিত পানির ব্যবস্থা রয়েছ। এখান থেকে সামান্য উত্তরে একটি বড় পুকুরে গজার জাতীয় মাছ সাঁতার কেটে বেড়ায় এবং খাবার দেখিয়ে ডাক দিলে কূলে এসে ভিড় জমায়। দরগাহ পুকুরের গজার মাছ সম্পর্কে প্রচলিত লোককাহিনি অনুসারে শাহজালাল (রহ.) এগুলোকে পুষেছিলেন। যে কারণে জিয়ারতকারীসহ সিলেটবাসীরা আজও প্রথাগতভাবে গজার মাছের প্রতি স্নেহ দেখিয়ে আসছেন।
Advertisement
দরগাহ পুকুরের ঠিক উত্তর পাশে ও দরগাহ টিলার পূর্বে একটি বড় আঙিনা রয়েছে। এই আঙিনার উত্তর-পূর্বে একটি বৃহৎ লঙ্গরখানা ছিল। অনেক আগে এটা পর্যটক, বিদেশ থেকে আগত দর্শক ও গবির-দুঃখীদের আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো, যা বর্তমানে পরিবেশজনিত কারণে বন্ধ আছে। লঙ্গরখানার পূর্বদিকে অন্য একটি ঘরে তামার নির্মিত দুটি বড় বড় ডেগচি রয়েছে, যেগুলোর একেকটিতে সাতটি গরু ও সাত মন চাল একসঙ্গে রান্না করা যায়। এই ডেগচির কিনারায় ফারসি ভাষায় লিখিত, জাহাঙ্গীরনগর (ঢাকার পুরানো নাম) নিবাসী ইয়ার মুহাম্মদের ছেলে শেখ আবু সায়িদ এই ডেগচি তৈরি করিয়ে মুরাদ বখশের মাধ্যমে দরগাহে পাঠিয়ে দেন (রমজান ১১০৬ হিজরি—১৬৯৫ খ্রিষ্টাব্দ)।
দরগাহর আঙিনার পূর্ব সীমায় ও ডেগচি-ঘরের সামান্য দক্ষিণে পূর্ব-পশ্চিমে লম্বালম্বি একটি প্রশস্থ দেয়ালের মধ্যস্থলে দরগাহর প্রধান প্রবেশপথ, যা দরগাহ-গেইট হিসেবে খ্যাত। দরগাহ-গেইটের দক্ষিণ দিকে দরগাহ মাদরাসার কিতাববিভাগ রয়েছে।
দরগাহ টিলার পশ্চিমে অল্প দূরে শাহজালালের অলৌকিক ঝরনা অবস্থিত। ঝরনাকে কেন্দ্র করে শাহজালালের নানা অলৌকিক কীর্তি কিংবদন্তিরূপে এখনো প্রচলিত আছে। শাহজালালের (রহ.) সমাধিতে সোনার কই, মাগুর ইত্যাদি দরগাহর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেছে। এ ছাড়া শাহজালালের (রহ.) ব্যবহৃত বিভিন্ন জিনিসও দরগাহে রয়েছে। তন্মধ্যে দরবেশের ব্যবহৃত তরবারি, কাঠের তৈরি খড়ম, হরিণের চামড়া দ্বারা নির্মিত জায়নামাজ, তামার নির্মিত প্লেট ও বাটি উল্লেখযোগ্য। আর এই তামার নির্মিত বাটি বা পেয়ালায় আরবিতে কিছু বাক্য লেখা রয়েছে। রোগমুক্তির উসিলা হিসেবে ওই বাটিতে পানি ঢেলে পান করলে আরোগ্য লাভ হয় বলে মানুষ বিশ্বাস করে। (শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত, অচ্যুতচরণ চৌধুরী তত্ত্বনিধি, পৃষ্ঠা: ১৩৫, উৎস প্রকাশন, ঢাকা, ৮ম মুদ্রণ, 2017)
সুলতানি আমল থেকে প্রথা অনুযায়ী নবাব, বাদশাহ বা রাজকর্মচারীদের যারাই সিলেট আসতেন, তারা দরগাহর সংস্কার ও প্রসারকাজে কিছু অবদান রাখার চেষ্টা করতেন।
দরগাহ চত্বরে অবস্থিত স্থাপনাগুলো সুলতান ও মোগলদের আমলের নির্মিত বলে তাম্রফলক ও প্রস্তরফলকে লিখিত রয়েছে। যেমন দরগাহ মসজিদের ফলকের লেখা থেকে এই তথ্য পাওয়া যায় যে, বাংলার সুলতানরা ১৪০০ সালে এটা নির্মাণ করেন। শাহজালালের সমাধি ঘিরে যে দেয়াল রয়েছে, তা লুৎফুল্লাহ আমিন বকশি কর্তৃক নির্মিত বলে একটি ফলকসূত্রে উল্লেখ পাওয়া যায়।
এভাবে বিভিন্ন দালান, মসজিদ ও পুকুরঘাট বিভিন্ন সময় বিভিন্ন শাসনকর্তা, বাদশাহ ও সুলতানদের দ্বারা শাহজালালের (রহ.) প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্য নির্মিত বলে উল্লেখ আছে। এ ছাড়া দরগাহর লঙ্গরখানায় অর্থসাহায্য, খাদেমদের জন্য জায়গিরের ব্যবস্থা, দরগাহর আলোকসজ্জা ইত্যাদি অনুদান দরবেশের প্রতি সুলতান ও মোগল বাদশাহদের সম্মান প্রদর্শনের বিভিন্ন বিবরণীতে পাওয়া যায়। (শ্রীহট্টে ইসলাম জ্যোতি, আজহার উদ্দিন আহমদ সিদ্দিকী, পৃষ্ঠা: ৪১, উৎস প্রকাশন, ঢাকা, ৮ম সংস্করণ, ২০০৮)
আরও পড়ুন বায়েজিদ বোস্তামির মাজার, ইতিহাস ও কিংবদন্তির আশ্চর্য জগৎওএফএফ