সিরাজগঞ্জ ও বগুড়াবাসীর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন সিরাজগঞ্জ-বগুড়া রেলপথ প্রকল্প। প্রায় আট বছর ধরে স্থবির হওয়া প্রকল্পটির গতি ফেরাতে উদ্যোগ নিয়েছে বর্তমান সরকার। সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় থাকা প্রকল্পটির ব্যয় সাত হাজার কোটি টাকা ও তৃতীয় দফায় চার বছর মেয়াদ বাড়িয়ে রোববার (১৪ জুন) রেলপথ মন্ত্রণালয়ে সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) পাঠিয়েছে প্রকল্প দপ্তর। এটি পরিকল্পনা কমিশনের মাধ্যমে আগামী এক মাসের মধ্যে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উঠবে বলে জানিয়েছেন রেলপথ মন্ত্রণালয়।
Advertisement
সংশোধিত ডিপিপিতে বাংলাদেশ রেলওয়ের এই প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৪৪২ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। প্রকল্পের শুরুতে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫ হাজার ৫৭৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক লাফেই ব্যয় বাড়ছে সাত হাজার কোটি টাকা। একই সঙ্গে প্রকল্পের মেয়াদ চার বছর বেড়ে দাঁড়াবে ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত। প্রকল্প দপ্তর সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
নথিপত্র অনুযায়ী, ২০১৮ সালের ৩০ অক্টোবর একনেক বৈঠকে প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রথমে প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয় পাঁচ হাজার ৫৭৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা। যার মধ্যে তিন হাজার ১৪৬ কোটি ৫৯ লাখ ১০ হাজার টাকা ঋণ দেওয়ার কথা ছিল ভারতের। কিন্তু ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এ প্রকল্পের অর্থায়ন থেকে সরে দাঁড়ায় ভারত। এতে স্থবির হয়ে পড়ে প্রকল্পটি।
শুরুতে প্রকল্পটির মেয়াদ ধরা হয় ২০২৩ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত। কিন্তু পরামর্শক নিয়োগ এবং নকশা চূড়ান্ত করা নিয়ে বিলম্বের কারণে তা সম্ভব হয়নি। পরবর্তী ২০২১ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর ভারতীয় কর্তৃপক্ষ পরামর্শক নিয়োগ দেওয়ার পর ২০২৩ সালের ৩০ জুন চূড়ান্ত নকশা প্রণয়ন করে। এরপর মেয়াদ বাড়ানো হয় ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত। বর্তমান সংশোধিত ডিপিপি একনেকে অনুমোদন পেলে প্রকল্পের মেয়াদ দাঁড়াবে ২০৩১ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত।
Advertisement
প্রকল্প সূত্র জানায়, মূল ডিপিপিতে ৯৬০ একর জমি অধিগ্রহণের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছিল এক হাজার ৯২১ কোটি টাকা। তবে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান চূড়ান্ত অ্যালাইনমেন্ট নির্ধারণ ও ভূমি অধিগ্রহণ পরিকল্পনা প্রণয়নের পর প্রয়োজনীয় জমির পরিমাণ দাঁড়ায় ৯০১ দশমিক ৭৭ একর। এরপর সিরাজগঞ্জ ও বগুড়া জেলা প্রশাসকদের চূড়ান্ত ব্যয় প্রাক্কলনে ভূমি অধিগ্রহণ ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে দুই হাজার ২৪৪ কোটি ১৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ জমির মূল্যবৃদ্ধির কারণে শুধু এ খাতেই ব্যয় বেড়েছে ৩২৩ কোটি ১৬ লাখ টাকা। আর ভূমি অধিগ্রহণ বাবদ প্রয়োজনীয় অর্থ এরইমধ্যে দুই জেলার প্রশাসকদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
প্রকল্প পরিচালক (পিডি) আবু জাফর মিঞা জাগো নিউজকে বলেন, ‘সংশোধিত ডিপিপি গত সপ্তাহে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। আশা করছি আগামী এক মাসের মধ্যে একনেক সভায় এটি চূড়ান্ত অনুমোদন হবে। এটি অনুমোদিত হলে দরপত্র আহ্বানসহ পরবর্তী প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে মূল নির্মাণকাজ শুরু করতে আরও প্রায় ৯ মাস লাগতে পারে।’
আন্তর্জাতিক মানের চুক্তিপত্র করা হয়েছে, যাতে প্রয়োজনীয় সব বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ২০১৮ সালে যখন ডিপিপি করা হয়েছিল, তখনকার দামের ভিত্তিতে ব্যয় নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু এ সময়ের মধ্যে নির্মাণসামগ্রীসহ প্রায় সবকিছুর দাম, বিশেষ করে ডলারের বিনিময় হার বেড়ে যাওয়ায় প্রকল্প ব্যয় বাড়ছে বলে তিনি দাবি করেন।
প্রকল্প সূত্র ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছেন, সিরাজগঞ্জ-বগুড়া পথে নতুন ৮৭ কিলোমিটার ডুয়েলগেজ রেললাইন নির্মাণ হলে দূরত্ব কমবে ১১৪ কিলোমিটার। এতে যাত্রার সময় বাঁচবে প্রায় তিন ঘণ্টা। প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়নে এরইমধ্যে জমি অধিগ্রহণ কার্যক্রম গতি পেয়েছে। সিরাজগঞ্জ ও বগুড়ায় জমি বুঝে নেওয়ার কাজ চলছে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১৮ সালের ৩০ অক্টোবর একনেক সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়। তখন এই প্রকল্পে ভারতীয় ঋণে অর্থায়ন করার কথা ছিল। কিন্তু জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৫ সালের মার্চে অন্তর্বর্তী সরকার এই প্রকল্পে ভারতীয় অর্থায়ন বাতিল করে। এতে প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়৷]
Advertisement
বর্তমানে প্রকল্পটির অর্থায়নে এগিয়ে এসেছে এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি)। আগে প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল ২০১৮ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত নির্ধারিত ছিল। সংশোধিত প্রস্তাবে মেয়াদ আরও চার বছর বাড়িয়ে ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে।
এ প্রকল্পে রানীরহাট জংশন থেকে বগুড়া শহর স্টেশনে রেলসংযোগ সরিয়ে নিয়ে রানীরহাট জংশন থেকে গাবতলী স্টেশন পর্যন্ত ১৫ কিলোমিটার নতুন রেলপথ নির্মাণের জন্য স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম রেল মন্ত্রণালয়ে একটি আধা সরকারিপত্র দিয়েছেন। ১ জুন রেলসচিবকে দেওয়া ওই পত্রে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ইচ্ছা অনুযায়ী বগুড়া মহানগর এলাকা থেকে রেলপথ সরিয়ে নেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
অতিরিক্ত এই ১৫ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণ, ভূমি অধিগ্রহণ, রেলপথ নির্মাণ, আন্ডারপাস ও ওভারপাস নির্মাণ, রানীরহাট জংশনে বাইপাস নির্মাণ এবং গাবতলী রেলস্টেশন অত্যাধুনিক করতে প্রকল্পে অতিরিক্ত ব্যয় ধরা হয়েছে এক হাজার ৫০০ কোটি টাকা। বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পের কাজ ২০৩১ সালের ৩০ জুনের মধ্যে শেষ হবে।
২০১৮ সালে সিরাজগঞ্জ-বগুড়া পর্যন্ত প্রায় ৮৭ কিলোমিটার ডুয়েলগেজ রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী এর মধ্যে লুপ লাইন হবে ৩৩ কিলোমিটার। প্রকল্পে করতোয়া নদীর ওপর ২৮৬ মিটার দৈর্ঘ্যবিশিষ্ট একটি সেতু, ইছামতী নদীর ওপর ২০৫ মিটার একটি সেতু, ২২১টি ছোট-বড় সেতু, ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের ওপর একটি রেল ওভারপাস নির্মাণ, বগুড়া-নাটোর মহাসড়কে একটি রোড ওভারপাস নির্মাণ, সিরাজগঞ্জ ও রানীরহাটে দুটি জংশন নির্মাণ, কৃষ্ণদিয়া, রায়গঞ্জ, চান্দাইকোনা, ছনকা, শেরপুর, আড়িয়াবাজার রেলস্টেশন নির্মাণ এবং বগুড়া, কাহালু ও সদানন্দপুর তিনটি রেলস্টেশন নতুন করে পুনর্নির্মাণ করা হবে। পাশাপাশি রানীরহাট এলাকায় একটি ‘ওয়াই’ আকৃতির রেললাইন নির্মাণ করা হবে, যার একটি শাখা বগুড়ার দিকে, অন্যটি কাহালুর দিকে যাবে। প্রকল্পে ৯০২ একর ভূমি অধিগ্রহণ প্রায় শেষ পর্যায়ে। গত অর্থবছর ভূমি অধিগ্রহণের জন্য এক হাজার ৯০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয় অন্তবর্তী সরকার।
বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত সরাসরি রেলপথ না থাকায় এ অঞ্চলের ট্রেনগুলো বর্তমানে সান্তাহার, নাটোর ও পাবনার ঈশ্বরদী হয়ে প্রায় ১২০ কিলোমিটার পথ ঘুরে চলাচল করতে হচ্ছে। বাড়তি পথ ঘুরতে একদিকে যেমন সময়ের অপচয় হচ্ছে, তেমনি অতিরিক্ত ভাড়াও গুনতে হচ্ছে। বগুড়া থেকে যেখানে সড়কপথে ঢাকা পৌঁছাতে লাগে ছয় ঘণ্টা, সেখানে ট্রেনে যেতে লাগে ১০-১১ ঘণ্টা। রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, দুই জেলার মধ্যে দূরত্ব ৭২ কিলোমিটার। তবে নতুন রেলপথ চালু হলে বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ হয়ে মাত্র পাঁচ ঘণ্টায় ঢাকায় পৌঁছানো সম্ভব।
এম এ মালেক/এসআর/এএসএম