লাইফস্টাইল

সকালে কফি পান করা কোনো আসক্তি নয়, মস্তিষ্কের স্বাভাবিক রুটিন

সকালে ঘুম থেকে উঠেই এক কাপ ধোঁয়া ওঠা কফি না পেলে অনেকেরই যেন দিন শুরু হয় না। কারো কাছে এটি ঘুম কাটানোর উপায়। এমনকি অনেকেই মজা করে বলেন-কফি না খাওয়া পর্যন্ত আমি পুরোপুরি জেগে উঠি না! কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, কেন সকালের কফির প্রতি এত টান অনুভব করেন?

Advertisement

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, এটি শুধু ক্যাফেইনের প্রতি নির্ভরতা নয় বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের মস্তিষ্কের অভ্যাস, আবেগ এবং দৈনন্দিন মানসিক প্রস্তুতির একটি জটিল সম্পর্ক।

অভ্যাসের চক্রে আটকে যায় মস্তিষ্ক

মনস্তত্ত্ববিদ চার্লস ডুহিগ তার বিখ্যাত ‘হ্যাবিট লুপ’ বা অভ্যাসের চক্র তত্ত্বে বলেছেন, মানুষের অভ্যাস মূলত তিনটি ধাপে গড়ে ওঠে-কিউ রুটিন এবং রিওয়ার্ড।

সকালে অ্যালার্ম বেজে ওঠা বা ঘুম ভাঙা হলো কিউ। এরপর কফি তৈরি করা বা কফি হাতে নেওয়া হলো রুটিন। আর কফি পান করে সতেজ ও চনমনে অনুভব করাই হলো রিওয়ার্ড।

Advertisement

প্রতিদিন একই প্রক্রিয়া পুনরাবৃত্তি হতে হতে মস্তিষ্ক এই চক্রকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে গ্রহণ করে নেয়। ফলে এক সময় কফি পান করা শুধু অভ্যাস নয়, দিনের অপরিহার্য অংশ হয়ে ওঠে।

ক্যাফেইন যেভাবে কাজ করে

আমাদের শরীরে সারাদিন ধরে অ্যাডেনোসিন নামের একটি রাসায়নিক পদার্থ তৈরি হয়। এই উপাদানই ধীরে ধীরে শরীরে ক্লান্তি ও ঘুমের অনুভূতি বাড়ায়। কফির প্রধান উপাদান ক্যাফেইন মস্তিষ্কে প্রবেশ করে অ্যাডেনোসিনের কার্যকারিতা সাময়িকভাবে বাধাগ্রস্ত করে। ফলে ক্লান্তির অনুভূতি কমে যায় এবং আমরা বেশি সতেজ ও মনোযোগী বোধ করি। এ কারণেই সকালের কফি অনেকের কাছে শুধু স্বাদের বিষয় নয়, বরং দ্রুত কর্মক্ষম হয়ে ওঠার একটি কার্যকর উপায়।

কফির গন্ধ যে কারণে ভালো লাগে

বিজ্ঞানী ইভান পাভলভের ক্লাসিক্যাল কন্ডিশনিং তত্ত্বও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অনেক সময় কফি খাওয়ার আগেই শুধু কফির গন্ধ, কফি মেশিনের শব্দ কিংবা প্রিয় মগটি হাতে নেওয়ার মুহূর্তে মন ভালো হয়ে যায়। কারণ মস্তিষ্ক এই সংকেতগুলোর সঙ্গে ইতিবাচক অনুভূতিকে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত করে ফেলেছে। ফলে কফি শরীরে প্রবেশের আগেই মস্তিষ্ক আনন্দের বার্তা পাঠাতে শুরু করে। এটাই হলো শর্তসাপেক্ষ প্রতিক্রিয়া।

কফি শুধু পানীয় নয়, একটি রিচুয়াল

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, সকালের কফি অনেক মানুষের কাছে একটি ব্যক্তিগত অভ্যাস বা দৈনন্দিন আচারের মধ্যে পড়ে।

Advertisement

দিনের ব্যস্ততা শুরু হওয়ার আগে কয়েক মিনিট সময় নিয়ে কফির কাপে চুমুক দেওয়া মানসিকভাবে স্থির হতে সাহায্য করে। এই ছোট সময়টুকু অনেকের জন্য নিজেকে গুছিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করে। গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত কিছু ইতিবাচক রুটিন মানুষের মানসিক চাপ কমাতে এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের অনুভূতি বাড়াতে সাহায্য করে।

আরও পড়ুন যেসব ফল খেলে রক্ত বাড়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্লান্তি কমায়

প্রতিদিন অসংখ্য ছোট-বড় সিদ্ধান্ত নিতে নিতে আমাদের মস্তিষ্ক ক্লান্ত হয়ে পড়ে। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে ডিসিশন ফ্যাটিগ বলা হয় ।

সকালে কী করবেন, কীভাবে দিন শুরু করবেন এগুলো নিয়ে ভাবার প্রয়োজন না হলে মস্তিষ্কের ওপর চাপ কম পড়ে। তখন কফি মানসিক শক্তি প্রদানে সাহায্য করে। এই কারণেই অনেকেই প্রতিদিন একইভাবে সকাল শুরু করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।

আরও পড়ুন কোন ফলে কী পুষ্টি, কোন ভিটামিন ডোপামিন বাড়িয়ে দেয় উৎসাহ

কফি পান করার অভ্যাসের সঙ্গে মস্তিষ্কে ডোপামিনের কার্যকলাপও জড়িত। ডোপামিনকে সাধারণত ফিল-গুড বা ভালো লাগার হরমোন বলা হয়। কফি পান করার পর অনেকেই বেশি উদ্যমী, মনোযোগী এবং কর্মক্ষম অনুভব করেন। ফলে অফিসের কাজ, পড়াশোনা কিংবা জটিল দায়িত্ব সামলানো তুলনামূলক সহজ মনে হয়।

তাই মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, সকালের এক কাপ কফি শুধু শরীরকে জাগিয়ে তোলে না, এটি মস্তিষ্ককে প্রস্তুত করে, মনকে স্থির করে এবং নতুন দিনের জন্য ইতিবাচক শক্তি জোগায়।

সূত্র: দ্য ইকোনমিক টাইমস, ওয়েব এমডি

এসএকেওয়াই