ভ্রমণ

কলকাতা ভ্রমণের দিনগুলো: পর্ব ৯

বৈদ্যুতিক ক্যাপসুল লিফটে ওঠানো হলো আমাদের। সঙ্গে আছেন সুঠামদেহের একজন সিকিউরিটি। শরীরে আকাশি শার্ট ও গাঢ় নীল প্যান্ট। হাতে ওয়াকিটকি। মুষ্টিযোদ্ধা হলে এক পাঞ্চেই ৫-৬ জনকে ফেলে দেওয়ার সামর্থ তার। লিফটা আমাদের টেনে তুলছে। যন্ত্রটা আবার পুরোনো কলকাতার চিরাচরিত লিফটের মতো নয়। কেচি দরজা নেই। একদম আধুনিক। প্রতিটি ফ্লোরে বসানো হয়েছে সয়ংক্রিয় দরজা। সচারচর যেটা বিশ্বের বড় শহরগুলোতে দেখা যায়। ঢাকাতে তো ভুরিভুরি হয়ে গেছে। বহুতল ভবন মানেই এই লিফট।

Advertisement

লিফট ষষ্ঠতলায় থামল। আমাদের নামিয়ে সিকিউরিটি আবার নিচে নেমে গেলেন। শুরুতেই মুখোমুখি হলেন ওয়েল ড্রেসড আপ আরেক সিকিউরিটি। তিনি আমাদের প্রবেশ টিকিট দেখতে চাইলেন। টিকিটের মাঝখানে আলতো ছিড়ে আমাদের ভেতরে যাওয়ার অনুমতি দিলেন।

প্রবেশ দরজা অতিক্রম করতে করতেই আরেক সিকিউরিটিকে জিজ্ঞেস করছি, ‘আচ্ছা দাদা বলবে কি? এটা না চেনার কারণ কী হতে পারে?’‘কিসের কথা বলছ, মিউজিয়াম?’‘আজ্ঞে হ্যাঁ! কোনো অটো কিংবা বাসের কন্ডাকটর চেনেন না!’‘আচ্ছা।’‘তো কী বলেছিলে?’‘মাদারস ওয়াক্স মিউজিয়াম যেতে চাই।’‘শুধু এটুকুই বলেছ।’ ‘হ্যাঁ।’‘এর পরিবর্তে যদি বলতে মায়ের মোমের মিউজিয়ামে যাব। তবে দেখতে?’‘আমাদের তো জানা ছিল না সে কথা। যা হোক তোমাকে ধন্যবাদ।’

মূল গ্যালারিতে পা রাখতেই খানিকটা চমকে গেলাম। জগদ্বিখ্যাত সব মানুষ আমাকে ওয়েলকাম করছে কেন? একটা ঘোরের মধ্যে ঢুকে গেছি। এসব বাস্তব, স্বপ্ন নাকি স্রেফ কল্পনা! মিউজিয়ামের প্রথম গ্যালারিতেই স্থান পেয়েছেন ব্রিটিশ বিরোধী ‘স্বদেশী আন্দোলন’-এর মহানায়ক ও ভারতের জাতির জনক মহাত্মা গান্ধী। মোমের ভাস্কর্যে তাঁকে এমনভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, যেন একলাই চলছেন তিনি। খাদি কাপড়ের সেলাইবিহীন ধুতি, চোখে গোলাকৃতির চির চেনা চশমা, পায়ে খড়ম আর হাতে সেই লাঠি নিয়ে আজও ছুটছেন। গ্যালারিটা শুধুই মহাত্মা গান্ধীর। দেওয়ালে ঝুলানো ফটোফ্রেমে গান্ধীজির জীবনকর্ম ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। তার ব্যবহার করা কাঠের খড়মটা আলাদা স্ট্যান্ডে পরিবেশন করা হয়েছে। জাতির জনককে ভারতীয়রা কিভাবে হৃদয়ে ধারণ করেন, এটাই হয়তো তার জ্বলন্ত উদাহরণ!

Advertisement

আরও পড়ুন কলকাতা ভ্রমণের দিনগুলো: পর্ব ৮

এরপরই জায়গা পেয়েছেন মাদার তেরেসা, নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বোস, স্বামী বিবেকানন্দ, বিআর অম্বেদকর, শ্রী অরবিন্দ, শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস এবং শ্রী সারদা দেবীর মতো কিংবদন্তি চরিত্রগুলো। এ গ্যালারিতে মাদার তেরেসাকে আলাদাভাবে পরিচয় করাতে হবে। কারণ তাঁর সম্মানেই ২০১৪ সালে মিউজিয়ামটি নির্মিত হয়েছে। জীবনের বেশিরভাগ সময় কলকাতায় কাটিয়েছেন তিনি। এ শহরের পরিচয় ও মানবিক ঐতিহ্যের সঙ্গে মাদার তেরেসার নাম গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। তাই শুধু বিনোদনের স্থান নয়, শহরের ইতিহাস ও মূল্যবোধের প্রতীক হিসেবেও মিউজিয়ামকে তুলে ধরতে তাঁর নাম ব্যবহার করা হয়েছে। মোমের ভাস্কর্যে স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে দু’হাত জোর করে সবাইকে অভ্যর্থনা জানাচ্ছেন মাদার তেরেসা। এ আইকনিক দৃশ্যটাই উপমহাদেশে নারীদের অগ্রগতি ও সমাজকে মানবিকতায় বদলে দিয়েছিল।

এর ঠিক পেছনেই বসে আছেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। অভিজাত পোশাকে শরীর ঢাকা পড়েছে কবির। লম্বা লম্বা চুল-দাড়ি সাদা হয়ে গেছে। গীতাঞ্জলির সৃষ্টিকর্তা কাঠের চেয়ারে বসে বই পড়ছেন। সামনে কাঠের টেবিলে চা চক্রের আয়োজন। কবিকে ঘিরে তার দেওয়ালচিত্রে জীবনী তুলে ধরা হয়েছে। বিশ্বকবির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন প্রেম ও দ্রোহের কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর যৌবনের দিন ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ডানহাতে নিজের বুকে বই চেপে ধরে আছেন তিনি। সাদা ধুতি, কোর্তা আর পায়ে বুট লাগিয়ে ছুটছেন বিদ্রোহী কবি।

পশ্চিম বর্ধমানের চুরুলিয়া গ্রামের দুখু মিয়া হয়তো এপার বাংলায় যথাযথ মর্যাদা পাননি। সেই আক্ষেপ হয়তো কবির আছে নিশ্চয়ই। কিন্তু বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন। তাঁর ইচ্ছানুসারে মসজিদের পাশে রাষ্ট্রীয় সম্মাননায় দাফন করা হয়েছে। পাঁচ ওয়াক্তে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক থেকে কবির কবরে ভেসে আসে আজানের ধ্বনি। কবির ডান পাশে দাঁড়িয়ে আছেন বাংলাদেশের অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর কাছাকাছি আছেন কলকাতায় জন্ম নেওয়া ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি। যার সঙ্গে বাংলাদেশের আত্মার টান ছিল!

এখানেই দাঁড়িয়ে আছেন আবুল পাকির জয়নাল আবেদিন আবদুল কালাম। নামটা অনেকের কাছেই অপরিচিত হতে পারে। তবে কিছুটা সহজ করে দিলে উনি এপিজে আবদুল কালাম। এবার নিশ্চয়ই চেনা যাচ্ছে। যা-ই হোক, তিনিও ছিলেন ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি ও প্রখ্যাত বিজ্ঞানী। ব্যালিস্টিক মিসাইল ও উৎক্ষেপণ যান উন্নয়ন কাজের জন্য তিনি ‘ভারতের মিসাইল ম্যান’ হিসেবে খ্যাতি পেয়েছেন। এর চেয়েও বড় কথা, বাংলাদেশে ঢাকার নীলক্ষেতে আবদুল কালামের ‘উইংস অব ফায়ার’ তো মোড়ে মোড়ে পাওয়া যায়। বাংলা সংস্করণটা তরুণদের কাছে খুবই জনপ্রিয়। কালাম সাহেবের ‘স্বপ্ন সেটা নয়, যা মানুষ ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে দেখে; স্বপ্ন সেটাই, যা পূরণের প্রত্যাশা মানুষকে ঘুমাতে দেয় না।’ এই উক্তি আজও স্ফূলিঙ্গ হয়ে তরুণদের উজ্জীবিত করছে।

Advertisement

আরও পড়ুন কলকাতা ভ্রমণের দিনগুলো: পর্ব ৭

পরের কক্ষেই গবেষণায় ব্যস্ত আলবার্ট আইনস্টাইন, জগদীশচন্দ্র বসু ও সত্যেন্দ্রনাথ বসু। বিশাল এক ব্ল্যাকবোর্ডে জটিল সূত্রের সমীকরণ মেলাচ্ছেন। এ যেন একটু জ্ঞানের মহাসাগরে রূপান্তর হয়েছে। ক্রিকেটের মন্দিরে প্রবেশ করেছি। যেখানে ক্রিকেটভক্তদের অপেক্ষায় আছেন ক্রিকেটের ঈশ্বর শচীন টেন্ডুলকার, ভারতীয় ক্রিকেটার মহারাজা দাদা সৌরভ গাঙ্গুলি, কিং বিরাট কোহলি আর ১৯৮৩ সালের বিশ্বকাপের মহানায়ক কপিল দেব।

এই কক্ষটা শুধুই ফুটবলের। লিওনেল মেসি, পেলে, ডিয়েগো আরমান্দো মারাডোনা এবং ইংলিশ ফুটবলার ডেভিড বেকহাম। গ্যালারিটা ফুটবল মাঠের আদলে বানানো হয়েছে। সবুজ গালিচার নানা প্রান্তে নানা ভঙ্গিতে ঠাঁই পেয়েছে ভাস্কর্যগুলো।

রাজনীতি, সামাজিক, সাহিত্য, বিজ্ঞান ও খেলার জগতের রথি-মহারথিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষ করেছি। আমার ধীরগতিতে খানিকটা বিরক্ত সানি আর শাম্মি আপা। আমাকে পেছনে ফেলে তারা নিজেদের মতো ঘুরছেন। তাতে আমার কিছু করার নেই। আমি আরও সময় নেব। নিঃসঙ্গ হয়ে সুরের মূর্ছনায় হারিয়ে গেলাম। কী নেই এই গ্যালারিতে? কিংবদন্তি লতা মুঙ্গেশকর থেকে শুরু করে কিশোর কুমার, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, পণ্ডিত রবী শঙ্কর, মান্না দের মতো তারকারা। এখানে সবাইকে তাদের আইকনিক পোজে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

কিশোর কুমারকে সঙ্গে নিয়ে ডুয়েল কণ্ঠে গানপ্রিয় মানুষদের মোহিত করছেন লতাজি। নিজ হাতে হারমোনিয়ামে সুর ধরে লাইভ পারফরম্যান্স করছেন যুবক হেমন্ত। শান্ত-চিন্তাশীল স্বভাব ধরে হারমোনিয়ামে কফি হাউজের আড্ডাটার সুর তুলছেন মান্না দে। তাঁদের গানের ক্যাসেটগুলো ডিজিটাল রূপ দিয়ে হেডফোনে গান শোনার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সুরের এই জগতে ঠাঁই পেয়েছেন মহাপণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। হলুদ কাপড় আর শ্বেতশুভ্র ধুতি পড়িয়ে কাঠের চেয়ারে বসিয়ে রাখা হয়েছে তাঁকে। ছোট্ট টেবিলে বইপত্র নিয়ে যেন আজও মস্তিষ্কটাকে জ্ঞানের ভান্ডার করে যাচ্ছেন! আছেন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ও।

আরও পড়ুন কলকাতা ভ্রমণের দিনগুলো: পর্ব ৬

এবার ঢুকে পড়েছি লাইট, ক্যামেরা ও অ্যাকশনের দুনিয়ায়। শুরুতেই পেলাম বলিউডের ডিস্কো ড্যান্সারকে। সেমি উঁচু এক মঞ্চের ওপর জায়গা হয়েছে মিঠুন চক্রবর্তীর। কোমরে দু’হাত রেখে নায়কোচিত ভাবভঙ্গি। পরনে লাল শার্ট, সাদা প্যান্ট, চোখে সানগ্লাস আর পায়ে ধবধবে জুতা। জীবন্ত এই মোমের পুতুলে যেন তাকে বলিউডের সোনালি সময়ে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

একটু দূরেই স্যুট-কোট পড়ে চললেন বলিউডের বিগ-বি। অর্থাৎ অমিতাভ বচ্চন। জীবন্ত এই কিংবদন্তির মোমের ভাস্কর্য দেখে বোঝার উপায় নেই এটা স্রেফ শিল্পকর্ম। মনে হচ্ছিল তিনি স্বয়ং কলকাতায় হাজির। তার পাশেই জায়গা পেয়েছেন বলিউড বাদশা শাহরুখ খান ও সালমান খান। ভাইজানকে পুলিশ কর্মকর্মকর্তা চুলবুল পান্ডে হিসেবে প্রদর্শিত করা হয়েছে। আছেন দেশি গার্ল প্রিয়াঙ্কা চোপড়া ও বিশ্বসুন্দরী ঐশ্বর্য রায় বচ্চন।

বামপাশে নজর পড়তেই চোখ ছানাবড়া। ওমা, এ তো সত্যজিৎ রায়। পথের পাঁচালি, অপুর সংসার থেকে কত কত সিনেমা দেখেছি। বিশ্বের সামনে অস্কার মঞ্চে অনন্য সম্মাননা পাওয়া মানুষটিও এখানে আছেন। পাঞ্জাবি পাজামার সঙ্গে সত্যজিৎ বাবুর বুকটা বিশাল চাদরে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। আর ঠোঁটে তো তামাকের পাইপ থাকবে সেটা জানা কথা!

খোঁজ নিয়ে জেনেছি, এ গ্যালারিতে ছিলেন মহানায়ক উত্তর কুমার, সুচিত্রা সেন, বাহুবলীর প্রভাস ও দেবসেনা আনুষ্কা শেটী। তবে অজানা কারণে সেসব এখন অপসারিত হয়েছে। ছয়তলা এক্সপ্লোর শেষ। সিঁড়ি দিয়ে হেঁটে নিচে নামছি। কয়েকধাপ সিঁড়ি বেয়ে নামতেই বদলে গেল সব চিত্র। এপার-ওপার বাংলা কিংবা বলিউড পেরিয়ে সোজা লস অ্যাঞ্জেলসে!লস অ্যাঞ্জেলস এ জন্য বলছি, কারণ ততক্ষণে আমি হলিউডে প্রবেশ করেছি। সিঁড়ির পাদদেশেই দাঁড়িয়েই দুঃসাহসী স্ট্যান্টের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন টম ক্রুজ। এটা দেখে আলতো আলতো পায়ে সামনে এগোলাম। এগোতেই দেখি পিরেটস অব পাইরেটসের আস্ত সেট। এই সেটের পাহাড়া দিচ্ছেন খোদ ক্যাপ্টেন জ্যাক স্পারো মানে জনি ডেপ। সেটের মুখেই মার্শাল আর্ট পজিশন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন ব্রুস লি। তাঁর পরনে হলুদ ট্র‍্যাকস্যুট। দু’হাত কিছুটা বাঁকিয়ে একপায়ে ভর নিয়ে অন্য পা দিয়ে কিক করছেন চীনের কিংবদন্তি।

আরও পড়ুন কলকাতা ভ্রমণের দিনগুলো: পর্ব ৫

এসব নজরদারির দায়িত্ব পড়েছে জেমস বন্ডের ওপর। টপ নচ এজেন্টের যেমন পোশাক তেমন ভঙ্গি। একদম অ্যাকশন মুডে ড্যানিয়েল ক্রেইগ। সিকরেট কোড পেলেই মিশন শুরু করবেন তিনি! এর ঠিক সামনেই দাঁড়িয়ে আছেন মহাকালের পপ কিংবদন্তি মাইকেল জ্যাকসন। নিজের করা সুর আর কোরিওগ্রাফিতে বিশ্ব শাসন করেছেন। মায়ের মোমের জাদুঘরেও সেই প্রতিচ্ছবি দেখা গেল। আলাদা একটা সেটে তাঁকে জায়গা দেওয়া হয়েছে। ভদ্রবাবুদের সাজে সব নজর যেন তাঁরই দিকে। পাশে বিশেষ প্রক্রিয়ায় একটি ইলেকট্রনিকস গিটারও রেখে দেওয়া হয়েছে।

মাইকেলের পাশেই আরেক বিশ্বসুন্দরী অ্যাঞ্জেলিনা জোলি। সেমি হাতার ব্ল্যাক ড্রেসে মোহনীয়তা ছড়াচ্ছেন আকাঙ্ক্ষিত এই হলিউড লেডি সুপারস্টার। গ্যালারিজুড়েই আছেন মিস্টার বিন খ্যাত রোয়ান অ্যাটকিনসন, ব্র‍্যাট পিট, ব্রুস উইলস, নিকোল কিডম্যান, জুলিয়া রবার্টস, মার্লিন মনরোর মতো তারকারা এক ছাদের নিচেই আড্ডা জমিয়েছেন।

হলিউড পেরিয়েই ভূতুরে সেট বানানো হয়েছে। ভৌতিক সাউন্ডের সঙ্গে ভয় ধরাবে এমন সব জম্বি ক্যারেক্টার রাখা হয়েছে। এই গ্যালারিতে প্রবেশ করতেই গা-ছমছম করে উঠল। একা একা এই গ্যালারিতে থাকার দুঃসাহস নেই। সানি আর শাম্মি আপার অভয়ে পরিত্যক্ত হাসপাতালের বেডে ছবি তুলতে হলো। চেহারায় ভয়ের ছাপ এখনো কাটেনি। এর মধ্যেই ফিকশনাল ক্যারেক্টার জগতে প্রবেশ করলাম। মন থেকে ভয়টা উড়ে গেল। এই গ্যালারির শুরুতেই জেমস ক্যামেরুনের কল্পবিজ্ঞানভিত্তিক মহাকাব্যিক চরিত্র অ্যাভাটারের সঙ্গে দেখা হলো। নিজেদের নাভি জাতি এ মানবজাতি থেকে লুকানো রাজ্যকে বাঁচানোর মিশনে আছেন স্যাম অর্থিংটন। এ গ্যালারিতে জায়গা হয়েছে স্টিভেন স্পিলবার্গের সৃষ্টি ইটি ক্যারেক্টারের, রাকেশ রোশনের ‘কয়ি মিল গ্যায়া’র সেই ইন্টারেস্টিং ক্যারেক্টার জাদু।

কল্পবিজ্ঞানের পরেই স্থান পেয়েছে ডোরেমেন, মটু-পাতলু, ছোটা ভিম, চুটকি, নন্টে-ফন্টের মতো নস্টালজিক ক্যারেকটার। এর মধ্যে ডোরেমন ও নন্টে-ফন্টে চরিত্রগুলো আমার ছোটবেলার সঙ্গে বেশ জড়িয়ে আছে। রোববার মানেই ছিল নন্টে-ফন্টে। আর স্কুল ছুটি হলেই ডোরেমনের সেই গ্যাজেট পাগলামি। এসব ছেড়ে কিছুটা সামনে যেতে পাওয়া গেল মার্ভেল কমিকসের অন্যতম জনপ্রিয় চরিত্র স্পাইডার-ম্যান। স্ট্যান লি ও স্টিভ ডিক্টোর এ চরিত্র আজও সবাইকে কৌতূহলী করে রেখেছে। মাদারস ওয়াক্সেও সেই ছাপ পাওয়া গেল। পাশেই ছিল আয়রন ম্যান।

আরও পড়ুন কলকাতা ভ্রমণের দিনগুলো: পর্ব ৪

সবথেকে ইন্টারেস্টিং মোমেন্ট ছিল হ্যারি পটারকে কাছে পাওয়া। ড্যানিয়েল র‍্যাডক্লিফের ছোটবেলার সেই জাদুর কাঠি নাইটিজ কিডসদের বুদ করে রেখেছিল। কয়েকটা সিঁড়ির ওপর দাঁড়িয়ে অন্ধকার জাদুকর লর্ড ভোলদেমর্দকে পরাজিত করছেন। হগওয়ার্টসে হ্যারির কাছের সঙ্গী হারমায়োনি গ্রেঞ্জারকে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। যেন কিছুতেই একাকিত্ব অনুভব না করেন র‍্যাডক্লিফ।

জাদুঘরের সবশেষ কক্ষটা অন্ধকার। এটা মূলত ফটোবুথ। নানা রঙের বাতিতে কক্ষটা আলোকিত করা হয়েছে। সেখানে দাঁড়িয়েই সবাই ছবি তুলছেন। চোখের জন্য শান্তিদায়ক না হওয়ায় অনেকেই আসেন না এ কক্ষে। এর মধ্যে দিয়েই মাদারস ওয়াক্সের মায়াবী প্রদর্শন সম্পন্ন হয়েছে। ভবনের বিশাল ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে পুরো নিউ টাউনক দেখা যায়। আর সবচেয়ে ভালো দেখা যায় ইকো পার্ক। খালি চোখেই প্যারিসের আইফেল টাওয়ার, ব্রাজিলের ক্রিস্ট দ্য রিদিমার, চীনের গ্রেট ওয়াল, ইতালির ক্লোসাম, মিশরের গ্রেট পিরামিড ও তাজমহলের আদলে বেশকিছু স্থাপনা দেখা যাচ্ছে।

বিকেলের সূর্য হেলে পড়ছে। মিউজিয়াম ভবন ছেড়ে সেক্টর ফাইভে রওয়ানা করেছি। সেখান থেকে মেট্রো ধরে শিয়ালদহ। এরপর সোজা হোটেলে চলে যাব।

চলবে...

আরও পড়ুন কলকাতা ভ্রমণের দিনগুলো: পর্ব ৩ কলকাতা ভ্রমণের দিনগুলো: পর্ব ২ কলকাতা ভ্রমণের দিনগুলো: পর্ব ১

এসইউ