আন্তর্জাতিক

শরীরে বাদুড় বসার পর জলাতঙ্কে মারা গেলো ১১ বছরের শিশু

মুখে বাদুড় এসে বসার পর ঘুম থেকে জেগে ওঠা ১১ বছর বয়সী এক কানাডিয়ান শিশু জলাতঙ্ক (Rabies) রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। ২০২৪ সালে পরিবারের সঙ্গে ওন্টারিওর একটি কটেজে বেড়াতে যাওয়ার সময় এই ঘটনা ঘটে বলে সোমবার (২৯ জুন) ‘কানাডিয়ান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন জার্নাল’- এ প্রকাশিত একটি গবেষণা প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

Advertisement

প্রতিবেদনে শিশুটির নাম প্রকাশ করা হয়নি। জানা গেছে, ঘুমের মধ্যে মুখে বাদুড় বসার পর ছেলেটি হাত দিয়ে সেটিকে মুখ থেকে তাড়িয়ে দেয়। এরপর তার বাবা ডানাওয়ালা স্তন্যপায়ী ওই প্রাণীটিকে একটি পাত্রের ভেতর বন্দি করেন ও পরে বাড়ির বাইরে ছেড়ে দেন।

জার্নালে উল্লেখ করা হয়েছে, শিশুটির শরীরে দৃশ্যমান কোনো ক্ষত বা আঘাতের চিহ্ন না থাকায় ও বাদুড়টির আচরণে কোনো অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য না করায় তার বাবা-মা তাৎক্ষণিকভাবে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হননি। কিন্তু এই ঘটনার ১৯ দিন পর ছেলেটির মুখে অসাড়তা ও ফোলাভাব শুরু হয়।

কানাডিয়ান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন জার্নালে পরবর্তী দিনগুলোতে শিশুটির জরুরি চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে যাওয়া এবং ক্লিনিক ও হাসপাতালের চিকিৎসকদের দ্বারা তার উপসর্গগুলো শনাক্ত বা রোগ নির্ণয়ের চেষ্টার বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে।

Advertisement

শুরুতে একটি জরুরি মেডিকেল ক্লিনিকের চিকিৎসকরা ধারণা করেছিলেন যে শিশুটি হয়তো ‘বেল’স পালসি' (Bell's palsy- মুখের একপাশের পেশির সাময়িক পক্ষাঘাত বা প্যারালাইসিস) রোগে আক্রান্ত। এই ভেবে তারা তাকে হারপিস ভাইরাসের সংক্রমণ নিরাময়ের অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ প্রেসক্রিপশন করেন।

এরপর তাকে পরপর দুদিন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। জার্নালের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম পরিদর্শনে চিকিৎসকরা এটিকে মুখের ভেতর ও মাড়ির একটি ভাইরাল সংক্রমণ ‘হারপিস জিঞ্জিভোস্টোমাটাইটিস’ বলে প্রাথমিক ধারণা করেন। এরপরের দিন যখন শিশুটির মুখের ডান পাশ দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন তাকে আবারও হাসপাতালে আনা হয়।

হাসপাতালে ভর্তির জন্য অপেক্ষারত থাকা অবস্থাতেই তার শরীরে ১০২ ডিগ্রি ফারেনহাইট তীব্র জ্বর আসে, যার পাশাপাশি তার খাবার গিলতে অসুবিধা, মানসিক বিভ্রান্তি ও হ্যালুসিনেশন বা অবাস্তব দৃশ্য দেখার উপসর্গ দেখা দেয়। সে দিনই তার শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। এরপর তাকে ইনটুবেট করা হয় ও শিশুদের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে ভর্তি করা হয়।

কানাডার ম্যানিটোবা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ডিপার্টমেন্ট অব পেডিয়াট্রিকস অ্যান্ড চাইল্ড হেলথ’-এর চিকিৎসকরা শিশুটির লক্ষণ দেখে দৃঢ়ভাবে জলাতঙ্ক বা রেবিস রোগ বলে সন্দেহ করেন। এর কয়েকদিন পর পরীক্ষার মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়। ‘কানাডিয়ান ফুড ইনস্পেকশন এজেন্সি’ এটি একটি বাদুড় বাহিত জলাতঙ্ক ভাইরাসের ভ্যারিয়েন্ট হিসেবে শনাক্ত করে।

Advertisement

অবশেষে হাসপাতালে ভর্তির ১৭ দিন পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় শিশুটি মারা যায়। তার কোনো অ্যালার্জি, কোনো অসুস্থ রোগীর সংস্পর্শে আসা, টিক (এক ধরণের পোকা) কামড় কিংবা দেশের বাইরে সাম্প্রতিক ভ্রমণের কোনো ইতিহাস ছিল না।

কানাডিয়ান ভেটেরিনারি মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, কানাডায় জলাতঙ্কের সংক্রমণ অত্যন্ত বিরল। ১৯২৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত দেশটিতে জলাতঙ্কে মাত্র ২৮ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। অ্যাসোসিয়েশন তাদের ওয়েবসাইটে জানিয়েছে, ব্যাপক ও চলমান টিকাদান কর্মসূচির কারণেই জলাতঙ্কের এই নিম্ন হার বজায় রাখা সম্ভব হয়েছে। এই কর্মসূচিগুলো অব্যাহত রাখতে ব্যর্থ হলে দেশটিতে আবার এই রোগের ফিরে আসার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো বাদুড়ের সাথে মানুষের সরাসরি সংস্পর্শ হওয়াই জলাতঙ্ক প্রতিরোধী চিকিৎসা বা ভ্যাকসিন নেওয়ার জন্য যথেষ্ট। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, জলাতঙ্কের লক্ষণ বা উপসর্গগুলো একবার প্রকাশ পেয়ে গেলে এই সংক্রমণ প্রায় সব সময়ই শতভাগ মারাত্মক বা প্রাণঘাতী হয়ে থাকে।

সূত্র: বিবিসি

এসএএইচ