মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গু এখন আর মৌসুমভিত্তিক কোনো রোগ নয়, মানুষের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে বছরজুড়েই। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিশেষজ্ঞরা মশক নিধনকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। তবে এই মশক নিধনে শুধু সিটি করপোরেশনের দিকে তাকিয়ে না থেকে নাগরিকদেরও সচেতন হতে হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
Advertisement
বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করছেন, কেবল সরকারি সংস্থা বা সিটি করপোরেশনের ওপর নির্ভর করে এই মরণব্যাধি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। জনস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে নাগরিকদের সচেতনতা ও সক্রিয় অংশগ্রহণই এখন প্রধান চাবিকাঠি।
বাড়ির ছাদে জমে থাকা বৃষ্টির পানি, ফুলের টব, পরিত্যক্ত টায়ার, প্লাস্টিকের পাত্র, এমনকি ফ্রিজ বা এসির নিচে জমে থাকা পানি এডিস মশার জন্য আদর্শ প্রজনন ক্ষেত্র। কোথাও পরিষ্কার পানি দেখেই নিশ্চিত হওয়া যাবে না যে সেটি জীবাণুমুক্ত।-ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ
এ বিষয়ে ইমেরিটাস অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ জাগো নিউজকে বলেন, ‘ডেঙ্গুর কার্যকর গণ-টিকা না থাকায় প্রতিরোধই একমাত্র পথ। সরকার লার্ভা ধ্বংসে ওষুধ ছিটাবে ঠিকই, কিন্তু নাগরিকরা যদি নিজের ঘরবাড়ি পরিষ্কার না রাখেন, তবে মশার বংশ বৃদ্ধি ঠেকানো অসম্ভব।’
Advertisement
তিনি বলেন, ‘বাড়ির ছাদে জমে থাকা বৃষ্টির পানি, ফুলের টব, পরিত্যক্ত টায়ার, প্লাস্টিকের পাত্র, এমনকি ফ্রিজ বা এসির নিচে জমে থাকা পানি এডিস মশার জন্য আদর্শ প্রজনন ক্ষেত্র। কোথাও পরিষ্কার পানি দেখেই নিশ্চিত হওয়া যাবে না যে সেটি জীবাণুমুক্ত।’
মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা কামরুল ইসলাম জানান, তার এলাকায় প্রতিবেশীদের নিয়ে তারা নিজেরা একটি কমিটি করেছেন, সদস্যরা সপ্তাহে একদিন নিজেদের অলিগলি পরিষ্কার করেন। তার মতে, ‘নিজের নিরাপত্তা নিজেকেই নিতে হবে, সিটি করপোরেশনের অপেক্ষায় বসে থাকলে চলে না।’
মিরপুরের বাসিন্দা মনির হোসেন জাগো নিউজকে জানান, তারা বাড়িওয়ালা সমিতির মাধ্যমে মহল্লায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা তদারকি করেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এমন নাগরিক উদ্যোগই পারে ডেঙ্গুর প্রকোপ কমাতে।
ডেঙ্গুবিরোধী নিবিড় কার্যক্রম কেবল ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনেই বেশি সীমাবদ্ধ থাকে, যা সারা দেশের অন্য সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলোতে সমভাবে হচ্ছে না। ফলে ঢাকায় ডেঙ্গু কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেও ঢাকার বাইরে সারা দেশে এর প্রকোপ বাড়ছে।-ডা. নিশাত পারভীন
Advertisement
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে না আসার পেছনে বড় দুটি ‘গ্যাপ’ বা ঘাটতি তুলে ধরেছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের উপ-প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. নিশাত পারভীন।
তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘প্রথমত, ডেঙ্গুবিরোধী নিবিড় কার্যক্রম কেবল ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনেই বেশি সীমাবদ্ধ থাকে, যা সারা দেশের অন্য সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলোতে সমভাবে হচ্ছে না। ফলে ঢাকায় ডেঙ্গু কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেও ঢাকার বাইরে সারা দেশে এর প্রকোপ বাড়ছে।’
দ্বিতীয় কারণ হিসেবে ডা. নিশাত বলেন, ‘সিটি করপোরেশন রাস্তাঘাট বা বাড়ির আশেপাশে ওষুধ ছিটাতে পারলেও ঘরের ভিতরে গিয়ে কাজ করতে পারে না। অথচ এডিস মশা ও লার্ভা সবচেয়ে বেশি জন্মায় ঘরের ভিতরেই। বিশেষজ্ঞদের দ্বারা পরীক্ষিত মশার ওষুধ শতভাগ কার্যকর হলেও তা কেবল বাইরের মশা নিয়ন্ত্রণে কাজ করে।’
আরও পড়ুন ডেঙ্গু টিকা কেন ব্যবহার করছে না বাংলাদেশডেঙ্গু পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে তাই শুধু সরকারের ওপর ভরসা না করে জনসচেতনতা সবচেয়ে বেশি জরুরি। সিটি করপোরেশনের পাশাপাশি দেশের প্রতিটি নাগরিককে নিজ উদ্যোগে সচেতন হতে হবে। নিজ ঘরে বা আশপাশের কোথাও তিন দিনের বেশি পানি জমতে দেওয়া যাবে না।
ডেঙ্গু এখন কেবল সরকারের লড়াই নয়, বরং ‘টোটাল ফাইট’ বা সর্বাত্মক যুদ্ধ। সরকারি ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা, বৈজ্ঞানিক গবেষণায় বিনিয়োগ ও নাগরিকদের আচরণগত পরিবর্তন-এই তিনের সমন্বয়েই কেবল আগামী বছরগুলোতে ডেঙ্গুর মৃত্যু মিছিল থামানো সম্ভব।-স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন
পানি পরিষ্কার রাখলে মশার ডিম থেকে লার্ভা হতে পারবে না, ফলে মশার বংশবৃদ্ধি ঠেকানো সম্ভব হবে। মূলত সারা দেশে একইভাবে ডেঙ্গুবিরোধী কাজ পরিচালনা করা এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কেবল ডেঙ্গুমুক্ত সমাজ গঠন করা সম্ভব বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. তারেকুল ইসলাম লিমন জাগো নিউজকে বলেন, ‘ডেঙ্গু এখন আর কোনো একক সংস্থার একক দায়িত্বের বিষয় নয়, বরং এটি একটি বহুমাত্রিক সংকটে রূপ নিয়েছে। আগে ডেঙ্গুকে শুধু বর্ষাকালের রোগ মনে করা হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এখন সারা বছরই এর সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে।’
আরও পড়ুন ডেঙ্গু মোকাবিলায় সবাইকে সম্পৃক্ত হতে হবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রীদীর্ঘায়িত বর্ষা, ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা এডিস মশার প্রজননের জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে তৈরি হওয়া পরিবেশ ও একটু বৃষ্টিতেই শহরের দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে।’
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু সরকার বা সিটি করপোরেশনের ওপর দায় চাপালে চলবে না বলে মনে করেন এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেন, ‘সাধারণ মানুষের নিজেদের ঘরবাড়ি ও আশপাশ নিয়মিত পরিষ্কার না রাখার মানসিকতা এবং যেখানে-সেখানে ময়লা-আবর্জনা ফেলে কৃত্রিম প্রজনন ক্ষেত্র তৈরি করার অভ্যাস মশার বংশবৃদ্ধি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
তাই প্রাতিষ্ঠানিক ও বৈজ্ঞানিক পদক্ষেপের পাশাপাশি নাগরিক সচেতনতার আমূল পরিবর্তন ছাড়া এই বহুমাত্রিক সংকট থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয় বলে মত এই বিশেষজ্ঞের।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের সরকার ও নাগরিকদের যৌথ উদ্যোগে ভরসা পান খোদ স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘ডেঙ্গু এখন কেবল সরকারের লড়াই নয়, বরং ‘টোটাল ফাইট’ বা সর্বাত্মক যুদ্ধ। সরকারি ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা, বৈজ্ঞানিক গবেষণায় বিনিয়োগ ও নাগরিকদের আচরণগত পরিবর্তন-এই তিনের সমন্বয়েই কেবল আগামী বছরগুলোতে ডেঙ্গুর মৃত্যু মিছিল থামানো সম্ভব।’
এসইউজে/এএসএ