বিনিয়োগকারীদের জন্য বিভিন্ন ধরনের সেবা সহজে ও দ্রুত দিতে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ আইন, ২০২৬’ এর খসড়া চূড়ান্ত অনুমোদন করেছে সরকার।
Advertisement
এ ছাড়া ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ ২০ শতাংশে উন্নীতের লক্ষ্য নির্ধারণ করে ‘জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র (২০২৬-২০৩০)’ এর খসড়া ও এলসির অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা। পাশাপাশি ক্রয়-বিক্রয় চুক্তির মাধ্যমে পণ্য আমদানির সুযোগ রেখে ‘আমদানি নীতি আদেশ, ২০২৬-২০২৯’ এর খসড়া অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) জাতীয় সংসদের মন্ত্রিসভা কক্ষে মন্ত্রিসভার বৈঠকে এসব প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়।
সভা শেষে রাতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ইনভেস্ট বাংলাদেশ খসড়া আইনটি বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) এবং পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ কর্তৃপক্ষের (পিপিপিএ) কার্যক্রম সমন্বয়ের লক্ষ্যে প্রণয়ন করা হয়েছে। এ আইনের মাধ্যমে প্রস্তাবিত কর্তৃপক্ষ দেশের শীর্ষ বিনিয়োগ উন্নয়ন ও সমন্বয়কারী সংস্থা হিসেবে কাজ করবে।
Advertisement
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, আইনটির মূল লক্ষ্য হলো বিনিয়োগকারীদের জন্য সেবা গ্রহণের প্রক্রিয়া সহজ, দ্রুত ও সমন্বিত করা। এর আওতায় অনুমোদন, নিবন্ধন, আমদানি-রপ্তানি, প্রণোদনা, শিল্পাঞ্চল উন্নয়ন এবং সরকারি সেবা প্রাপ্তির প্রক্রিয়া আরও কার্যকরভাবে সমন্বয় করা হবে।
প্রস্তাবিত আইনটি বর্তমান সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারে ঘোষিত ব্যবসা-সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। এটি সিঙ্গেল উইন্ডো ক্লিয়ারেন্স, ওয়ান-স্টপ সার্ভিস, অনুমোদন ও লাইসেন্সিং প্রক্রিয়ার ডিজিটালাইজেশন, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, শিল্পায়ন, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য বাস্তবায়নে সহায়ক হবে।
এই আইন বিনিয়োগ উন্নয়ন কার্যক্রমে বিদ্যমান নীতিগত অসামঞ্জস্যতা কমাবে। একই সঙ্গে বিভিন্ন সংস্থার কার্যপরিধির দ্বৈততা ও পুনরাবৃত্তি পরিহার করবে, সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে সমন্বয় বাড়াবে এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা শক্তিশালী করবে। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও সর্বোত্তম চর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি সমন্বিত বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা হবে বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।
আরও পড়ুন বৈদেশিক কর্মসংস্থানে দক্ষকর্মী গড়তে ১১০ প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণ: মন্ত্রীজাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র (২০২৬-২০৩০) এর খসড়া অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা।
Advertisement
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সরকার একটি নিরাপদ, সাশ্রয়ী, টেকসই এবং নিম্ন-কার্বন জ্বালানি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র প্রণয়ন করেছে। গত ১৬ এপ্রিল অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বিশেষ বৈঠকের সিদ্ধান্তের আলোকে গঠিত কমিটির সুপারিশ, আন্তমন্ত্রণালয় পর্যালোচনা, জনমত গ্রহণ এবং ৩১টি মন্ত্রণালয়, বিভাগ, সংস্থা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশেষজ্ঞ ও বিনিয়োগকারী সংগঠনের মতামতের ভিত্তিতে কৌশলপত্রটি চূড়ান্ত করা হয়েছে।
‘কৌশলপত্রের মূল লক্ষ্য হলো ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ ২০ শতাংশে উন্নীত করা এবং কার্যকর চাহিদা ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ন্যূনতম ১৫ শতাংশ বিদ্যুৎ সাশ্রয় নিশ্চিত করা।’
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, এ লক্ষ্য অর্জনের মাধ্যমে আমদানিকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা ধীরে ধীরে হ্রাস, জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার, বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির চাপ কমানো এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
কৌশলপত্রে বেসরকারি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে রুফটপ সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণ, নেট মিটারিং, ওপেক্স মডেল, স্মার্ট গ্রিড, ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম, সৌরচালিত সেচ, ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন, বায়ু বিদ্যুৎ, পানি বিদ্যুৎ, বায়োগ্যাস, বৈদ্যুতিক যানবাহনের চার্জিং অবকাঠামো এবং ক্লিন কুকিং প্রযুক্তির সম্প্রসারণে প্রয়োজনীয় নীতি ও প্রণোদনার ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এ ছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও অর্থায়ন সহজীকরণের জন্য একটি নবায়নযোগ্য জ্বালানি ফান্ড গঠন, সহজশর্তে অর্থায়ন, ক্রেডিট গ্যারান্টি, কার্বন ক্রেডিট ব্যবস্থার বিকাশ, আমদানি শুল্ক যৌক্তিকীকরণ, কর অবকাশ এবং স্থানীয় উৎপাদন ও ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পে বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
কৌশলপত্রে সামাজিক অন্তর্ভুক্তি ও পরিবেশগত সুরক্ষার বিষয়েও বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। কৃষিজমির সুরক্ষা, সম্ভাব্য ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণ, সৌর প্যানেল ও ব্যাটারির পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ, ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তিতে দক্ষ জনবল তৈরির ক্ষেত্রে কমপক্ষে ৩০ শতাংশ নারী অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
কৌশলপত্রের কার্যকর বাস্তবায়ন ও অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের জন্য বিদ্যুৎ বিভাগের উদ্যোগে একটি রিয়েল-টাইম অনলাইন মনিটরিং ড্যাশবোর্ড চালু করা হবে এবং নিয়মিত আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় সভার মাধ্যমে বাস্তবায়ন কার্যক্রম পর্যালোচনা করা হবে। পাশাপাশি, সর্বোচ্চ পর্যায়ে নীতিগত দিকনির্দেশনা, সমন্বয় ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি জাতীয় পলিসি কাউন্সিল গঠন করা হবে বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।
আরও পড়ুন মোট রপ্তানির ৯১ শতাংশই আসে প্রধান কয়েকটি পণ্য থেকে: বাণিজ্যমন্ত্রীআমদানিনীতি আদেশ, ২০২৬-২০২৯ এর খসড়া অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা। তিন বছর পর পর আমদানি নীতি আদেশ প্রণয়ন পরে সরকার। বর্তমান আদেশের মেয়াদ গত ৩০ জুন শেষ হয়েছে। তবে নতুন আমদানি নীতি আদেশ জারি না হওয়া পর্যন্ত এর কার্যকারিতা বলবৎ রয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত আমদানি নীতি আদেশে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আধুনিক চর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এলসির পাশাপাশি ক্রয়-বিক্রয় চুক্তির মাধ্যমে শিল্প ও বাণিজ্যিক উভয় খাতের প্রতিষ্ঠানের জন্য মূল্যসীমা নির্বিশেষে পণ্য আমদানির সুযোগ রাখা হয়েছে।
মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল এবং সেন্ট্রাল বন্ডেড ওয়্যারহাউজ প্রতিষ্ঠার বিধান সংযোজন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি আঞ্চলিক বাণিজ্য, লজিস্টিকস ও পুনঃরপ্তানি কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার ভিত্তি সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ, রপ্তানি সম্প্রসারণ, আধুনিক সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, ব্যবসা সহজীকরণ এবং শিল্প খাতে কাঁচামালের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং উচ্চ মূল্য সংযোজনসম্পন্ন রপ্তানি খাতের বিকাশের লক্ষ্যে বিভিন্ন রপ্তানিমুখী শিল্প খাতে ফি অব কষ্টের ভিত্তিতে কাঁচামাল ও উৎপাদন উপকরণ আমদানির সুবিধা সম্প্রসারণ করা হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত আমদানি নীতি আদেশ ২০২৬-২০২৯ এ প্রথমবারের মতো ‘প্রবাসী বাংলাদেশি’ এর সংজ্ঞা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং তাদের অনুমোদিত শিল্প প্রতিষ্ঠানের জন্য ক্যাপিটাল মেশিনারি, যন্ত্রাংশ ও কাঁচামাল আমদানির সুযোগ আরও সহজ করা হয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিকভাবে প্রচলিত আধুনিক অর্থ পরিশোধ পদ্ধতির ব্যবহার এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদ্যমান বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধানের মাধ্যমে প্রবাসীদের দেশে বিনিয়োগ ও শিল্প স্থাপনকে আরও উৎসাহিত করা হয়েছে।
আরএমএম/এনএইচআর