মতামত

উপমহাদেশে ডুবতে থাকা বাম রাজনীতি, ভাসবে কি আর?

বিংশ শতাব্দীতে যে সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য ছিল প্রকট, সেই সমাজই সমাজতন্ত্রের প্রতি ঝুঁকে পড়ত। এশিয়া, দক্ষিণ আমেরিকা এবং আফ্রিকা মহাদেশ তার প্রমাণ। বিশেষ করে যেসব অঞ্চলে খেটে খাওয়া মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল মানুষের জন্ম হয়েছে। বরাবরই উপমহাদেশে অর্থনৈতিক বৈষম্য ছিল তীব্র এবং এই অঞ্চলে জন্ম নিয়েছেন বহু সচেতন-শিক্ষিত মানুষ, যারা হতদরিদ্র সমাজ ও সমাজব্যবস্থার পরিবর্তনে রাজনীতি করে জীবন পার করেছেন। এই বিচারে উপমহাদেশ ছিল সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অন্যতম মোক্ষম জায়গা। এ অঞ্চলের জনগণের একটি বড় অংশ তাতে সায়ও দিয়েছিল। কাস্তে-হাতুড়ি খচিত লাল পতাকায় মুখরিত হতো পথ। গল্প, উপন্যাস, কবিতার মধ্য দিয়ে চলত প্রতিবাদ-প্রতিরোধ। কিন্তু আজ? ধর্মীয় রাজনীতির জলোচ্ছ্বাসে ডুবে গেছে উপমহাদেশ, এমনকি ধর্মনিরপেক্ষ বলে সর্বজনবিদিত ভারতও।

Advertisement

বাম রাজনীতি অনেক দূর পর্যন্ত এগিয়েছিল ভারতে। পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা এবং কেরালায় কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (মার্ক্সিস্ট) বা সিপিআই(এম) রাজ্য শাসন করেছে দীর্ঘকাল। গোটা ভারতের মূল স্রোতে কমিউনিজম বলিষ্ঠ কণ্ঠ তৈরি করে নিয়েছিল। এখন তাকিয়ে দেখলে মনে হয়, মই বেয়ে অনেক ওপরে উঠে ধপাস করে পড়ে গেছে মাটিতে।

২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে ভারতের কেরালার নির্বাচনে পিনারাই বিজয়নের জোট পরাজিত হলো কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন জোটের কাছে। এই পরাজয়ের মধ্য দিয়ে ৪০ বছরে এই প্রথম ভারতের কোনো রাজ্যে আর কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (মার্ক্সিস্ট) বা সিপিআই(এম)-এর সরকার রইল না। ৩৪ বছর শাসনের পর পশ্চিমবঙ্গে ২০১১ সালে সিপিআই(এম) পরাজিত হয় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেসের কাছে (আমার জানা নেই, সেই নির্বাচনে আন্তর্জাতিক কোনো মহলের অতি দূর থেকে কোনো হাত ছিল কি না। ৩৪ বছরের শাসনে সিপিআই(এম) অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে উন্নতি ঘটাতে পারেনি; সে ব্যর্থতার পেছনে কী আছে, তাও জানা নেই)। রাজনীতিতে পরাজয় কোনো সমস্যা নয়, হারতেই পারে। রাজনীতিতে সাধারণত একটি দল বা জোট পরাজিত হয়, আবার এক বা দুই মেয়াদ পরে জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে ফিরে আসে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে দেখা গেল, শুধু ৩৪ বছরের শাসন থেকেই নয়, রাজনীতি থেকে, সমাজ থেকেও সিপিআই(এম)-কে যেন ধূপের মতো পুড়িয়ে উড়িয়ে দেওয়া হলো। মাত্র ১৫ বছরের ব্যবধানে সেখানে এখন ২৯৪টি বিধানসভা আসনের একটিমাত্র আসনে, অর্থাৎ মুর্শিদাবাদ থেকে বিজয়ী হয়ে মোস্তাফিজুর রহমান নিভু নিভু করে জ্বলছেন।

পৃথিবীতে দ্রুত বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের একক আধিপত্যে থাবা বসিয়েছে চীন। অন্যদিকে চীন ও রাশিয়ার মধ্যে এখন আর কোনো বৈরিতা নেই; বরং অভিন্ন লক্ষ্য তৈরি হয়েছে। কিন্তু বাণিজ্যসর্বস্ব বিশ্বে তারা দেশে দেশে কমিউনিজম ফিরিয়ে আনতে কতটা এগিয়ে আসবে, তা বলা মুশকিল।

Advertisement

ত্রিপুরায় রাজনৈতিক সমীকরণে গত প্রায় এক দশকে যে আমূল পরিবর্তন এসেছে, তার বড় প্রমাণ সিপিআই(এম)-এর ভরাডুবি এবং ভারতীয় জনতা পার্টির অপ্রত্যাশিত উত্থান। শুধু বাঙালি ভোটারদের মধ্যেই নয়, আইপিএফটির সহযোগিতায় পাহাড়ের আদিবাসী ভোটব্যাংকেও একচ্ছত্র আধিপত্যে ফাটল ধরিয়েছে বিজেপি। দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল ত্রিপুরাবাসীর সামনে ‘চলো পাল্টাই’ স্লোগান দিয়ে আশা জাগিয়ে তারা বিদায় করেছে সিপিআই(এম)-কে।

কেরালায় ২০১৬ এবং ২০২১ সালে বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট ১৪০টি আসনের মধ্যে যথাক্রমে ৯১ এবং ৯৯টি আসন পেয়ে সরকার গঠন করে। সেখানে ২০২৬ সালের নির্বাচনে তারা মাত্র ৩৫টি আসন পেয়েছে।

কমিউনিস্টরা যে শুধু ভারতের এই তিনটি রাজ্য শাসন করেছে তা-ই নয়, অনেক রাজ্যে তাদের কণ্ঠস্বর ছিল জোরালো। বিভিন্ন রাজ্যে ট্রেড ইউনিয়ন, কৃষক আন্দোলন তারা নিয়ন্ত্রণ করেছে। ছাত্রসংগঠনগুলোতে মার্ক্সবাদ প্রভাব বিস্তার করে রেখেছিল (যদিও জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়সহ গোটা দেশের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো তারা সোচ্চার আছে)। সমাজের বুদ্ধিজীবীদের বড় অংশ তাদের বক্তৃতা, লেখনী এবং তৎপরতা দিয়ে সহায়তা করেছে। সর্বোপরি কেউ সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করুক আর না-ই করুক, সবার এই আদর্শের প্রতি একটি শ্রদ্ধার জায়গা ছিল। এমনকি বাম দল দিল্লির মসনদের অংশীদার হয়ে উঠেছিল মনমোহন সিং সরকারের প্রতি সমর্থন দেওয়ার মধ্য দিয়ে। কিন্তু সেই পরিস্থিতি আজ ভীষণভাবে মুখ থুবড়ে পড়েছে। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সিস্ট) শুধু রাজ্যগুলোকে হারায়নি, দিনে দিনে যেন রাজনীতি থেকেও বিতাড়িত হয়ে যাচ্ছে। নিভে যাচ্ছে আদর্শতাড়িত শক্তিশালী কণ্ঠ। যদিও এ বছর সেন্টার অব ইন্ডিয়ান ট্রেড ইউনিয়ন এবং অন্যান্য ইউনিয়ন মিলে বিশাল ধর্মঘট পালন করে কৃষকবিরোধী আইনের বিরোধিতা করেছে এবং সফল হয়েছে, কিন্তু তা নিয়ে আত্মতৃপ্তিতে ভোগার সুযোগ নেই। ভোটের মাঠের চিত্র ভিন্নরকম দেখা যাচ্ছে।

লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে, ভারত যত বেশি যুক্তরাষ্ট্রের মুখাপেক্ষী হয়ে উঠেছে, যত বেশি যুক্তরাষ্ট্রনির্ভরতা তৈরি হয়েছে, তত বাম রাজনীতি কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। মনে আছে, ২০০৪ সালে কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকারকে সরাসরি সমর্থন দিয়েছিল সিপিআই(এম)। প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তুখোড় অর্থনীতিবিদ মনমোহন সিং। তিনি জ্বালানি ও খাদ্যসংকটের ভয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘হেনরি জে. হাইড ইউএস-ইন্ডিয়া পিসফুল অ্যাটমিক এনার্জি কো-অপারেশন অ্যাক্ট অব ২০০৬’-এ স্বাক্ষর করেন, যা হাইড অ্যাক্ট নামে পরিচিত। এর প্রতিবাদে লোকসভার ৫৯টি আসন নিয়ে সরকারের প্রতি সমর্থন তুলে নেয় বামেরা। তারা মনে করেছিলেন, এই চুক্তি ভারতের সার্বভৌমত্বের প্রতি আঘাত। সেই বোধহয় ভারতে বাম রাজনীতির পতনের শুরু—আর বামদের বিরুদ্ধে চিরাচরিত মোক্ষম হাতিয়ার ধর্ম ব্যবহারের উত্থান। যদিও আশির দশকের মাঝামাঝি থেকেই ভারতে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির কণ্ঠস্বর জোরালো হয়ে উঠছিল।

Advertisement

পাকিস্তানে বাম রাজনীতির সূচনা করেছিলেন অসম্ভব মেধাবী, প্রতিভাবান, উদার মনের এক ক্ষণজন্মা পুরুষ সাজ্জাদ জহির। শুরুটা তিনি করেছিলেন ভারতে বন্ধু রশিদ জাহান, মাহমুদুজ্জাফর এবং আহমেদ আলীকে নিয়ে প্রগ্রেসিভ রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। পাঁচটি গল্পের সংকলন ‘আঙ্গারে’ প্রকাশের পর ধর্মবিশ্বাসীদের রোষানলে পড়েন। দেশভাগের পর ১৯৪৮ সালে তিনি পাকিস্তানে ‘কমিউনিস্ট পার্টি অব পাকিস্তান’ বা সিপিপি প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু ততদিনে পাকিস্তানে ঢুকে পড়েছে কমিউনিস্টবিরোধী শক্তি। তাঁকে রাওয়ালপিন্ডি ষড়যন্ত্র মামলায় আটক করা হয়। মৃত্যুদণ্ড প্রায় নিশ্চিত ছিল। তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে তাঁকে ১৯৫৫ সালে মুক্ত করে ভারতে নিয়ে আসেন। সিপিপি ছিল লেনিনপন্থী। ১৯৫৪ সালে পূর্ব পাকিস্তানের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ, কৃষক প্রজা পার্টি এবং নেজামে ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত ইউনাইটেড ফ্রন্টকে সিপিপি সরাসরি সমর্থন দেয়। ওই বছরই পাকিস্তান সরকার সিপিপিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। তৎকালীন পাকিস্তানের দুই অংশেই বামেরা আজাদ পাকিস্তান পার্টি, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি এবং হাজী মোহাম্মদ দানেশের গণতন্ত্রী দলে ছড়িয়ে পড়ে। এ ছাড়া চীন এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে বৈরী সম্পর্ক প্রকট হয়ে উঠলে বাংলাদেশেও বাম রাজনীতি রুশপন্থী ও চীনপন্থী—এই দুই ধারায় বিভক্ত হয়ে যায়। বিশেষ করে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর সমাজতান্ত্রিক দলগুলোর মনোবল প্রায় ভেঙে পড়ে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে কমিউনিস্ট আন্দোলন খুবই জোরালো ছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে পাকিস্তানের মতো বিনাশ না হলেও তাদের ‘হাত-পা ভেঙে’ দেওয়া হয়েছে।

তথাপি তারা তৎপর থাকার চেষ্টা করছেন। এখনো শ্রমিকস্বার্থ রক্ষা, মজুরি বৃদ্ধি, জাতীয় সম্পদ রক্ষা—এসব নিয়ে মাঠে থাকলেও রাজনৈতিকভাবে তাদের প্রভাব নেই। অন্যদিকে তাদের অনেকেই অ-কমিউনিস্ট দলগুলোর ছত্রচ্ছায়ায় চলে গেছেন। অন্যদিকে ধর্মভিত্তিক দল জামায়াতে ইসলামীর অবিশ্বাস্য উত্থান হয়েছে, যা হাসিনা সরকার চেষ্টা করেও দমাতে পারেনি। ভারতের মতোই পাকিস্তান ও বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক দলগুলো যত বড় হয়েছে, বাম দলগুলো তত ছোট হয়ে গেছে। আর সে কারণেই পশ্চিমা দেশগুলো এ অঞ্চলে ধর্মভিত্তিক রাজনীতিকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে।

তবে শেষ কথা বলার সময় এখনো আসেনি। পৃথিবীতে দ্রুত বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের একক আধিপত্যে থাবা বসিয়েছে চীন। অন্যদিকে চীন ও রাশিয়ার মধ্যে এখন আর কোনো বৈরিতা নেই; বরং অভিন্ন লক্ষ্য তৈরি হয়েছে। কিন্তু বাণিজ্যসর্বস্ব বিশ্বে তারা দেশে দেশে কমিউনিজম ফিরিয়ে আনতে কতটা এগিয়ে আসবে, তা বলা মুশকিল। কারণ, বিগত সময়ের কমিউনিস্ট চিন্তার সঙ্গে বর্তমান চীনের রাষ্ট্রচিন্তার বিস্তর ফারাক রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ সিপিআই(এম)-এর সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ সেলিম এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ৫০-৬০-এর দশকেও সিপিআই(এম) ক্ষমতায় ছিল না, কিন্তু সেটাই ছিল কমিউনিস্টদের জন্য স্বর্ণযুগ। রাস্তা ছিল দখলে। প্রশ্ন সেখানেই—এই রাস্তা কি বামপন্থীরা আবার উদ্ধার করতে পারবেন?

লেখক: সাংবাদিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক বিশ্লেষক। এইচআর/এএসএম