ফিচার

পুলিশের বন্দুকের সেই বাঁটের আঘাত আজও মনে করায় জুলাইয়ের স্মৃতি

শফিকুর রহমান

Advertisement

হাঁটার সময় মাঝে মাঝে থমকে যান তিনি। পায়ের ভেতর সেই পুরোনো ব্যথাটা এখনো জেগে ওঠে, যেন মনে করিয়ে দেয় একটা বিকেলের কথা-২৭ জুলাই, ২০২৪। ঢাকা কলেজের সামনের সেই রাস্তা, পুলিশের হাতে ধরা পড়া, আর তারপর যা ঘটেছিল, তার দাগ আজও শরীরে বয়ে বেড়াচ্ছেন ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার হাজারীগঞ্জ ইউনিয়নের সন্তান হাসান মাহমুদ শুভ।

ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের এই শিক্ষার্থী কোনোদিন ভাবেননি যে একটা আন্দোলন তার জীবনে এমন গভীর ছাপ রেখে যাবে। প্রভাষক আবদুল হাইয়ের বড় ছেলে শুভ ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় ছিলেন রাজপথের সামনের সারিতে মিছিলে, স্লোগানে, আর কলমেও। আন্দোলন যখন তুঙ্গে, তখন তিনি একইসঙ্গে রাস্তায় হাঁটতেন আর রাতে বসে লিখতেন, যেন দুটো অস্ত্রেই লড়ছিলেন এই লড়াই।

আরও পড়ুন ‘হাম লেকর রহেঙ্গে আজাদি’ স্লোগান, আজাদির ডাক নাকি প্রতিবাদ?

লেখকের সঙ্গে আলাপচারিতায় শুভ ফিরে যান সেই দিনগুলোতে, যখন প্রতিটি সকাল শুরু হতো অনিশ্চয়তা নিয়ে আর প্রতিটি রাত শেষ হতো ক্লান্তি ও ভয়ের মিশেলে।

Advertisement

‘অন্যায়ের সামনে চুপ করে থাকাটা আমি কখনোই মেনে নিতে পারিনি’, বলছিলেন তিনি। চোখে-মুখে তখনো সেই দিনগুলোর ছায়া। মানুষের ন্যায্য দাবির উত্তর যখন আসছিল গুলি, নির্যাতন আর দমন-পীড়ন দিয়ে, তখন ঘরে বসে থাকাটা তার কাছে বিলাসিতা মনে হয়েছিল। জুলাইয়ের শুরু থেকেই তাই তিনি নেমে পড়েন রাজপথে, আর পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন মিডিয়ায় লিখে যান আন্দোলনের কথা। ১৬ জুলাই যেদিন আবু সাঈদ বুক পেতে দিলেন গুলির সামনে, সেদিন যেন নতুন করে জ্বলে উঠলেন শুভ। একটা আত্মত্যাগ তাকে আরও দৃঢ় করে তুললো।

কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর স্মৃতিটা ১৯ জুলাইয়ের। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকা কমপ্লিট শাটডাউনের দ্বিতীয় দিন, উত্তরার বিএনএস সেন্টার এলাকায় তখন তিনি। সেদিনই ঢাকায় সবচেয়ে বেশি মানুষ নিহত ও আহত হয়েছিলেন, আর সেই ভয়াবহতার কেন্দ্রেই ছিলেন শুভ।

স্মৃতিচারণ করেন সেদিনের, ‘চোখের সামনে কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হয়ে পিচঢালা রাস্তায় লুটিয়ে পড়লেন। চারপাশের বিল্ডিং থেকে তখন গুলি ছুটে আসছিল, বাতাসে বারুদের গন্ধ, আর প্রতিটি মুহূর্ত মনে হচ্ছিল হয়তো শেষ মুহূর্ত। মনে হয়েছিল বেঁচে ফেরা অসম্ভব। সৃষ্টিকর্তার কৃপায় সেদিন বেঁচে গেছি’ এই কথাগুলো বলার সময় তার কণ্ঠে যেন এখনো অবিশ্বাস মিশে থাকে।

রাজপথে থেকেও কলম কেন ছাড়েননি, এই প্রশ্নে শুভর উত্তর স্পষ্ট: একটি আন্দোলন শুধু স্লোগানে বাঁচে না, তাকে বাঁচিয়ে রাখে চিন্তা আর যুক্তি। কলমকেও তিনি মনে করেন প্রতিরোধের এক অস্ত্র সত্য তুলে ধরা, মানুষের বিবেক জাগিয়ে তোলা, আর ইতিহাসকে ধরে রাখা, এসবই আন্দোলনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

Advertisement

আরও পড়ুন তরুণদের স্মৃতিতে জুলাই বিপ্লব ও প্রত্যাশা

তারপর এলো সেই দিন, যেদিন তার শরীরে খোদাই হয়ে গেল আন্দোলনের একটা চিহ্ন। ২৭ জুলাই বিকেল। ঢাকা কলেজের সামনে থেকে পুলিশ তাকে সন্দেহের বশে আটক করে। আন্দোলনকারী বুঝতে পেরে শুরু হয় বেধড়ক মারধর। এক পর্যায়ে বন্দুকের বাঁটের আঘাত এসে পড়ে তার হাঁটুতে। এমন এক আঘাত, যার দাগ আজো তাকে হাঁটার সময় মনে করিয়ে দেয় সেই বিকেলের কথা।

আজ, এতদিন পরও, শুভর কণ্ঠে ক্লান্তি নেই, আছে দৃঢ়তা। বর্তমান প্রজন্মের উদ্দেশে তার বার্তা সংক্ষিপ্ত কিন্তু ভারী: স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার আর গণতন্ত্র এগুলোর কোনোটাই বিনামূল্যে আসে না। যারা প্রাণ দিয়েছেন, যারা শরীরে বয়ে বেড়াচ্ছেন আঘাতের চিহ্ন, তাদের সেই ত্যাগ যেন কখনো বিস্মৃতির অন্ধকারে হারিয়ে না যায়।

কেএসকে