মতামত

এড্রিয়াটিকের নীল জলরেখা: ডুব্রোভনিক থেকে বসনিয়ার পথে

বাসটি ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছে। এক পাশে এড্রিয়াটিক সাগরের নীল জলরাশি, অন্য পাশে ধূসর পাথরের সুউচ্চ পাহাড়। পাহাড় কেটে তৈরি করা প্রশস্ত সর্পিল সড়ক ধরে আমাদের বাস ছুটে চলছে ক্রোয়েশিয়ার ডুব্রোভনিক থেকে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার দিকে। জানালার বাইরে তাকালেই মনে হয়, প্রকৃতি যেন নিজের হাতে এঁকেছে এই পথের প্রতিটি দৃশ্য।

Advertisement

ডুব্রোভনিককে অনেকে বলেন এড্রিয়াটিকের মুক্তা। মধ্যযুগীয় প্রাচীরঘেরা এই শহর ছেড়ে বেরিয়ে আসতেই চোখে পড়ে উপকূলের অন্য এক রূপ—নির্জন, বিস্তৃত অথচ অপার্থিব সুন্দর। সমুদ্রের বুকে ছড়িয়ে রয়েছে ছোট-বড় ১৩টি দ্বীপ। আশ্চর্যের বিষয়, এর মধ্যে মাত্র তিনটিতে মানুষের স্থায়ী বসবাস। সব মিলিয়ে বাসিন্দা মাত্র চারশর মতো। বছরের অধিকাংশ সময় সেখানে নীরবতা রাজত্ব করে। কিন্তু গ্রীষ্মের তিন-চার মাসে সেই নীরবতা ভেঙে হাজির হয় পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে আসা পর্যটকদের ঢল। তখন এই শান্ত দ্বীপগুলো রূপ নেয় প্রাণবন্ত এক আন্তর্জাতিক মিলনমেলায়।

যে সড়ক ধরে আমরা এগিয়ে চলেছি, সেটিও কেবল একটি রাস্তা নয়; এটি ইতিহাসের দীর্ঘ পথচলার সাক্ষী। পাহাড় কেটে, পাথর ভেঙে, সমুদ্র সঙ্গী করে গড়ে ওঠা এই উপকূলীয় পথ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষ, সংস্কৃতি ও বাণিজ্য যুক্ত করেছে। সময়ের সঙ্গে এর রূপ পাল্টেছে, কিন্তু গুরুত্ব কমেনি।

এই অঞ্চলের ইতিহাসে যুদ্ধের স্মৃতি এখনো মুছে যায়নি। যুগোস্লাভিয়া ভাঙনের রক্তাক্ত অধ্যায় শুধু মানুষের জীবনই কেড়ে নেয়নি, ধ্বংস করেছে অসংখ্য সেতু, সড়ক ও জনপদ। তবে ইউরোপের এই অংশটি আজ নতুন গল্প লিখছে—পুনর্গঠনের গল্প। আমাদের বাস দুটি আধুনিক সেতু অতিক্রম করল। ২০২২ সালে নির্মাণ শেষ হওয়া এসব সেতু শুধু কংক্রিটের স্থাপনা নয়; এগুলো যুদ্ধজর্জর এক ভূখণ্ডের নতুন করে উঠে দাঁড়ানোর প্রতীক। উন্নয়নের চাকা আবার ঘুরছে, আর তার সঙ্গে বদলে যাচ্ছে মানুষের জীবন।

Advertisement

বাসের জানালার বাইরে পাহাড় আর সমুদ্রের দৃশ্য বদলাচ্ছে দ্রুত। কোথাও সাদা পাথরের ঢাল, কোথাও সবুজের আভাস, কোথাও দূরে নোঙর করে আছে ছোট্ট নৌকা। প্রকৃতি যেন এক মুহূর্তের জন্যও একঘেয়ে হতে চায় না।

পথে পড়ল ছোট্ট শহর মেতকোভিচ। জানালা দিয়ে তাকিয়ে মনে হলো, শহরটি যেন নিঃশব্দে নিজের গল্প বলছে। একসময় যেখানে ছিল প্রাণচাঞ্চল্য, সেখানে এখন এক ধরনের নীরবতা। মাত্র কয়েক বছর আগেও এখানে বাস করতেন প্রায় ১৭ হাজার মানুষ। এখন সেই সংখ্যা নেমে এসেছে ১৩ হাজারে। উচ্চশিক্ষা, কর্মসংস্থান আর ভালো জীবনের খোঁজে তরুণরা বড় শহর কিংবা ইউরোপের অন্য দেশে পাড়ি জমায়। ফিরে আসে খুব কম মানুষই। ফলে শহরের রাস্তাঘাট, দোকানপাট, এমনকি মানুষের মুখেও যেন এক ধরনের অপেক্ষার ছাপ।

এ দৃশ্য শুধু মেতকোভিচের নয়; ইউরোপের অনেক ছোট শহরের একই গল্প। উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে জনসংখ্যার মানচিত্রও বদলে যাচ্ছে। কেউ নতুন সম্ভাবনার সন্ধানে চলে যাচ্ছে, আর কেউ পুরোনো শহর আঁকড়ে রেখে ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখছে।

বাসের জানালার বাইরে পাহাড় আর সমুদ্রের দৃশ্য বদলাচ্ছে দ্রুত। কোথাও সাদা পাথরের ঢাল, কোথাও সবুজের আভাস, কোথাও দূরে নোঙর করে আছে ছোট্ট নৌকা। প্রকৃতি যেন এক মুহূর্তের জন্যও একঘেয়ে হতে চায় না।

Advertisement

ভ্রমণের সৌন্দর্য আসলে শুধু চোখে দেখা দৃশ্যে নয়। প্রতিটি পথের আছে নিজস্ব ইতিহাস, প্রতিটি সেতুর আছে নির্মাণের গল্প, প্রতিটি শহরের আছে মানুষের হাসি-কান্না, স্বপ্ন আর সংগ্রামের কাহিনি। ডুব্রোভনিক থেকে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার এই যাত্রায় তাই আমি কিংবা আমাদের ১২ জনের ভ্রমণ শুধু একটি দেশের সীমানা অতিক্রম করা নয় ; অতিক্রম করেছি ইতিহাসের বহু স্তর, যুদ্ধের ক্ষত, পুনর্জাগরণের স্বপ্ন আর মানুষের অদম্য এগিয়ে চলার গল্প।

বাস তখন সীমান্তের দিকে এগিয়ে চলেছে। পেছনে পড়ে থাকছে নীল সমুদ্র, পাহাড় আর ছোট ছোট শহর। কিন্তু জানালার বাইরে দেখা সেই দৃশ্যগুলো রয়ে যাচ্ছে মনের ভেতর—একটি দীর্ঘ, সুন্দর এবং চিন্তামগ্ন ভ্রমণের স্মৃতি হয়ে।

লেখক : ব্রিটেনপ্রবাসী কলামিস্ট।

এইচআর/এমএফএ/এএসএম