প্রবাস

কাঠমান্ডুতে আম উৎসব

বাংলাদেশের সমৃদ্ধ আমের ঐতিহ্য, বৈচিত্র্যময় স্বাদ, আন্তর্জাতিক মান এবং কৃষিপণ্যের রপ্তানি সম্ভাবনাকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরতে নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘বাংলাদেশ ম্যাংগো ডেলিকেসি’ শীর্ষক বিশেষ আম উৎসব ও প্রদর্শনী।

Advertisement

শনিবার (২৬ জুলাই) কাঠমান্ডুতে বাংলাদেশ দূতাবাসের উদ্যোগে দূতাবাসসংলগ্ন উৎসব কুঞ্জ ব্যাংকুয়েট হলে আয়োজিত এ উৎসবে বাংলাদেশের বিভিন্ন জাতের আমের পাশাপাশি আমভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত পণ্য প্রদর্শন করা হয়। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের কৃষি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প এবং আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির ক্রমবর্ধমান সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়।

আরও পড়ুন সুইডেনে প্রবাসী বাংলাদেশিদের ফুটবল ম্যাচ আয়োজন

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সার্ক সচিবালয়ের মহাসচিব রাষ্ট্রদূত মো. গোলাম সারওয়ার। বিশেষ অতিথি হিসেবে নেপালের পররাষ্ট্র সচিবের পক্ষে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের যুগ্মসচিব গহেন্দ্র রাজভাণ্ডারী অংশ নেন। এছাড়া বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক, নেপাল সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, শীর্ষস্থানীয় আমদানিকারক, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি, চেম্বার নেতা, গণমাধ্যমকর্মী ও বিশিষ্ট অতিথিরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

স্বাগত বক্তব্যে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. শফিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশে আম কেবল একটি ফল নয়, বরং দেশের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, কৃষি ও জীবনধারার অবিচ্ছেদ্য অংশ।

Advertisement

তিনি বলেন, উর্বর পলিমাটি ও অনুকূল আবহাওয়ার কারণে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম উৎকৃষ্ট মানের আম উৎপাদনকারী দেশ। খিরসাপাত (হিমসাগর), হারিভাঙ্গা, ল্যাংড়া, ফজলি, গোপালভোগ, আম্রপালি, আশ্বিনা, কাটিমন, গৌরমতি, বানানা ম্যাংগো এবং বিভিন্ন বারি আমের অনন্য স্বাদ, সুবাস, পুষ্টিগুণ ও গুণগত মান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইতোমধ্যে সুনাম অর্জন করেছে।

রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, বাংলাদেশের বিজ্ঞানী ও গবেষকেরা দেরিতে ফলনশীল নতুন জাতের আম উদ্ভাবন এবং বিদেশি জাতের সফল অভিযোজনের মাধ্যমে আম গবেষণায় উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছেন।

একই সঙ্গে দেশের বেসরকারি খাত আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন আমের জুস, নেকটার, পাল্প, জ্যাম, আচার, চাটনি, শুকনো আম, ক্যান্ডি, ফ্রুট বার ও বিভিন্ন ডেজার্ট উৎপাদনের মাধ্যমে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করছে।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে সার্ক মহাসচিব মো. গোলাম সারওয়ার বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে উন্নতমানের আম উৎপাদনের বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও এ অঞ্চলের আম ও আমজাত পণ্যের রপ্তানি এখনও প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। তিনি এ ধরনের ব্যতিক্রমী উদ্যোগ গ্রহণের জন্য বাংলাদেশ দূতাবাসকে অভিনন্দন জানিয়ে কৃষি ও কৃষিভিত্তিক বাণিজ্যে সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা আরও জোরদারের আহ্বান জানান।

Advertisement

বিশেষ অতিথি গহেন্দ্র রাজভাণ্ডারী বলেন, এ আয়োজন শুধু বাংলাদেশের আন্তরিকতা ও আতিথেয়তার পরিচয় বহন করে না, বরং বাংলাদেশ ও নেপালের জনগণের মধ্যে অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

তিনি রাষ্ট্রদূত মো. শফিকুর রহমানের ‘ম্যাংগো ডিপ্লোমেসি’ উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এ ধরনের জনকূটনৈতিক উদ্যোগ পারস্পরিক বন্ধুত্ব ও সহযোগিতাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে।

উৎসবে বাংলাদেশের একজন সফল আমচাষি রফিকুল ইসলাম গত ১৫ বছরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তিনি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে গুড অ্যাগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিসেস অনুসরণ করে নিরাপদ ও মানসম্মত আম উৎপাদনের বিভিন্ন কৌশল এবং নিজের বাস্তব অভিজ্ঞতা অতিথিদের সামনে তুলে ধরেন।

প্রদর্শনীতে রাজশাহীর মৌসুম-পরবর্তী বিভিন্ন জাতের আম—ফজলি, আম্রপালি, বারি-৪, কাটিমন, গৌরমতি ও আশ্বিনাসহ নানা জাতের তাজা আম প্রদর্শন করা হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের আমের জুস, আচার, ফ্রুট বার, শুকনো আম, চাটনি, জ্যাম, জেলি ও অন্যান্য প্রক্রিয়াজাত পণ্য দর্শনার্থীদের সামনে উপস্থাপন করা হয়।

অতিথিদের জন্য পরিবেশন করা হয় আমের কেক, ম্যাংগো স্টিকি রাইস, ম্যাংগো পুডিংসহ বিভিন্ন ধরনের আমভিত্তিক ডেজার্ট। এছাড়া বাংলাদেশে আম চাষ, দেশের সমৃদ্ধ সংস্কৃতি, পর্যটন সম্ভাবনা এবং ‘Beautiful Bangladesh’ বিষয়ক প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়।

প্রায় ২৫০ জন অতিথির উপস্থিতিতে আয়োজিত এ উৎসবে ফল ব্যবসায়ী, আমদানিকারক, ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধি, চেম্বার নেতা এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নেন। তারা বাংলাদেশের আমের অসাধারণ স্বাদ, বৈচিত্র্য ও গুণগত মানের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং নেপালের বাজারে বাংলাদেশের আম ও আমজাত পণ্যের সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

বাংলাদেশ দূতাবাস জানায়, এ উৎসব কেবল বাংলাদেশের কৃষি ও খাদ্যশিল্পের সাফল্য তুলে ধরার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং বাংলাদেশ ও নেপালের মধ্যে কৃষি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং খাদ্যপণ্য রপ্তানিতে নতুন অংশীদারত্ব গড়ে তোলার একটি কার্যকর উদ্যোগ।

দূতাবাস আশা প্রকাশ করে, ‘বাংলাদেশ ম্যাংগো ডেলিকেসি’-এর মতো উদ্যোগ দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং পারস্পরিক লাভজনক বাণিজ্যিক সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করবে। অনুষ্ঠানের সমাপ্তিতে অতিথিদের জন্য ঐতিহ্যবাহী বাংলাদেশি খাবারের আপ্যায়নের ব্যবস্থা করা হয়।

এমআরএম