তথ্যপ্রযুক্তি

জেমিনিকে চিপেই বসাতে চায় গুগল, এআইয়ের ভবিষ্যৎ কী ঝুঁকিতে?

সামিন ইয়াসার

Advertisement

গুগল একটি নতুন সার্ভার চিপ বানাচ্ছে, যার অভ্যন্তরীণ কোডনেম ‘ফ্রোজেন ভি২’। দ্য ইনফরমেশনের এক প্রতিবেদনে প্রকাশ, নতুন এই চিপে জেমিনি মডেলের মূল আর্কিটেকচার সরাসরি হার্ডওয়্যার স্তরেই স্থায়ীভাবে ইন্টিগ্রেট করা হচ্ছে। কাজটা শুনতে সহজ মনে হলেও এর পেছনে একটা বড় প্রশ্ন লুকিয়ে আছে, এআই মডেলের আর্কিটেকচার কি এখন যথেষ্ট স্থিতিশীল হয়ে গেছে যে সেটাকে হার্ডওয়্যারে চিরস্থায়ীভাবে বসিয়ে দেওয়া যায়? গুগল আপাতত বাজি ধরছে, উত্তরটা হ্যাঁ।

যেভাবে কাজ করবে চিপটি

সাধারণ টিপিইউ বা এনভিডিয়ার জিপিইউ যে কোনো ধরনের এআই মডেল চালাতে পারে বলে মডেল লোড হওয়ার সময় চিপকে প্রতিবার ডায়নামিক রাউটিং গণনার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, অর্থাৎ কোন গণনা কোথায় পাঠাতে হবে তা প্রতিবার নতুন করে ঠিক করতে হয়। ফ্রোজেন ভি২-তে এই রাউটিং লজিক আগে থেকেই সিলিকন চিপে ইমপ্লিমেন্ট করা থাকবে বলে চিপ সঙ্গে সঙ্গে কাজ শুরু করতে পারবে। গুগলের ইঞ্জিনিয়ারদের হিসাবে, একই পরিমাণ বিদ্যুতে এই চিপ কোম্পানির সাম্প্রতিক টিপিইউর তুলনায় ৬ থেকে ১০ গুণ বেশি টোকেন প্রসেস করতে পারবে।

আরও পড়ুন ডুমস্ক্রোলিংয়ের ফাঁদে আটকে যাচ্ছেন না তো? আসক্তি কমাবেন যেভাবে গুগলের আইডিয়ার পেছনের গল্প

আইডিয়াটি এসেছে গুগল ডিপমাইন্ডের প্রধান বিজ্ঞানী জেফ ডিনের ভাবনা থেকে। প্রথম পরিকল্পনায় জেমিনির ট্রেইন্ড প্যারামিটার বা ওয়েটসও চিপে যুক্ত করার কথা ছিল। তবে তাতে জেমিনির একটি নির্দিষ্ট সংস্করণের মাঝেই চিপের আর্কিটেকচার সীমাবদ্ধ থাকবে এবং নতুন সংস্করণ এলেই চিপটি অচলপ্রায় হয়ে পড়বে। তাই গুগল সেই পরিকল্পনা থেকে সরে এসে শুধু মডেলের আর্কিটেকচার হার্ডওয়্যারে বসানোর ও ওয়েটস সফটওয়্যারের মাধ্যমে আপডেট করার সিদ্ধান্ত নেয়। আর্কিটেকচারের ঠিক কতটুকু অংশ চিপে যুক্ত হবে, সেই সিদ্ধান্ত এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

Advertisement

কম্পিউট সংকট মেটাতে ভাড়া করা চিপ

এই প্রকল্পের পেছনে বড় কারণ গুগলের কম্পিউট সংকট (কম্পিউট সংকট হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং আধুনিক প্রযুক্তির যুগে প্রয়োজনীয় কম্পিউটিং ক্ষমতা বা হার্ডওয়্যার সম্পদের তীব্র ঘাটতি। এটি প্রধানত জিপিইউ ও ডাটা সেন্টারের অভাব, অতিরিক্ত বিদ্যুৎ খরচ এবং এআই মডেলের দ্রুত চাহিদার কারণে তৈরি হয়েছে)। চাহিদা এতটাই বেড়েছে যে গুগল ক্লাউডকে কিছু এন্টারপ্রাইজ গ্রাহকের অনুরোধ ফিরিয়ে দিতে হয়েছে। নিজস্ব ডাটা সেন্টার বানাতে বছরের পর বছর সময় লাগে, জমি জোগাড় থেকে বিদ্যুৎ সংযোগ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটাই ধীর। তাই স্বল্পমেয়াদি ঘাটতি মেটাতে গুগল বেছে নিয়েছে ভাড়া করা কম্পিউট।

গত ফেব্রুয়ারিতে ইলন মাস্কের স্পেসএক্স তাদের এআই সহযোগী প্রতিষ্ঠান এক্সএআই অধিগ্রহণ করে, যার সঙ্গে মেমফিসের কলোসাস ডাটা সেন্টারের মালিকানাও চলে আসে স্পেসএক্সের হাতে। এই কেন্দ্রটি মূলত এক্সএআই বানিয়েছিল নিজেদের মডেল গ্রক চালানোর জন্য, কিন্তু এখন বাড়তি ক্যাপাসিটি বাইরের গ্রাহকদের কাছে ভাড়া দিচ্ছে স্পেসএক্স। গত জুনে অ্যানথ্রপিকের পর গুগলও এই তালিকায় যুক্ত হয়েছে।

অক্টোবর ২০২৬ থেকে জুন ২০২৯ পর্যন্ত গুগল মাসে প্রায় ৯২০ মিলিয়ন ডলার দেবে স্পেসএক্সকে। বিনিময়ে মিলবে প্রায় এক লাখ দশ হাজার এনভিডিয়া জিপিইউ ও সংশ্লিষ্ট ইনফ্রাস্ট্রাকচার। গুগল নিজেই একে বলছে সাময়িক ঘাটতি মেটানোর ‘ব্রিজ ক্যাপাসিটি’। ফ্রোজেন ভি২ আসলে এই বাইরের নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে কমানোর একটি চেষ্টা।

বিনিয়োগকারীদের প্রতিক্রিয়া

খবরটি প্রকাশের পর সোমবার অ্যালফাবেটের শেয়ারদর প্রায় ৩ শতাংশ বেড়েছে। দুদিন পর বুধবার প্রকাশিত দ্বিতীয় প্রান্তিকের প্রতিবেদনেও গুগলের কম্পিউট-নির্ভর চাপটা স্পষ্ট হয়েছে। গুগল ক্লাউডের আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮২ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারে, যার পেছনে মূল চালিকাশক্তি এআই ইনফ্রাস্ট্রাকচার ও এন্টারপ্রাইজ সলিউশনের ক্রমবর্ধমান চাহিদা। একই প্রান্তিকে কোম্পানির ক্যাপেক্সও দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৪ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারে।

Advertisement

বিনিয়োগকারীরা ফ্রোজেন ভি২-কে দেখছেন গুগলের এআই ইনফ্রাস্ট্রাকচার নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার একটি প্রমাণ হিসেবে। গুগল অবশ্য এখনো প্রকল্পটি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি; কোম্পানির একজন মুখপাত্র শুধু বলেছেন, তাদের দল নিয়মিত নতুন হার্ডওয়্যার নিয়ে গবেষণা করে, যদিও প্রতিটি গবেষণা প্রকল্প শেষ পর্যন্ত উৎপাদন পর্যায়ে পৌঁছায় না।

ঝুঁকি ও ভবিষ্যৎ

গুগলের ভাষ্যে, ফ্রোজেন ভি২ টিপিইউর পাশাপাশি চলা একটি আলাদা চিপ পরিবার। বড় পরিসরে এটি উৎপাদনের কোনো পরিকল্পনা এখনো নেই এবং প্রকল্পটি এখনো পরীক্ষামূলক পর্যায়ে আছে। লক্ষ্য রাখা হয়েছে ২০২৮ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের।

আরও পড়ুন মুখের ভিডিও দিলেই হবে, পাসওয়ার্ড ছাড়াই খুলবে গুগল অ্যাকাউন্ট

ঝুঁকিটাও অবশ্য স্পষ্ট। মডেলের আর্কিটেকচার একবার হার্ডওয়্যারে স্থায়ীভাবে যুক্ত হয়ে গেলে তা সহজে বদলানো যায় না। এআই মডেলের ভেতরের ডিজাইন এখন যেভাবে দ্রুত বদলাচ্ছে, তাতে ২০২৮ সাল নাগাদ জেমিনির আর্কিটেকচার একই থাকবে কি না, তার নিশ্চয়তা কারও কাছে নেই। আর্কিটেকচার বদলে গেলে পুরো চিপ নতুন করে ডিজাইন করতে হবে, যা গুগলের জন্য বিশাল অঙ্কের অর্থ ও সময়ের অপচয় ডেকে আনবে। ২০১৭ সাল থেকে ট্রান্সফরমার আর্কিটেকচার এআই মডেলের ভিত্তি হয়ে থাকলেও এর ভেতরের ডিজাইন প্রতিনিয়ত বদলাচ্ছে।

গুগলের এই বাজি শেষ পর্যন্ত সেই একই প্রশ্নে গিয়ে ঠেকছে, যা নিয়ে শুরুতে কথা হলো। মডেলের আর্কিটেকচার কি সত্যিই হার্ডওয়্যারে বসানোর মতো যথেষ্ট থিতু হয়ে গেছে? উত্তর মিলবে বছর দুয়েক পরেই, যখন ফ্রোজেন ভি২ বাস্তবে চালু হওয়ার কথা।

লেখক: প্রযুক্তি লেখক ও পোস্ট-কোয়ান্টাম ক্রিপ্টোগ্রাফি গবেষক।

কেএসকে