বুকের ঠিক মাঝখানে, বুকের হাড় বা স্টারনামের ঠিক নিচে লুকিয়ে থাকা ছোট্ট ও অবহেলিত একটি অঙ্গ যা বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে সংকুচিত বা ছোট হয়ে যায়। থাইমাস (Thymus) নামের এই অঙ্গটির নামকরণ করেছিলেন প্রাচীন গ্রিকরা। গ্রিক ভাষায় ‘থাইমাস’ শব্দের অর্থ আত্মা ও তারা বিশ্বাস করতেন এই অঙ্গটিই হলো মানুষের আত্মার বাসস্থান।
Advertisement
দীর্ঘদিন ধরে ধারণা করা হতো, শৈশব পার হওয়ার পর এই অঙ্গটির কার্যকারিতা শেষ হয়ে যায়। তবে সেই থাইমাস গ্ল্যান্ডকে নিয়ে বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে নতুন করে দারুণ আগ্রহ তৈরি হয়েছে। গবেষকরা প্রবলভাবে বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন যে, মানবজাতির চিরন্তন স্বপ্ন- দীর্ঘায়ু লাভ বা আয়ু বৃদ্ধির গোপন চাবিকাঠি লুকিয়ে থাকতে পারে এই থাইমাস গ্রন্থির মধ্যেই।
থাইমাস গ্ল্যান্ড কী ও এটি কীভাবে কাজ করে?
থাইমাস হলো মূলত একটি গ্রন্থি যা বুকের হাড়ের নিচে ও হৃদপিণ্ডের ঠিক সামনে অবস্থিত। নবজাতক শিশুদের ক্ষেত্রে এটি তুলনামূলকভাবে বড় থাকে এবং জন্মের পূর্বেই এটি বেশ সুগঠিত হয়ে ওঠে। কিন্তু বয়স বাড়ার সাথে সাথে এটি ধীরে ধীরে ছোট হতে থাকে এবং এর কার্যকারিতা বা সক্রিয়তা কমতে থাকে।
Advertisement
থাইমাস গ্রন্থি হলো সেই জায়গা, যেখানে ‘টি লিম্ফোসাইট’ বা ‘টি সেল’ (T cells) পূর্ণাঙ্গভাবে পরিপক্কতা লাভ করে। মানবদেহের অস্থিমজ্জায় (Bone marrow) থাকা স্টেম সেল থেকে প্রথমে অপরিপক্ক টি সেলের উৎপত্তি হয় ও পরবর্তীতে তা রক্তপ্রবাহের মাধ্যমে থাইমাসে এসে পৌঁছায়। সেখানে এই কোষগুলো কার্যক্ষম টি সেলে পরিণত হয়। টি সেল হলো এক ধরনের শ্বেত রক্তকণিকা, যা দেহে প্রবেশ করা সংক্রামক জীবাণু বা ক্যানসার কোষগুলোকে খুঁজে বের করে ধ্বংস করে ও শরীরের সার্বিক প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সমন্বিত করতে সাহায্য করে।
ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের ইনস্টিটিউট অব ইমিউনিটি অ্যান্ড ট্রান্সপ্লান্টেশনের এপিথেলিয়াল সেল বায়োলজি অ্যান্ড রিজেনারেটিভ মেডিসিনের অধ্যাপক পাওলা বনফান্তি (Paola Bonfanti) জানান, মানবজীবনে বিস্ময়করভাবে বেশ প্রাথমিক পর্যায় থেকেই থাইমাস সংকুচিত হতে শুরু করে। শৈশবেই এই প্রক্রিয়া শুরু হয় ও বয়ঃসন্ধির সময়ে এটি দ্রুততর হয়। পুরো প্রাপ্তবয়স্ক জীবন জুড়েই এর আকার ছোট হতে থাকে।
তিনি আরও ব্যাখ্যা করে বলেন, থাইমাসের আকার ছোট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার অত্যন্ত প্রয়োজনীয় উপাদান- নতুন টি সেল তৈরির সক্ষমতাও ধীরে ধীরে কমতে থাকে। রক্তে নতুন তৈরি হওয়া টি সেলের উপস্থিতি পরীক্ষা করে এই কার্যক্ষমতা হ্রাসের পরিমাপ করা সম্ভব।
সাম্প্রতিক গবেষণায় কী তথ্য উঠে এসেছে?
Advertisement
নব্বইয়ের দশক থেকেই গবেষকরা জানার চেষ্টা করছেন যে, থাইমাসের এই ক্ষয় বা সংকোচন প্রক্রিয়া থামিয়ে দেওয়া গেলে তা রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে ও জীবনের শেষভাগে স্বাস্থ্য উন্নত করতে পারে কিনা।
সম্প্রতি প্রকাশিত বেশ কিছু নতুন গবেষণা এই ধারণাকে আরও জোরদার করেছে। গবেষণাগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, মানুষের দীর্ঘায়ু অর্জন ও ক্যানসারের ইমিউনোথেরাপি চিকিৎসায় থাইমাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
চলতি বছরের মার্চ মাসে ‘নেচার’ (Nature) সাময়িকীতে হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের বিজ্ঞানীদের নেতৃত্বে একটি গবেষণা নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। সেখানে এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে হাজার হাজার সিটি স্ক্যান বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষকরা দেখতে পান, যেসব প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের থাইমাস তুলনামূলক সুস্থ বা স্বাভাবিক, তারা রোগাক্রান্ত থাইমাস থাকা ব্যক্তিদের তুলনায় বেশি দিন বাঁচেন। পাশাপাশি তাদের হৃদরোগ ও ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার হারও অনেক কম।
নেচার সাময়িকীর একই সংখ্যায় প্রকাশিত আরেকটি গবেষণায় সিটি স্ক্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে, ক্যানসার রোগীদের ক্ষেত্রে ইমিউনোথেরাপি কতটা কার্যকর হবে, তা থাইমাসের স্বাস্থ্যের ওপর নির্ভর করতে পারে। কারণ ইমিউনোথেরাপি চিকিৎসা সম্পূর্ণভাবে রোগীর নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার শক্তির ওপর নির্ভরশীল।
এর আগে ২০২৩ সালের একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছিল, যাদের শরীর থেকে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে থাইমাস কেটে ফেলে দেওয়া হয়েছে, তাদের মৃত্যুর ঝুঁকি সাধারণ মানুষের চেয়ে তিনগুণ বেশি। পাশাপাশি অঙ্গটি ফেলে দেওয়ার পাঁচ বছরের মধ্যে ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও দ্বিগুণ হয়ে যায়।
তবে এই তথ্যের বিষয়ে অধ্যাপক বনফান্তি কিছুটা সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, এই পর্যবেক্ষণগুলো কেবল পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত, এর মাধ্যমে নিশ্চিতভাবে কোনো কারণ ও ফলাফলের সম্পর্ক প্রমাণিত হয় না। এটাও হতে পারে যে, যারা জন্মগতভাবে তুলনামূলক বেশি স্বাস্থ্যবান, বয়স বাড়লেও তাদের থাইমাসের টিস্যুগুলো স্বাভাবিকভাবেই ভালো থাকে- যার অর্থ থাইমাস বড় থাকার কারণেই যে তারা সুস্থ আছেন, বিষয়টি পুরোপুরি এমন নাও হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, থাইমাসের কার্যকারিতা ধরে রাখা বা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা সরাসরি স্বাস্থ্য উন্নত করে কিংবা আয়ু বৃদ্ধি করে কিনা, তা নিশ্চিত হতে আরও বিস্তারিত গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
তা সত্ত্বেও বনফান্তির ভাষ্য, থাইমাসের টিস্যুর কার্যকারিতা ধরে রাখা গেলে তা নতুন টি সেল তৈরি ও শক্তিশালী প্রতিরোধ ব্যবস্থা গঠনে সহায়তা করে, এর পর্যাপ্ত জৈবিক প্রমাণ আমাদের হাতে রয়েছে। তাই থাইমাসের কাজ ধরে রাখা যে বার্ধক্যে সুস্থ রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থায় অবদান রাখে, তা আশা করা একেবারেই যুক্তিযুক্ত; যদিও এটিকে সার্বিক স্বাস্থ্য বা দীর্ঘায়ুর শতভাগ গ্যারান্টি হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
দীর্ঘদিন কেন অবহেলিত ছিল এই অঙ্গ?
থাইমাস গ্ল্যান্ড দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসাবিজ্ঞানে অবহেলিত হওয়ার মূল কারণ হলো- কয়েক দশক ধরে চিকিৎসকরা বিশ্বাস করতেন বয়ঃসন্ধির পর এই গ্রন্থিটি সংকুচিত হয়ে যাওয়ার কারণে এটি সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি তেমন নয়।
বনফান্তি ব্যাখ্যা করেন, বার্ধক্যে পৌঁছানোর পরও থাইমাস কিন্তু শরীর থেকে একদম গায়েব বা অদৃশ্য হয়ে যায় না। বরং এটি ‘ইনভোল্যুশন’ নামক একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়, যেখানে কার্যকরী থাইমিক টিস্যুগুলো ধীরে ধীরে চর্বি ও কানেক্টিভ টিস্যু দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়।
এর ফলে অঙ্গটি আকারে ছোট হয়ে যায় ও নতুন টি সেল তৈরির ক্ষমতা কমে যায়। তবে মানুষের পুরো জীবন জুড়েই এর ভেতরে কিছুটা হলেও কার্যকরী থাইমিক টিস্যুর অস্তিত্ব থেকে যায়, যদিও ব্যক্তির ভেদে এর পরিমাণের পার্থক্য দেখা যায়।
তবে বনফান্তি স্পষ্ট করেন যে, থাইমাসের এই বার্ধক্যজনিত সংকোচন আমাদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা দুর্বল হওয়ার একাধিক কারণের একটিমাত্র অংশ। এছাড়া অস্থিমজ্জার বার্ধক্য, লিম্ফ নোডের পরিবর্তন কিংবা রোগ প্রতিরোধকারী কোষগুলোর নিজস্ব ক্ষয়প্রাপ্তির কারণেও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়।
নতুন এই গবেষণার তাৎপর্য কী?
প্রাথমিক গবেষণাগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে সুস্থ থাইমাস মানুষের কম মৃত্যুঝুঁকি ও কম রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু বিজ্ঞানীদের সামনে এখনো বড় প্রশ্ন হলো- এই অঙ্গটিকে পুনরুজ্জীবিত করা ও নতুন টি সেল তৈরি বাড়ানো সত্যিই দীর্ঘমেয়াদে প্রতিরোধ ব্যবস্থা উন্নত করবে কিংবা বার্ধক্য রোধ করতে পারবে কিনা?
বনফান্তি জানান, থাইমাসের কার্যকারিতা পরিমাপের সবচেয়ে স্বীকৃত পদ্ধতি হলো রক্তে নতুন তৈরি হওয়া টি সেল ও টি সেল পপুলেশনের বৈচিত্র্য পরীক্ষা করা। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে থাইমাসের সক্রিয়তা কমে যায়, ফলে নতুন টি সেল উৎপাদন ও এর বৈচিত্র্য সীমিত হয়ে পড়ে। এই পরিবর্তনগুলোই মূলত ‘ইমিউনোসেনেসেন্স’ বা প্রতিরোধ ব্যবস্থার বার্ধক্যের প্রধান লক্ষণ- যেমন ভ্যাকসিনের প্রতিক্রিয়া কমে যাওয়া, নতুন সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ক্ষমতা হ্রাস পাওয়া ও অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপনের মতো চিকিৎসার পর প্রতিরোধ ব্যবস্থা ধীরে পুনরায় গড়ে ওঠা।
তবে গবেষকরা বিশ্বাস করেন যে, থাইমাসের নিজস্ব পুনর্গঠন হওয়ার স্বাভাবিক ক্ষমতা রয়েছে। বিখ্যাত সাময়িকী নেচারের তথ্য অনুযায়ী, বস্টনের ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হাসপাতালের হেমাটোলজিস্ট ডেভিড স্ক্যাডেন জানান, গর্ভাবস্থায় নারীদের থাইমাস সংকুচিত হয়ে গেলেও সন্তান প্রসবের পর তা আবার পূর্বের অবস্থায় ফিরে আসে।
আমরা এখনো কী জানি না?
অধ্যাপক বনফান্তি বলেন, বয়সের সঙ্গে সঙ্গে থাইমাস কেন এভাবে ক্রমাগত সংকুচিত বা ক্ষয়প্রাপ্ত হতে থাকে, ঠিক কোন কোষগুলো সবার আগে নষ্ট হয়, কিংবা কোন মলিকিউলার সিগন্যালগুলো এই টিস্যুকে ছোট হওয়া থেকে আটকাতে পারে- সে বিষয়ে এখনো আমাদের স্পষ্ট ধারণা নেই।
ভবিষ্যতের পদক্ষেপ কী?
নেচার সাময়িকীর রিপোর্ট অনুযায়ী, পেনসিলভানিয়ার ফিলাডেলফিয়ার বায়োটেক কোম্পানি ‘টলারেন্স বায়ো’র (Tolerance Bio) প্রধান নির্বাহী ফ্রান্সিসকো লিওন জানিয়েছেন, তাদের কোম্পানি একটি বিশেষ অ্যান্টিবডি তৈরি করছে, যা থাইমাসের এই সংকোচন প্রক্রিয়াকে ধীরগতির করে দেবে।
প্রতিষ্ঠানটি অ্যান্টিবডি সম্পর্কে বিস্তারিত প্রকাশ না করলেও জানিয়েছে যে, তারা আগামী বছর থেকে মানুষের ওপর এর ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরু করবে।
ভবিষ্যতের ব্যবহারের বিষয়ে বনফান্তি সতর্ক করে বলেন, যদি থাইমাস পুনরুজ্জীবিত করার প্রক্রিয়াটি নিরাপদ ও কার্যকর প্রমাণিতও হয়, তাহলেও দীর্ঘায়ু পাওয়ার আশায় সুস্থ মানুষরা কিন্তু এটি প্রথম পাবেন না। বরং যেসব মুমূর্ষু রোগীর জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন রয়েছে ও যেখানে সুবিধার পাল্লা ঝুঁকির চেয়ে অনেক বেশি, শুরুতেই কেবল তাদের ওপর এটি প্রয়োগ করা হবে।
সূত্র: নেচার সাময়িকী ও হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুল গবেষণা প্রতিবেদন, আল-জাজিরা
এসএএইচ