অর্থনীতি

হেমায়েতপুর ও ভাটারা অংশের কাজ পাচ্ছে চীনা প্রতিষ্ঠান, বাড়ছে ব্যয়

রাজধানীর যানজট নিরসন এবং আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বাস্তবায়নাধীন মেট্রোরেল লাইন-৫ (নর্দার্ন রুট) প্রকল্পের উড়াল অংশ নির্মাণে ২ হাজার ৬৭১ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হচ্ছে। চীনের তিন প্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগকে এই কাজ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ।

Advertisement

সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির আগামী বৈঠকে এ সংক্রান্ত ক্রয় প্রস্তাব উপস্থাপন করা হতে পারে। বাংলাদেশ সরকার ও জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) যৌথ অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হচ্ছে। 

সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা ম্যাস র‍্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পের (লাইন-৫: নর্দান রুট) তৃতীয় নির্মাণ প্যাকেজের আওতায় হেমায়েতপুর থেকে আমিনবাজার পর্যন্ত প্রায় ৫ দশমিক ৬ কিলোমিটার এবং নতুনবাজারের পর থেকে ভাটারা পর্যন্ত প্রায় শূন্য দশমিক ৯ কিলোমিটার, অর্থাৎ মোট ৬ দশমিক ৫ কিলোমিটার উড়াল মেট্রোরেল লাইন নির্মাণ করা হবে। একই সঙ্গে হেমায়েতপুর, বলিয়ারপুর, বিলামালিয়া, আমিনবাজার ও ভাটারায় পাঁচটি উড়াল স্টেশন নির্মাণ করা হবে।

আরও পড়ুন ঢাকায় তিন মেট্রোরেলে বড় বরাদ্দ, ঝুলে গেল তিনটি

মেট্রোরেল লাইন-৫ (নর্দার্ন রুট) প্রকল্পটি ২০১৯ সালের ১৫ অক্টোবর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে অনুমোদিত হয়। পরে একই বছরের ২০ নভেম্বর প্রশাসনিক অনুমোদন দেওয়া হয়।

Advertisement

প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪১ হাজার ২৩৮ কোটি ৫৪ লাখ ৭৭ হাজার টাকা। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ১২ হাজার ১২১ কোটি ৪৯ লাখ ৬৭ হাজার টাকা এবং জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) ঋণ ২৯ হাজার ১১৭ কোটি ৫ লাখ ১০ হাজার টাকা।

প্রকল্পের মেয়াদ ২০১৯ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত। এই প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে ঢাকার যানজট কমানো, পরিবেশের উন্নয়ন এবং দ্রুতগামী, নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত, সময়সাশ্রয়ী, বিদ্যুৎচালিত ও পরিবেশবান্ধব আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব হবে।

আরও পড়ুন প্রথম পাতাল রেলে ১৫৫১ কোটি টাকাসহ বরাদ্দ কমছে তিন মেট্রোরেলে

পুরো প্রকল্পের দৈর্ঘ্য ২০ কিলোমিটার। এর মধ্যে ১৩ দশমিক ৫ কিলোমিটার পাতালপথ এবং ৬ দশমিক ৫ কিলোমিটার উড়ালপথ। মোট ১৪টি স্টেশনের মধ্যে ৯টি পাতাল এবং ৫টি উড়াল স্টেশন নির্মাণ করা হবে। পুরো প্রকল্পের কাজ ১০টি নির্মাণ প্যাকেজে সম্পন্ন হবে।

আন্তর্জাতিক দরপত্রে নির্বাচন

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এই নির্মাণকাজের জন্য আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র আহ্বান করা হয়। প্রাক-যোগ্যতা যাচাইয়ে ২৪টি প্রতিষ্ঠান দলিল সংগ্রহ করলেও ৬টি প্রতিষ্ঠান আবেদন জমা দেয়।

Advertisement

মূল্যায়নের পর চারটি প্রতিষ্ঠান প্রাক-যোগ্যতা অর্জন করে। পরে দরপত্র আহ্বান করা হলে তিনটি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। কারিগরি মূল্যায়নে দুটি প্রতিষ্ঠান উত্তীর্ণ হয় এবং তাদের আর্থিক প্রস্তাব খোলা হয়।

দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির মূল্যায়নে চীনের রেলওয়ে গ্রুপ, ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার এবং চায়না রেলওয়ে মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপের যৌথ উদ্যোগে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে নির্বাচিত হয়। দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা ছিল সিনোহাইড্রো করপোরেশন।

কত টাকায় হচ্ছে কাজ

দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী, ভ্যাট ও আয়কর ছাড়া যৌথ উদ্যোগটির দর ২ হাজার ২৮৫ কোটি ৬৮ লাখ ৬৬ হাজার টাকা।

সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী ১০ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর এবং ৭ দশমিক ৫ শতাংশ উৎসে আয়কর যুক্ত করলে মোট চুক্তিমূল্য দাঁড়ায় ২ হাজার ৬৭০ কোটি ৯৮ লাখ ৯৭ হাজার ৮৬০ টাকা।

আরও পড়ুন মেট্রোতেই স্বস্তি দেখছেন যাত্রীরা

এর মধ্যে স্থানীয় মুদ্রায় ৫৯০ কোটি ৫৮ লাখ ১৪ হাজার টাকা, জাপানি মুদ্রায় ৮৬ কোটি ৩০ লাখ ৩০ হাজার ৮০৬ এবং মার্কিন মুদ্রায় ১ কোটি ৩৬ লাখ ৯৪ হাজার ৩৪০ সমপরিমাণ অর্থ রয়েছে।

প্রাক্কলনের চেয়ে ব্যয় বেশি

এই নির্মাণকাজের দাপ্তরিক প্রাক্কলন ছিল ২ হাজার ২৫৭ কোটি ৪৯ লাখ ৬২ হাজার টাকা (ভ্যাট ও আয়কর ছাড়া)। সুপারিশ করা দরটি প্রাক্কলিত মূল্যের তুলনায় শূন্য দশমিক ৬৯ শতাংশ বেশি, যা গ্রহণযোগ্য বলে মূল্যায়ন করা হয়েছে।

প্রকল্পের মূল উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে এই প্যাকেজের জন্য বরাদ্দ ছিল ১ হাজার ৮৯০ কোটি ৮৪ লাখ ৯৬ হাজার টাকা। কিন্তু বর্তমান সুপারিশ করা চুক্তিমূল্য সেই বরাদ্দের তুলনায় ৭৮০ কোটি ১৪ লাখ ১ হাজার ৫৯৪ টাকা বেশি।

সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ জানিয়েছে, প্রকল্প সংশোধনের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থের সংস্থান করা হবে। সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে এই প্যাকেজের জন্য ৩ হাজার ১৭৪ কোটি ২২ লাখ ৪২ হাজার টাকা বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব রয়েছে।

দীর্ঘ যাচাই-বাছাই শেষে অনুমোদনের পথে

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দরপত্র মূল্যায়নের প্রতিটি ধাপে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার অনাপত্তি নেওয়া হয়েছে। পরে নির্বাচিত ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দীর্ঘ প্রাক-চুক্তি আলোচনা শেষে চূড়ান্ত চুক্তিমূল্য নির্ধারণ করা হয়।

এছাড়া দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির কোনো সদস্য ভিন্নমত দেননি এবং প্রচলিত আইন, বিধি-বিধান ও ক্রয়বিধি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে বলে প্রত্যয়ন দেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মেট্রোরেলের যাত্রাবিরতি বন্ধ

ডিএমটিসিএলের পরিচালনা পর্ষদের ৭৯তম সভায় ক্রয় প্রস্তাবটি অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। এরপর সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম সারসংক্ষেপে সম্মতি দিয়ে বিষয়টি সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত দিয়েছেন।

সরকারি ক্রয়বিধি অনুযায়ী, চুক্তিমূল্য ১০০ কোটি টাকার বেশি হওয়ায় এটি সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে।

এ বিষয়ে জানতে ঢাকা ম্যাস র‌্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের (লাইন-৫) প্রকল্প পরিচালক আব্দুল মতিন চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘জাইকার অর্থায়নে প্রকল্পটির একটি প্যাকেজে চীনা যৌথ উদ্যোগের সঙ্গে চুক্তির প্রক্রিয়া এগিয়ে চলছে। এ বিষয়ে জাইকার কোনো আপত্তি নেই।’ 

তিনি বলেন, ‘জাইকার আপত্তি থাকলে প্রস্তাবটি অনুমোদনের জন্যই পাঠানো যেতো না। অর্থাৎ, এ বিষয়ে তাদের সম্মতি রয়েছে। এছাড়া কোনো নির্দিষ্ট দেশের প্রতিষ্ঠানের কাজ করার ওপরও কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই।’

তিনি আরও বলেন, ‘যে চীনা যৌথ উদ্যোগের সঙ্গে চুক্তি হতে যাচ্ছে, তাদের কাজের আওতায় থাকবে সম্পূর্ণ উড়াল অংশ। এই প্যাকেজের অধীনে প্রায় সাড়ে ছয় কিলোমিটার উড়ালপথ নির্মাণ করা হবে।’

সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি অনুমোদন দিলে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে? জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদন পাওয়ার পর পরবর্তী ধাপে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি (কন্ট্রাক্ট অ্যাগ্রিমেন্ট) স্বাক্ষর করা হবে। এর আগে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পারফরম্যান্স গ্যারান্টি জমা দেবে, সেটি যাচাই-বাছাই করা হবে। এরপর উভয়পক্ষের সম্মতিতে চুক্তি স্বাক্ষরের তারিখ নির্ধারণ করা হবে।’

আরও পড়ুন ঢাকা-সিলেট চার লেন / মাটির নিচে পরীক্ষায় ‘ফাঁকি’, ‘গলার কাঁটা’ ইউটিলিটি

ব্যয় বেশি হওয়ার বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক বলেন, ‘দরপত্র প্রক্রিয়ায় আলোচনার (নেগোসিয়েশন) মাধ্যমে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবিত দর কিছুটা কমানো হয়েছে। তবে চূড়ান্ত প্রস্তাবিত ব্যয় প্রকৌশলীদের প্রাক্কলিত ব্যয়ের তুলনায় সামান্য বেশি। তবে এই অতিরিক্ত ব্যয় গ্রহণযোগ্য সীমার মধ্যেই রয়েছে।’

প্রকল্পের সময়সীমা নিয়ে তিনি বলেন, ‘২০২৮ সালে বাণিজ্যিক পরিচালনা শুরুর যে লক্ষ্য রয়েছে, সেটি পুরো প্রকল্পের অগ্রগতির ওপর নির্ভর করবে। বর্তমানে ২০২৬ সাল চলছে এবং এখনো ভূগর্ভস্থ অংশের কোনো প্যাকেজের চুক্তি সম্পন্ন হয়নি। এটি একটি সমন্বিত প্রকল্প, যেখানে মোট ১০টি প্যাকেজের কাজ রয়েছে। সব প্যাকেজের কাজ সমানতালে এগোলে তবেই নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব হবে। এরই মধ্যে ডিপোর কাজ শুরু হয়েছে, এটি প্রকল্পের একটি ধাপ। এখন উড়াল অংশের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্যাকেজের কাজ এগোচ্ছে, তবে আরও কয়েকটি প্যাকেজের কাজ বাকি।’

এমএএস/ইএ/ এমএফএ